এই বিপ্লবে আইন সন্ত্রস্ত বোধ করল। তা এখনো সভ্যতার এই শিখরে ওঠেনি যেখানে “জাতির সম্পদ” (অর্থাৎ মূলধনের গঠন এবং জনসাধারণের বেপরোয়া শোষণ ও বঞ্চনা) সমগ্র রাষ্ট্রপরিচালনার চরম লক্ষ্য হয়ে দাড়িয়েছে। তার সপ্তম হেনরির ইতিহাসে বেকন লিখেছেন, “সেই সময় (১৪৮৯) জমি-ঘেরাও আরো ঘন ঘন হতে শুরু করে, যার দ্বারা আবাদি জমি (লোকজন ও পরিবার ব্যতীত যেগুলিকে সার দেওয়া যায়নি) পরিবর্তিত হল চারণভূমিতে, কয়েক জন রাখাল দিয়ে যা অনায়াসেই পরিষ্কার করানো যেত, এবং বহুবার্ষিক পুরুষানুক্রমিক ও ইচ্ছাধীন প্রজাস্বত্বগুলি (যার উপরে বেঁচে থাকত চাষীসম্প্রদায়ের বেশির ভাগ) পরিণত হল খাসমহলে। এর ফলে দেখা দিল তোক এবং (তার ফলে) শহর, গীর্জা, গীর্জা-কর ইত্যাদিতে অবক্ষয়। …এর প্রতিকার কল্পে রাজার এবং তৎকালীন পালমেন্টের প্রজ্ঞা প্রশংসনীয়। তাঁরা জনসংখ্যা-নাশক ভূমি-বেষ্টনের এবং জনসংখ্যা-নাশক পশু চারণের অধিকার প্রত্যাহার করে নেবার একটা পন্থা অবলম্বন করলেন। ১৯৮৯ সালে সপ্তম হেনরির একটি আইন (১৯) অন্তত ২০ একর জমির অধিকারী এমন সমস্ত “কৃষি-খামারের বাড়ি-ঘর-ধ্বংস করা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে। আরেকটি আইন (২৫) জারি করে, ঐ একই আইনকে নবীকৃত করা হয়। অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে এই আইনে বিবৃত করা হয় যে, বহুসংখ্যক খামার এবং গবাদি পশুর, বিশেষ করে মেষের, পাল কতিপয় ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, এবং তার ফলে জমির খাজনা দারুণ ভাবে বর্ধিত হয়েছে, কৃষির আয়তন হ্রাস পেয়েছে, গীর্জা ও বাসগৃহ ধ্বংস করা হয়েছে, এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ যার দ্বারা তাদের নিজেদেরকে ও তাদের পরিবারবর্গকে পরিপোষণ করত সেই সব উপায় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অতএব, এই আইন ধ্বংসপ্রাপ্ত খামারবাড়িগুলির পুননির্মাণের আদেশ জারি করছে, ফসলী জমি ও গোচর-জমির মধ্যে একটা অনুপাত নির্ধারিত করে দিচ্ছে ইত্যাদিতে। ১৫৫৩ সালের আইনে উল্লেখ করা হয় যে, এমন কয়েকজন আছে যারা ২৪,০০০ ভেড়ার মালিক; ঐ আইন মালিকানাধীন ভেড়ার সংখ্যা সীমিত করে দেয় ২০০০-এ।[৪] ক্ষুদ্র কৃষক ও চাষীদের উৎখাত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার দাবি এবং এই আইন-প্রণয়ন উভয়েই সমভাবে, সপ্তম হেনরির মৃত্যুর ১৫০ বছর পরে পর্যন্তও নিল বলে প্রতিপন্ন হল। এই নিষ্ফলতার কারণ বেকন নিজের অগোচরেই প্রকাশ করে ফেলেছেন। “এসেজ : সিভিল অ্যাণ্ড মর্যাল” (“প্রবন্ধাবলী : রাষ্ট্রিক ও নৈতিক” ) নামক তঁার গ্রন্থে বেকন বলেন ( প্রবন্ধ, ২৯) “রাজা সপ্তম। হেনরির পরিকল্পনাটি ছিল প্রাজ্ঞ ও প্রশংসনীয়; সেটি ছিল কৃষিকর্মের খামার ও বাড়িগুলিকে একটি মানে নিয়ে আসা, যে-মানটিকে রক্ষা করা হবে জমির এমন একটা অনুপাত সেগুলির জন্য ধার্য করে দিয়ে, যাতে একজন প্রজা দাস-সুলভ হীন অবস্থার মধ্যে না থেকে, বাস করে স্বচ্ছল প্রাচুর্যের পরিবেশে এবং লাঙল কেবল ভাড়াটেদের হাতে না গিয়ে থেকে যায় মালিকদের হাতে,”[৫] অন্য দিকে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা যা দাবি করত তা হল বিপুল জনসমষ্টির জন্য একটি অধঃপতিত ও প্রায় দাস-সুলভ অবস্থা, ভাড়াটে শ্রমিক হিসাবে তাদের এবং মূলধন হিসাবে তাদের শ্রম-উপকরণ-সমূহের রূপান্তর। এই রূপান্তরের কালে আইনও চেষ্টা করে কৃষি-মজুরি-শ্রমিকের কুটিরের সঙ্গে ৪ একর জমি রাখতে এবং তাকে নিষেধ করে দেওয়া হয় সে যেন কোন আবাসিককে গ্রাহক না করে। প্রথম জেমসের রাজত্বকালে, ১৬২৭ সালে, ফ্রন্ট মিল এর রজার ক্রকার-কে নিন্দা করা হয় কেননা তিনি ফ্রন্ট মিলের জমিদারিতে এমন একটি কুটির নির্মাণ করেন যার সঙ্গে ৪ একর জমির মৌসী পাট্টা সংলগ্ন ছিল না। এমন কি প্রথম চালস-এর আমলে এই ১৬৩৯ সাল পর্যন্ত একটি রাজকীয় কমিশন। নিয়োগ করা হয়, যাতে করে পুরনো আইনগুলি, বিশেষ করে ৪ একর সংক্রান্ত আইনটি, কার্যকরী করা যায়। এমনকি, ক্রমওয়েল-এর সময়েও লণ্ডনের ৪ মাইলের মধ্যে বাডি-নির্মাণ নিষিদ্ধ ছিল, যদি তার সঙ্গে ৪ একর জমি যুক্ত না থাকত। আঠারো। শতকের প্রথমার্ধেও কৃষি-শ্রমিকের কুটিরের সঙ্গে ২ বা ১ একর জমি না থাকলে নালিশ করা হত। আর এখন তো সে ভাগ্যবান, যদি সে পায় একটা ছোট বাগান কিংবা ভাড়া করতে পারে কয়েক ‘রুড জমি বাড়ি থেকে অনেক দূরে। ডঃ হান্টার বলেন, ‘জমিদার এবং জোত-মালিক এখানে হাতে হাত রেখে কাজ করে। বাড়ির সঙ্গে কয়েক একর জমি শ্রমিককে করে তুলবে অতিরিক্ত স্বাধীন। [৬]
ষোড়শ শতকে ‘সংস্কার আন্দোলন’ (রিফর্মেশন’) এবং তজ্জনিত গীর্জা-সম্পত্তির লুণ্ঠন ও ধ্বংস-সাধনের ফলে জমি থেকে মানুষের সবলে উৎপাটনের প্রক্রিয়ায় এক ভয়াবহ প্রেরণা সঞ্চারিত হল। সেই আন্দোলনের সময়ে ক্যাথলিক গীর্জা ছিল ইংল্যাণ্ডের জমির এক বিরাট অংশের সামতান্ত্রিক মালিক। মঠগুলির অবসান ঘটাবার পরে সেগুলির অধিবাসীরা সর্বহারাদের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হল। গীর্জার ভূ সম্পত্তিগুলির একটা বড় অংশ রাজার লোভাতুর প্রিয়পাত্রদের মধ্যে বিলি করে দেওয়া হল কিংবা ফাটকাবাজ খামার-মালিক ও নাগরিকদের কাছে নামমাত্র দামে বেচে দেওয়া হল, যারা পুরুষানুক্রমিক উপস্বত্বভোগীদের দলে দলে উৎখাত করে দিল এবং তাদের জমিগুলি একটি অখণ্ড জোতে পরিণত করল। গীর্জা-করের এখতিয়ারের এক অংশে অবস্থিত, আইনের দ্বারা নিশ্চয়ীকৃত লোকজনের জমি বিনা-বাক্যে বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হল।[৭] ইংল্যাণ্ডের মধ্য দিয়ে এক সফরের পরে রানী এলিজাবেথ চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, “Pauper ubique jacet.” তাঁর রাজত্বের ৪৩-তম বছরে একটি গরিব কর প্রবর্তন করে জাতি নিঃস্বতাকে সরকারি ভাবে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হল। “মনে হয়, এই আইনের প্রণেতার। এর কারণগুলি বিবৃত করতে লজ্জা বোধ করেছিলেন, কেননা, চিরাচরিত প্রথা অনুসারে আইনের যে-প্রস্তাবনা দেওয়া হয়, এক্ষেত্রে তা দেওয়া হয়নি।[৮] প্রথম চালস-এর ১৬তম বিধানের ৪র্থ অনুচ্ছেদের দ্বারা এটাকে চিরস্থায়ী বলে ঘোষণা করা হয় এবং, বস্তুতঃ পক্ষে, কেবল ১৮৩৪ সালেই। এটা একটা নোতুন ও কঠোরতর রূপ ধারণ করে।[৯] সংস্কার আন্দোলনের এই আশু ফলগুলি কিন্তু তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ফল হয়নি। ভূমি-সম্পত্তির প্রথাগত অবস্থা গুলির ধর্মীয় দুর্গ-প্রাচীর ছিল গীর্জার সম্পত্তি। তার পতনের পরে এই অবস্থাগুলি আর দুর্ভেদ্য রইল না।[১০]
