এমনকি সপ্তদশ শতকের সর্বশেষ দশকেও, চাষী-সম্প্রদায় স্বাধীন চাষী-কর্মীদের এই শ্ৰেণীটি ছিল কৃষক-মালিকদের চেয়ে সংখ্যাধিক। তারাই ছিল ক্রমওয়েলের শক্তির মেরুদণ্ড এবং, এমনকি মেকলের স্বীকৃতি অনুসারেও, মাতাল জমিদারেরা এবং তাদের সেবাদাস গ্রামীণ যাজকেরা, যারা বাধ্য হত তাদের প্রভুদের পরিত্যক্ত রক্ষিতাদের বিয়ে করতে, তারা এদের সঙ্গে তুলনায় দাড়াতে পারত না। ১৭৫-এর নাগাদ এই চাষী-সম্প্রদায়ের অবলুপ্তি ঘটে গিয়েছিল[১১] এবং সেই সঙ্গে অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল কৃষি-শ্রমিকের এজমালি জমির শেষ চিহ্নটুকু। কৃষি-বিপ্লবের বিশুদ্ধ অর্থ নৈতিক কারণগুলি আমরা এখানে এক পাশে সরিয়ে রাখছি। আমরা আলোচনা করছি কেবল জোর-জবরদস্তিমূলক পদ্ধতিগুলির কথা, যেগুলি তখন প্রযুক্ত হত।
স্টুয়ার্টদের প্রত্যাবর্তনের পরে ভূ-সম্পত্তির মালিকেরা, আইন-সঙ্গত পথে, এক জবর-দখল সংঘটিত করল-ইউরোপীয় ভূখণ্ডে যা সর্বত্র সংঘটিত হয়েছে আইনগত কোনো অনুষ্ঠান ব্যতিরেকেই। তারা জমির সামন্ততান্ত্রিক ভোগ-দখলের শত ইত্যাদির অবলুপ্তি ঘটাল অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাছে তার যাবতীয় বাধ্য-বাধকতা থেকে নিষ্কৃতি পেল; চাষী-সম্প্রদায় ও জনসাধারণের বাকি অংশের উপর কর চাপিয়ে দিয়ে “ক্ষতিপূরণ করে দিল”; যে-ভূসম্পত্তির উপরে তাদের ছিল নিছক একটা সামন্ততান্ত্রিক অধিকার, তার উপরে নিজেদের জন্য আধুনিক ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করল; এবং, সর্বশেষে, ভূমি-ব্যবস্থা সংক্ৰান্ত সেই সব আইন রচনা করল, খুটিনাটি ব্যাপারে দরকার মত রদবদলের পরে, যেগুলি ইংরেজ কবি-শ্রমিকের উপরে একই ফলাফল বিস্তার করবে, যা করেছিল টার্টার ববিস গুনফ-এর অনুশাসন রুশ চাষী-সম্প্রদায়ের উপরে।
“মহিমাময় বিপ্লব” উইলিয়ম অব অরেঞ্জ-কে ক্ষমতায় আনার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতায় নিয়ে এল উদ্বৃত্ত-মূল্যের আত্মসাৎকারী জমিদার ও ধনিকদের।[১২] তারা উদ্বোধন করল বিশাল আয়তনে রাষ্ট্রীয় ভূমি-সম্পত্তির অপহরণ, যা এতকাল চলে আসছিল সীমিত মাত্রায়। এই সম্পত্তিগুলি দিয়ে দেওয়া হত, হাস্যকর দামে বেচে দেওয়া হত কিংবা সরাসরি দখল করে ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হত। [১৩]আইনগত শিষ্টাচারের প্রতি সামান্যতম স্বীকৃতি ব্যতিরেকেই এই সব কিছু ঘটল। এই ভাবে প্রতারণাপূর্বক করায়ত্ত করা রাষ্ট্রীয় জমি-জমা এবং সেই সঙ্গে গীর্জার ভূমিসম্পত্তির লুণ্ঠন–যতদূর পর্যন্ত তা আবার প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে হাত ছাড়া হয়নি—চনা করে দিল আজকের দিনের ইংরেজ অভিজাত-গোষ্ঠীর রাজকীয় ভূম্যধিকারগুলির ভিত্তি।[১৪] বুর্জোয়া ধনিকেরা যে এই কর্মকাণ্ডটিকে সমর্থন করল, তার অন্যতম উদ্দেশ্য হল জমিতে অবাধ বাণিজ্যের বিস্তার সাধন, বৃহদাকার জোত-ব্যবস্থার ভিত্তিতে আধুনিক কৃষিকর্মের সম্প্রসারণ, এবং হাতের কাছে মজুদ মুক্ত কৃষিমজুরদের সরবরাহের বৃদ্ধি সাধন। তা ছাড়া এই নোতুন ভৌমিক অভিজাত-তন্ত্র ছিল আবার নোতুন ব্যাংক-তন্ত্রের, নোতুন ডিম-ফোটা বৃহৎ-অর্থের এবং, তখনো সংরক্ষণমূলক কর-ব্যবস্থার উপরে নির্ভরশীল, বৃহৎ কারখানা-মালিকের স্বাভাবিক মিত্র। নিজেদের স্বার্থে ইংরেজ বুর্জোয়া-শ্রেণী সম্পূর্ণ বিচক্ষণতার সঙ্গেই কাজ করেছিল, যেমন করেছিল সুইডিশ বুর্জোয়া-শ্রেণী যারা, প্রক্রিয়াকে বিপরীত মুখে ঘুরিয়ে দিয়ে, তাদের অর্থ নৈতিক মিত্র চাষী-সমাজের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে, রাজাকে সাহায্য করেছিল অভিজাতবর্গের হাত থেকে সরকারের খাস জমি জোর করে পুনরুদ্ধার করতে। এই ঘটনা ঘটে ১৬০৪ সাল থেকে, দশম চার্লস এবং একাদশ চার্লস-এর রাজত্বকালে।
উল্লিখিত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি থেকে এজমালি সম্পত্তি সব সময়েই আলাদা। এজমালি সম্পত্তি হল একটি টিউটনিক প্রতিষ্ঠান, যা সামন্ততন্ত্রের আবরণে প্রচলিত ছিল। আমরা দেখেছি কিভাবে এই সম্পত্তির জোর-জবরদস্তিমূলক দখল, যা সাধারণত আবাদি জমির গোচর জমিতে রূপান্তরিত করার সঙ্গে একযোগে চলত, তার শুরু হয়েছিল পঞ্চদশ শতকের শেষাশেষি এবং চলেছিল ষোড়শ শতক অবধি। কিন্তু সে সময়ে এই প্রক্রিয়াটি সাধিত হত ব্যক্তিগত হিংসাকাণ্ডের সাহায্যে, যার বিরুদ্ধে আইন দেড়শ বছর ধরে বৃথাই লড়াই করেছিল। অষ্টাদশ শতকে যে-অগ্রগতি ঘটে তা প্রকাশ পায় এই ঘটনায় যে, তখন খোদ আইনটা নিজেই পরিণত হল জনগণের জমি অপহরণের হাতিয়ারে, যদিও বড় বড় জোত-মালিকের। সেই সঙ্গে তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পদ্ধতিগুলিও ব্যবহার করত।[১৫] লুণ্ঠনের সংসদীয় রূপটি হল সাধারণ জমির পরিবেষ্টন-সংক্রান্ত আইনগুলি, অর্থাৎ সেই বিধানগুলি যার বলে জমিদারেরা সর্ব সাধারণের জমিগুলি নিজেদেরকে দান করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে। স্যর এফ এম. ইডেন প্রথমে তার বিশেষ চাতুর্যপূর্ণ ওকালতিতে সাধারণ সম্পত্তিতে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন সামন্ত প্রভুদের স্থান-গ্রহণকারী বৃহৎ জমিদারবর্গের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে; তার পরে নিজেই আবার তা খণ্ডন করেন যখন তিনি সাধারণ জমিগুলি ঘেরাও করার জন্য একটা ব্যাপক আইন প্রণয়নের দাবি করেন (এবং এই ভাবে স্বীকার করে নেন যে, সেগুলিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার জন্য একটি সংসদীয় কু-দেতা’-র [ ‘জোর-কেরামত’-এর দরকার ] এবং, তদুপরি, জমি থেকে উৎখাত গরিবদের ক্ষতিপূরণ দানের জন্য আইনসভার কাছে আহ্বান জানান।[১৬]
