ক্ষণিকের জন্য জমি-ঘেরাওয়ের জনৈক ধ্বজাধারী এবং ডাঃ প্রাইসের একজন বিরোধীর কথা শোনা যাক, যেহেতু খোলা মাঠে লোকজনকে আর শ্রম নষ্ট করতে দেখা যায় না, সেই হেতু অবশ্যই জনশূন্যতা দেখা দিয়েছে এমন একটা সিদ্ধান্ত। অনিবার্য নয়। যদি ক্ষুদ্র কৃষকদের এমন একদল লোকে রূপান্তরিত করা যায়, যারা অবশ্যই অপরের জন্য কাজ করে এবং অধিকতর শ্রম উৎপাদন করে, তাহলে এটা হবে একটা সুবিধা, যা সমগ্র জাতি (অবশ্য, রূপান্তরিত কৃষকেরা এই জাতির অন্তর্ভুক্ত নয়) কামনা করবে। যখন তাদের সম্মিলিত শ্রম একসঙ্গে নিয়োজিত হবে, তখন ফসল উৎপন্ন হবে ঢের বেশি, ম্যানুফ্যাকচারের জন্য পাওয়া যাবে উদ্বৃত্ত এবং এই ভাবে ম্যানুফ্যাকচার যা হল জাতির একটি খনি-স্বরূপ, তা উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ অনুপাতে বৃদ্ধি পাবে।” [২৪]
যে দার্শনিক-সুলভ মানসিক প্রশান্তি সহকারে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ব সম্পত্তির পবিত্রতম অধিকারসমূহের” নির্লজ্জতম লঙ্ঘনকে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির ভিত্তি-স্থাপনের প্রয়োজনে অনুষ্ঠিত হিংসাত্মক কার্যাবলীকে গণ্য করে থাকে, তা লোকহিতৈষী ও ‘টোরি’-পন্থী স্যার এফ এম. ইডেন দেখিয়েছেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ তৃতীয় ভাগ থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত জমি থেকে জনগণের বলপূর্বক উৎপাটনের দরুন ক্রমাগত যে-সব চুরি, অত্যাচার ও গণ-দুর্দশা অনুষ্ঠিত হয় সেগুলি থেকে তিনি যে মনোরম সিদ্ধান্তটিতে উপনীত হলেন তা এই, “আবাদি জমি এবং চারণ-জমির মধ্যে যথোচিত অনুপাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গোটা চোদ্দ শতক এবং পনের শতকের বেশির ভাগটা জুড়ে ২, ৩, এমনকি ৪ একর পর্যন্ত আবাদি জমি-পিছু ছিল এক একর চারণ-জমি-যে পর্যন্ত না অবশেষে এক একর আবাদি জমি-পিছু ৩ একর চারণ-জমির সঠিক অনুপাতটি প্রতিষ্ঠা করা গিয়েছে।
উনিশ শতকে কৃষি-শ্রমিক ও সাধারণ সম্পত্তির মধ্যেকার স্মৃতিটি পর্যন্ত মুছে গিয়েছে। আরো সাম্প্রতিক কালের কথা নয় বাদই দিলাম, কিন্তু ১৮০১ থেকে ১৮৩১ সালের মধ্যে যে ৩৫,১১,৭৭০ একর সাধারণ জমি কৃষি-জনসমষ্টির অধিকার থেকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং সংসদীয় কলা-কৌশলের সাহায্যে জমিদারেরা জমিদারদের দান করেছিল, তার জন্য কি এক কপর্দক ক্ষতিপূরণও তাদের দেওয়া হয়েছিল?
কৃষি-জনসংখ্যার পাইকারি উচ্ছেদসাধনের সর্বশেষ প্রক্রিয়াটি হল তথাকথিত জমি সাফাইয়ের অর্থাৎ জমি থেকে মানুষজনকে ঝেটিয়ে তাড়াবার কর্মকাণ্ড। এই পর্যন্ত যত ইংরেজি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলিরই চরম পরিণতি হল এই “জমি সাফাই”। পূর্ববর্তী এক অধ্যায়ে প্রদত্ত আধুনিক অবস্থার চিত্রটিতে আমরা যেমন দেখেছি, যখন সাফাই করার মত স্বাধীন কৃষি-কৰ্মী আর থাকে না, তখন শুরু হয় কুটির “সাফাই”-এর কর্মকাণ্ড, যাতে করে কষি-শ্রমিকেরা যে জমি চাষ করে, সেখানে মাথা গোঁজার ঠাইটুকু পর্যন্ত না পায়। কিন্তু “জমি-সাফাই” বাস্তবে ও সঠিক ভাবে কি বোঝায়, তা আমরা জানতে পাই কেবল আধুনিক কল্পকাহিনীর সেই স্বপ্নরাজ্যে স্কটল্যাণ্ডের হাইল্যাণ্ডস-এ। সেখানে এই প্রক্রিয়াটির বিশেষত্ব হল তার ধারাবাহিক চরিত্র, এক আঘাতে যে-আয়তনে তা সংঘটিত হয় তার ব্যাপকতা ( আয়ার্ল্যাণ্ডেও জমিদারের এক সঙ্গে কয়েকটি করে গ্রাম-সাফাই পর্যন্ত গিয়েছে কিন্তু স্কটল্যাণ্ডে জমিদারেরা এক সঙ্গে হাতে নিয়েছে জার্মান রাজ্যগুলির মত বিরাট বিরাট এলাকা) এবং, সর্বশেষে, সম্পত্তির স্ব-বিশেষ রূপ, যার অধীনে চুরি-করা জমি পর্যন্ত দখলে রাখা যায়।
হাইল্যাণ্ডের ‘কেলট’-রা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল, যে গোষ্ঠী যে-জমিতে বাস, করত, সেই গোষ্ঠী ছিল সেই জমির মালিক। গোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে বলা হত তার ‘প্রধান” বা “মহাজন”; সে ছিল কেবল নামে মাত্র সম্পত্তির মালিক, ইংল্যাণ্ডের রানী যেমন ইংল্যাণ্ডের সমস্ত জমির মালিক। ইংরেজ সরকার যখন এই বড় কর্তাদের পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং ‘লো-ল্যাণ্ড’-এর সমতলে তাদের নিরন্তর আক্রমণ দমন করতে সক্ষম হল, তখন ঐ গোষ্ঠীপতিরা কোনক্রমেই তাদের প্রথাগত লুঠেরা-বৃত্তি পরিত্যাগ করল না; তারা কেবল তার রূপ পরিবর্তন করল। তাদের নিজেদের কর্তৃত্ববলে তারা তাদের নামমাত্র অধিকারকে রূপান্তরিত করল ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারে এবং যখনি তার ফলে গোষ্ঠীর লোকজনের সঙ্গে তার বিবোধ হত, সে খোলাখুলি বলপ্রয়োগ করে তাদের জমি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে, সেই বিরোধের সমাধান করত। অধ্যাপক নিউম্যান বলেন, “একই ভাবে ইংল্যাণ্ডের যে কোন রাজা দাবি করতে পারেন যে তিনি তার প্রজাদের সাগরে তাড়িয়ে দেবেন।”[২৫] ‘প্রিটেণ্ডার’-এর ( সিংহাসন দাবিদার’-এর) অনুগামীদের সর্বশেষ অভ্যুত্থানের পরে স্কটল্যাণ্ডে যে বিপ্লব শুরু হয় তার প্রথম পর্যায়গুলির ইতিবৃত্ত অনুসরণ করা যায় স্যার জেমস স্টুয়ার্ট[২৬] এবং জেমস এণ্ডার্সনের[২৭] লেখাগুলিতে। আঠারো শতকে বিতাড়িত ‘গেইল’দের (কেলটদের) দেশান্তর গমন নিষিদ্ধ করে দেওয়া হল, যাতে করে তাদের জোর করে গ্লাসগো ও অন্যান্য শিল্প-শহরে পাঠানো যায়।[২৮] উনিশ শতকে প্রচলিত এই পদ্ধতিটির একটি নমুনা হিসাবে[২৯] সাদারল্যাণ্ডের ডাচেস যে সাফাই চালিয়েছিলেন, তার উল্লেখই যথেষ্ট হবে। অর্থতত্ত্বে সু-শিক্ষিত এই মহিলাটি সরকারে প্রবেশের পরেই সিদ্ধান্ত করেন যে তিনি একটা আমূল প্রতিকার সংঘটিত করবেন, গোটা দেশটিকে—যার জনসংখ্যা আগেকার কর্মকাণ্ডগুলির ফলে ইতিমধ্যেই ১,৫০,০০০-এ গিয়ে দাড়িয়েছে তাকে পর্যবসিত করবেন একটা মেষ-চারণ-ভূমিতে। ১৮১৪ থেকে ১৮২০ সাল পর্যন্ত এই ১,৫০,০০০ অধিবাসীকে, প্রায় ৩,০০০ পরিবারকে শিকারের মত তাড়া করা হয় এবং নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। তাদের সমস্ত গ্রামগুলিকে ধ্বংস করা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তাদের সমস্ত ক্ষেতগুলিকে চারণভূমিতে পরিণত করা হয়। ব্রিটিশ সৈন্যরা এই উচ্ছেদ কাণ্ড সবলে সম্পাদন করে এবং অধিবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। একজন বৃদ্ধা মহিলা তার কুটির ছেড়ে যেতে অস্বীকার করলে, কুটিরের মধ্যেই আগুনে পুড়ে মারা যান। এই ভাবে এই মহীয়সী মহিলা ৭,৯৪,৩০০ একর জমি অত্মসাৎ করলে, স্মরণাতীত কাল ধরে যে জমি ছিল গোষ্ঠীর সম্পত্তি। উৎপাটিত অধিবাসীদের জন্য তিনি সাগরের তীরে পরিবার-পিছু ২ একর হিসাবে মোট ৬,০০০ একর জমি বরাদ্দ করলেন। এই ৬,০০০ একর জমি এতকাল পতিত পড়েছিল এবং সেগুলি থেকে মালিকদের হাতে কোনো আয় আসত না। এই ‘ডাচেস মহিলাটি তার হৃদয়ের মহানুভবতার দরুন কার্যত এতদূর পর্যন্ত গেলেন যে ঐ জমির জন্য গোষ্ঠীর লোকদের উপরে একর পিছু ২ শিলিং ৬ পেন্স করে ভাড়া ধার্য করে দিলেন, যে-লোকেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার পরিবারের জন্য রক্ত ঢেলে এসেছে। গোষ্ঠা-জমির পুরোটাকেই তিনি ভাগ করলেন ২৯টি বৃহদাকার মেষ-ফার্ম’-এ, প্রত্যেকটিতে বসিয়ে দিলেন একটি করে পরিবার-বেশির ভাগই ইংল্যাণ্ড থেকে আমদানি করা খামার চাকর। ১৮৩৫ সালেই ১৫,০০০ গেইলের বদলে ১,৩১,৩০০ ভেড়াকে জায়গা করে দিয়েছে। আদিবাসীদের বাকি অংশ সমুদ্র-তীরে নিক্ষিপ্ত হয়ে মাছ শিকার করে কোন রকমে বেঁচে থাকার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। তারা পরিণত হল উভচর প্রাণীতে, এবং, যে কথা একজন ইংরেজ লেখক বলেছেন, বাস করত অর্ধেকটা মাটিতে আর অর্ধেকটা জলে—দুয়েরই আধাআধি যোগ করে।[৩০]
