এক দিকে যখন জমিদারদের খেয়াল-খুশির উপরে নির্ভরশীল একটা দাস-সুলভ জনসমষ্টি-উঠবন্দী প্রজা তথা বার্ষিক ইজারাভোগী ছোট কৃষকেরা—দখল করল স্বাধীন চাষীদের জায়গা, অন্য দিকে তখন, রাষ্ট্রীয় ভূ-সম্পত্তি অপহরণের পরে, সাধারণ জমি গুলির এই ধারাবাহিক লুণ্ঠন বৃহৎ জোতগুলিকে আরো স্ফীতকায় করে তুলতে এবং কৃষি-জনসংখ্যাকে কারখানা-শিল্পের সর্বহারা হিসাবে মুক্ত করে দিতে সাহায্য করল; স্ফীতকায় জোতগুলিই অষ্টাদশ শতকে অভিহিত হত ‘মূলধন জোত’[১৭] বা বণিক জোত[১৮] বলে।
যাই হোক, উনিশ শতকের মত আঠারো শতক তত সম্পূর্ণ ভাবে জাতীয় সমৃদ্ধি এবং জনগণের দারিদ্র্যের মধ্যে অভিন্নতাটা ধরতে পারেনি। আমার সামনে যে বিপুল পরিমাণ তথ্যসম্ভার রয়েছে, তা থেকে কয়েকটি অনুচ্ছেদ আমি এখানে উদ্ধৃত করছি, যেগুলি তৎকালীন ঘটনাবলীর উপরে প্রভূত আলোক সম্পাত করবে। একজন ক্রুদ্ধ ব্যক্তি লিখছেন, “হার্টফোর্ডশায়ারের বেশ কয়েকটি প্যারিশে, গড়ে ৫০ থেকে ১৫০ একর জমির অধিকারী, এমন ২৪টি জোতকে গলিয়ে তিনটি জোতে পরিণত করা হয়েছে।”[১৯] “নর্দাম্পটনশায়ার এবং লেইসেস্টারশায়ারে সাধারণ জমির পরিবেষ্টন খুব বিরাট আয়তনে সংঘটিত করা হয়েছে, এবং, পরিবেষ্টনের ফলে সৃষ্ট নোতুন জমিদারি গুলির অধিকাংশকেই পরিবর্তিত করা হয়েছে চারণ-জমিতে, যার ফলে, আগে যে-সব জমিদারিতে বছরে ১,৫০০ একর পর্যন্ত আবাদ হত, এখন সেগুলির বেশির ভাগেই ৫০ একরের বেশি আবাদ হয় না। আগেকার বাড়ি-ঘর, গোলাবাড়ি, আস্তাবল ইত্যাদির ধ্বংসাবশেষগুলিই কেবল এখন পড়ে রয়েছে আগেকার অধিবাসীদের চিহ্ন হিসাবে।” কতকগুলি বেষ্টনমুক্ত গ্রামে এক শ’ বাড়ি ও পরিবারকমে দাড়িয়েছে আট-দশটিতে। ……মাত্র ১৫-২০ বছর ধরে বেষ্টন করা হয়েছে এমন সব প্যারিশের জমি-মালিকের সংখ্যা সেগুলির বেষ্টন-মুক্ত অবস্থায় সেখানে যত সংখ্যক জমির মালিক বাস করত, তার তুলনায় অনেক কম। চার-পাঁচজন বিত্তবান মেষপালকের পক্ষে একটা বিশালাকার বেষ্টনভুক্ত জমিদারি আত্মসাৎ করে নেওয়া মোটেই বিরল ঘটনা নয়—এমন একটি জমিদারি যা আগে ছিল ২০-৩০ জন জোত মালিক এবং সমসংখ্যক প্রজা ও ক্ষুদ্র স্বত্বাধিকারীর হাতে। এর ফলে, এরা সকলেই তাদের নিজেদের পরিবারবর্গ এবং, যারা প্রধানতঃ তাদের দ্বারাই কর্ম-নিযুক্ত ও পরিপোষিত হয়, তাদেরও পরিবারবর্গ সহ জীবিকা থেকে উচ্ছিন্ন হয়।[২০] প্রতিবেশী জমিদারদের দ্বারা, বেষ্টনের অছিলায়, কেবল যে পতিত জমিই দখলীকৃত হত, তা নয়, সেই সঙ্গে যৌথ ভাবে কর্ষিত কিংবা যৌথ-সমাজের কাছ থেকে নির্দিষ্ট-পরিমাণ খাজনার বিনিময়ে অধিকার প্রাপ্ত জমিও দখলীকৃত হত। “যে-সব খোলা মাঠ ও জমির ইতিমধ্যেই উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, আমি এখানে সেগুলির কথাই উল্লেখ করছি। এমনকি পরিবেষ্টনের পক্ষ সমর্থক লেখকেরা পর্যন্ত স্বীকার করেন যে এই হ্রাস-প্রাপ্ত গ্রামগুলি জোতের উপরে একচেটিয়া মালিকানা বাড়িয়ে দেয়, খাদ্য-দ্রব্যাদির দাম চড়িয়ে দেয় এবং জনশূন্যতা সৃষ্টি করে এবং এমনকি পড়ো জমি ঘিরে দেওয়ার ব্যাপারটা পর্যন্ত (যা এখন করা হচ্ছে), দরিদ্র জনগণকে তাদের জীবিকা থেকে আংশিক ভাবে বঞ্চিত করে তাদের উপরে আঘাত করছে, এবং বৃহৎ জোতগুলিকে আরো বৃহত্তর করে তুলছে।”[২১] আঃ প্রাইস বলেন, “এই জমি চলে যায় কয়েকজন বৃহৎ কৃষকের হাতে; এর ফল অবশ্যই এই হবে যে ক্ষুদ্র কৃষকেরা ( আগে তিনি যাদের অভিহিত করেছেন “ক্ষুদ্র স্বত্বা ধিকারীদের এবং তাদের প্রজাদের এক-সমষ্টি বলে, যে-প্রজারা তাদের নিজেদেরকে ও পরিবারবর্গকে পোষণ করে তাদের অধিকৃত জমির ফসল, যৌথ জমিতে পালিত ভেড়া, হাঁস-মুর্গী, শুয়োর ইত্যাদির দ্বারা এবং, সেই কারণে, যাদের প্রাণ-ধারণের কোন দ্রব্যসামগ্রী কেনার কোনো দরকার পড়ত না”) রূপান্তরিত হত এমন এক দল লোকে যারা তাদের জীবিকা অর্জন করত অপরের জন্য কাজ করে, এবং যাদের যেকোনো জিনিসের দরকার হলেই বাজারে যেতে হত ॥…… সম্ভবতঃ শ্রমের সরবরাহ বেড়ে যাবে কেননা তার জন্য জবরদস্তি বেড়ে যাবে। শহর ও কল-কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, কেননা আশ্রয় ও কাজের খোঁজে আরো বেশি বেশি মানুষ সেখানে তাড়িত হবে। এই ভাবেই জোতগুলিকে আত্মসাৎ করার ঘটনা স্বাভাবিক ভাবে ঘটে। আর এই ভাবেই এই প্রক্রিয়া অনেক বছর ধরে এই রাজ্যে কার্যতঃ ঘটে আসছে।[২২] জমি ঘেরাওয়ের ফলাফল তিনি এই ভাবে সংক্ষেপে বিবৃত করেন, “মোটের উপরে, নিচু পর্যায়ের লোকদের অবস্থা সব দিক দিয়েই আরো খারাপের দিকে পরিবর্তিত হয়। জমির ক্ষুদ্র অধিকারী থেকে তারা পর্যবসিত হয় দিন-মজুর ও ভাড়াটে কর্মীতে; এবং সেই একই সময়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ হয়ে ওঠে আরো কঠিন।[২৩] বস্তুত পক্ষে, সাধারণ জমির জবরদখল এবং সেই সঙ্গে কৃষিকর্মে তার সহগামী বিপ্লব কৃষি-শ্রমিকদের উপরে এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল যে, এমনকি ইডেন-এরও মতে, ১৭৬৫ এবং ১৭৮০-এর মধ্যে তাদের মজুরি ন্যূনতম সীমারও নীচে নেমে গেল এবং সরকারি গরিব-আইনের ত্রাণ-সাহায্য দ্বারা তা পরিপূরণ করার প্রয়োজন দেখা দিল। তিনি বলেন, তাদের মজুরি, “জীবনের পরম প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের পক্ষে যথেষ্টর তুলনায় বেশি ছিল না।”
