আদিম সঞ্চয়নের ইতিহাসে, সমস্ত বিপ্লবই যুগান্তকারী, যারা কাজ করে ধনতান্ত্রিক শ্ৰেণীটির গড়ে ওঠার পথে অনুপ্রেরক হিসাবে; কিন্তু, সর্বোপরি যুগান্তকারী হল সেই মুহূর্তগুলি যখন বিশাল বিশাল জনসমষ্টি সহসা ও সবলে উৎপাটিত তাদের জীবনধারণের উপায়-উপকরণ থেকে এবং শ্রমের বাজারে নিক্ষিপ্ত হয় মুক্ত ও অসংখ্য “অ সংযুক্ত, সর্বহারা হিসাবে। জমি থেকে কৃষি-উৎপাদকের, কর্ষকের উৎপাটন–এটাই হল সমগ্র প্রক্রিয়াটির ভিত্তি। উৎপাটনের এই ইতিহাস বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করে এবং বিভিন্ন পরম্পরায় এবং বিভিন্ন সময়ে তার পর্যায়গুলির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। একমাত্র ইংল্যাণ্ডেই তা ধারণ করে তার চিরায়ত রূপ, এবং তাকেই আমরা গ্রহণ করি আমাদের দৃষ্টান্ত হিসাবে।[১]
————
১. ইতালি, যেখানে সবচেয়ে আগে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের উন্মেষ ঘটেছিল, সেখানে ভূমিদাস প্রথার অবসানও সবচেয়ে আগে ঘটেছিল। জমিতে কোনো স্বত্বমূলক অধিকার পাবার আগেই সেখানে ভূমিদাস মুক্তি পেয়ে গিয়েছিল। তার মুক্তি সঙ্গে সঙ্গেই তাকে একজন স্বাধীন সর্বহারায় পরিণত করল, তা ছাড়া, সে সঙ্গে সঙ্গেই শহরে তার মনিবকে প্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে গেল। যখন বিশ্ববাজারের বিপ্লব পঞ্চদশ শতকের শেষাশেষি উত্তর ইতালির বাণিজ্যিক আধিপতাকে ধ্বংস করে দিল, তখন উলটোমুখী একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। শহরের শ্রমিকেরা দলে দলে গ্রামে বিতাড়িত হল এবং উদ্যানরচনার মত সুকুমার সংস্কৃতি’-কে প্রেরণা যোগাল, যে-সংস্কৃতি আগে কখনো দেখা যায়নি।
২৭. জমি থেকে কৃষি-জনসংখ্যার উৎপাটন
সপ্তবিংশ অধ্যায়– জমি থেকে কৃষি-জনসংখ্যার উৎপাটন
ইংল্যাণ্ডে চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগেই ভূমিদাস-প্রথা কার্যতঃ অন্তর্হিত হয়ে যায়। তখন, এবং আরো বেশি মাত্রায় পঞ্চদশ শতাব্দীতে, জনসংখ্যায় সুবিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই[১] গঠিত ছিল মুক্ত কৃষক স্বত্বাধিকারীদের দিয়ে তাদের সম্পত্তির অধিকার সামন্ততান্ত্রিক যেনামের পিছনেই লুক্কায়িত থাকনা কেন। বৃহত্তর জমিদারগুলিতে, প্রাচীন বেইলিফ’, যে নিজেই ছিল একজন ভুমিদাস, তার স্থান গ্রহণ করল মুক্ত কৃষক। কৃষিকর্মের মজুরি শ্রমিকদের একটা অংশ গঠিত ছিল ক্ষুদ্র কৃষকদের নিয়ে, যারা অবসর সময়টার সদ্ব্যবহার করত বড় বড় জমিদারিতে কাজ করে; আরেকটা অংশ গঠিত ছিল মজুরি শ্রমিকদের একটি স্বাধীন বিশেষ শ্রেণীকে নিয়ে, যাদের সংখ্যা ছিল আপেক্ষিক ও অনাপেক্ষিক উভয় দিক থেকেই স্বল্প। এই দ্বিতীয়োক্তরা আবার ছিল চাষী-মালিক, যেহেতু মজুরি ছাড়াও তারা তাদের জন্য বরাদ্দ করত কুটির-সমেত ৪ বা ততোধিক একর আবাদযোগ্য জমি। তা ছাড়া বাকি চাষীদেরও সঙ্গে তারাও ভোগ করত এজমালি জমিতে উপস্বত্ব, যা তাদের দিত গো-চারণের সুবিধা, যোগাত কাঠ, আলানি, ঘেসো জমির চাপড়া ইত্যাদি।[২] ইউরোপের সমস্ত দেশে সামন্ত তান্ত্রিক উৎপাদনের বৈশিষ্ট্য ছিল যথাসম্ভব অধিক সংখ্যক সামন্ত-প্ৰজার মধ্যে জমির বিলি-বন্দোবস্ত। সার্বভৌমের মত সামন্ত-প্রভুর পরাক্রম খাজনা-তালিকার দৈর্ঘ্যের উপরে নির্ভর করত না, নির্ভর করত তার প্রজাদের সংখ্যার উপরে এবং সেটা আবার নির্ভর করত চাষী-মালিকদের সংখ্যার উপরে।[৩] অতএব যদিও নর্মান-বিজয়ের পরে ইংরেজদের দেশটি বিভক্ত করা হয়েছি বিশাল বিশাল সামন্ত-রাজ্যে, যাদের এক একটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ৯০০টির মত পুরানো ইঙ্গ-স্যাক্সন তালুক, তা সমাকীর্ণ ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাষীদের সম্পত্তিতে এবং সেগুলির মধ্যে মধ্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কতিপয় বৃহদাকার জমিদারিতে। এই অবস্থা এবং সেই সঙ্গে শহরগুলির ঐশ্বর্য, যা ছিল পঞ্চদশ শতাব্দীর স্বকীয় বৈশিষ্ট্য—এই দুয়ের কল্যাণে সম্ভব হয়েছে জনগণের সেই সমৃদ্ধি, যার চিত্র এত প্রজ্জ্বল চ্যান্সেলর ফর্টে একেছেন তার “লড়স লেগাম অ্যাঙ্গলি” নামক গ্রন্থে।
বিপ্লবের যে-প্রস্তাবনা, যা সূচিত করল ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির, তা অভিনীত হয়েছিল পঞ্চদশ শতকের শেষ তৃতীয় ভাগে এবং ষোড়শ শতকের প্রথম দশকে। যাদের সম্পর্কে স্যর জেমস স্টুয়ার্ট সঠিক ভাবেই বলেছে, “সর্বত্রই বিনা-প্রয়োজনে ভর্তি করে আছে গৃহ এবং সৌধ”-সামন্তপ্রভুদের এমন পোয় বাহিনীকে দলে দলে ভেঙ্গে দেওয়ার মুক্ত সর্বহারাদের একটা বিরাট সমষ্টি শ্রমের বাজারে নিক্ষিপ্ত হল। যদিও রাজশক্তি, যা নিজেই ছিল বুর্জোয়া বিকাশের ফল, তার নিরংকুশ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অভিযানে এই পোয়-বাহিনীগুলির ভাঙ্গনের প্রক্রিয়াকে সবলে ত্বরান্বিত করল, তা হলেও সেটাই একমাত্র কারণ ছিল না। রাজা ও পার্লামেন্টের সঙ্গে উদ্ধত সংঘর্ষে, বৃহৎ সামন্ত-প্রভুর এজমালি জমি জবর দখল করে এবং জমি থেকে চাষী-সমাজকে জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে সৃষ্টি করেছিল এক অতুলনীয় ভাবে বিরাট সর্বহারা-শ্রেণীকে, অথচ ঐ জমিতে অদের মত ঐ চাষীদেরও ছিল সমান সামন্ততান্ত্রিক অধিকার। ফ্লেমিশ পশম-শিল্পের দ্রুত অভ্যুদয় এবং সেই সঙ্গে ইংল্যাণ্ডে পশমে দামে উর্ধ্বগতি এই উচ্ছেদের কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ প্রেরণা যুগিয়েছিল। বিরাট বিরাট সামন্ততান্ত্রিক যুদ্ধ ইতিপূর্বেই প্রাচীন অভিজাতবর্গকে গ্রাস করে ফেলেছিল। নতুন অভিজাতবর্গ হল যুগের সন্তান, যার কাছে অর্থই হল সব ক্ষমতার সেরা ক্ষমতা। সুতরাং, আবাদী জমিকে মেষ-চারণে রূপান্তরিত করার সোচ্চার ঘোষণা ধ্বনিত হল তার কণ্ঠে। হারিসন তার “ডেস্ক্রিপশন অব ইংল্যাণ্ডে, প্রেফিক্সড টু ইলিনশেড’স ক্রনিক্স (“ইংল্যাণ্ডের বর্ণনা, ইলিনশেড-এর ধারাবিবরণীর ভূমিকা” নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন ক্ষুদ্র চাষীদের এই উৎপাটনের ফলে কিভাবে দেশের সর্বনাশ ঘটছে। “আমাদের মহামান্য জবর-দখলকারীদের পরোয়া কি? চাষীদের বাসা-বাটি আর শ্রমিকদের কুটিরগুলিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা ভেঙ্গে পড়ার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। হারিসন বলেন, “যদি প্রত্যেকটি তালুকের নথিপত্র দাবি করা হয় তা হলে অবিলম্বেই দেখা যাবে যে, কতকগুলি তালুকে সতের, আঠারো, এমনকি কুড়িটি পর্যন্ত বাড়ি ধ্বংস হয়েছে ইংল্যাণ্ড আর কখনো জনবসতি এত কমে যায়নি, যা এখন হয়েছে। শহর আর জনপদে হয় একেবারই ক্ষয় পেয়েছে, আর নয়তো এক-চতুর্থাংশের বেশি, এমনকি, অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে, যদিও কয়েক টিতে এখানে সেখানে কিছু বৃদ্ধি ঘটতে পারে; জনপদগুলিতে বাসা-বাড়িগুলিকে ভেঙে দিয়ে মেষ-চারণে পরিণত করা হয়েছে, একমাত্র সামন্তপ্রভুর বাড়ি ছাড়া আর কিছুই সেখানে দাড়িয়ে নেই। আমি আরো বলতে পারি।” এই পুরাতন বিবরণদাতাদের নালিশগুলি সব সময়েই অতিরঞ্জিত, কিন্তু উৎপাদনের অবস্থায় বিপ্লবের ফলে তৎকালীন মানুষদের মনে কী প্রতিক্রিয়া ঘটেছিল, এগুলিতে তার বিশ্বস্ত প্রতিফলন ঘটে। চ্যান্সেলর ফর্টে এবং টমাস মোর-এর লেখাগুলিকে তুলনা করলে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর ব্যবধানটা ধরা পড়ে। যে কথা থর্নটন সঠিক ভাবেই বলেছেন, “ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণীকে তার স্বর্ণযুগ থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল লৌহযুগে অতিক্রমণের কোনো পর্যায় ব্যতিরেকেই।”
