মূল্য-আয়তন এবং দামের মধ্যে অর্থাৎ মূল্য-আয়তন এবং তার অর্থ-রূপের মধ্যে অসঙ্গতির সম্ভাব্যতার সঙ্গেই যে কেবল এই দাম-রূপ নিজেকে মানিয়ে নেয় তা-ই নয়, একটা গুণগত অসঙ্গতিকেও তা লুকিয়ে রাখে লুকিয়ে রাখে এত দূর পর্যন্ত যে, যদিও অর্থ পণ্যসামগ্রীর মূল্য-রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়, তা হলেও দাম এই মূল্য প্রকাশের কাজ থেকেই পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়ে। বিবেক, মর্যাদা ইত্যাদির মতো বিষয় যেগুলি নিজের কোনো পণ্যই নয়, এমনকি সেগুলিকেও তাদের অধিকারীরা। বিক্রয়ের জন্য উপস্থিত করতে পারে এবং এইভাবে এগুলি নিজেদের দামের মারফৎ পণ্যের রূপ অর্জন করতে পারে। সুতরাং মূল্য না থাকলেও একটা বিষয়ের দাম থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে দাম হচ্ছে কাল্পনিকগণিত বিজ্ঞানের কতকগুলি রাশির মতো। অন্য দিকে এই কাল্পনিক দাম রূপ আবার কখনো কখনো লুকিয়ে রাখিতে পারে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোন সত্যকার মূল্য-রূপকে, যেমন ধরা যাক অকর্ষিত জমির দাম, যার কোনো মূল্য নেই, কেননা কোন মনুষ্য-শ্ৰম তাতে বিধৃত হয়নি।
সাধারণভাবে আপেক্ষিক মূল্যের মতো দামও আমাদের বলে দেয় যে সমার্থ সামগ্রীটির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ( যথা এক আউন্স সোনা ) সরাসরি লোহার সঙ্গে বিনিময়ে এবং এইভাবে দাম কোন পণ্যের (যথা এক টন লোহার ) মূল্য প্রকাশ করে। কিন্তু তা কখনো এর বিপরীতটি প্রকাশ করে না, বলেনা যে লোহা সোনার সঙ্গে সরাসরি বিনিময়ে। সুতরাং, একটি পণ্য যাতে কার্যক্ষেত্রে বিনিময় মূল্য হিসেবে কার্যকরীভাবে কাজ করতে পারে, সেইহেতু তাকে তার দেহরূপ পরিহার করতে হবে, নিজেকে রূপান্তরিত করতে হবে নিছক কাল্পনিক সোনা থেকে বাস্তবিক সোনায়-যদিও ‘আবশ্যিকতা থেকে স্বাধীনতায়’ রূপ-পরিগ্রহণের হেগেলীয় ধারণাটির তুলনায় অথবা একটি চিংডিমাছের পক্ষে খোলস ছেড়ে ফেলার তুলনায় সেন্ট জেরোমের পক্ষে অ্যাডাম স্মিথকে ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার তুলনায় কোনো পণ্যের পক্ষে এমন রূপ-পরিগ্রহণ হতে পারে টের বেশি কঠিন। [১৫] যদিও একটি পণ্য (যেমন, লোহা) তার নিজস্ব বাপের পাশাপাশি, আমাদের কল্পনায়, সোনার রূপও ধারণ করতে পারে, তবু কিন্তু তা একই সময়ে বাস্তবে লোহা এবং সোনা—দুই-ই হতে পারে না। এর দাম স্থির করার জন্য, কল্পনায় একে সোনার সঙ্গে সমীকরণ করাই যথেষ্ট। কিন্তু এর মালিকে কাছে লোহ’কে যদি সমার্ঘ সামগ্রীর ভূমিকা পালন করতে হয়, তা হলে তাকে অবশ্যই সত্যকার সোনাকে তার নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। লোহার মালিককে যদি বিনিময়ের জন্য উপস্থাপিত অন্য কোন পণ্যের মালিকের কাছে যেতে হয়, এবং তার হাতের লোহাকে দেখিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে তা-ই হচ্ছে সোনা, তা হলে দান্তেকে স্বর্গে সেন্ট পিটার যে উত্তর দিয়েছিলেন, সেই উত্তরই তাকেও শুনতে হবে, মন্ত্রের মতো উচ্চারিত, সেই উত্তরটি হচ্ছে :
“Assai bene e trascorsa
D’esta moneta gia’ la lega e’l peso.
Ma dimmi se tu l’hai nella tua borsa.”
অতএব একটা দামের নিহিত মানে দুটি; এর মানে এইযে, একটি পণ্য অর্থের সঙ্গে বিনিময়ে এবং, সেই সঙ্গে, এর মানে এ-ও যে, সে এইভাবে অবশ্যই বিনিমিত হবে। অন্যদিকে, যেহেতু সোন। এরই মধ্যে বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে আদর্শ অর্থ-পণ্য হিসেবে, কেবল সেই হেতুই সোনা কাজ করে মূল্যের ভাবগত পরিমাপক হিসেবে। মূল্যের ভাবগত পরিমাপের আড়াল থেকে উকি দেয় নগদ টাকা।
————
১. প্রশ্ন হলো—অর্থ সাসরি শ্রম-সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে না কেন, যাতে করে এক টুকরো কাগজ, ধরা যাক, x-ঘণ্টার শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে—এই প্রশ্নটি মূলতঃ অন্য একটি প্রশ্নেরই ভাবান্তর; সে প্রশ্নটি এই : পণ্যোৎপাদন চালু থাকাকালে উৎপন্ন দ্রব্যাদি কেন আবশ্যিকভাবেই পণ্যের রূপ নেবে? এটা স্বতঃস্পষ্ট, কেননা তাদের পণ্যে রূপ পরিগ্রহণের মানে হচ্ছে তাদের পণ্যে এবং অর্থে পৃথগীভবন। কিংবা, ব্যক্তিগত এম, তথা ব্যক্তিবিশেষদের শ্রম, কেন তার বিপরীত হিসেবে, প্রত্যক্ষত সামাজিক প্রম হিসেবে পরিগণিত হতে পারে না? অন্যত্র আমি পণ্যোৎপাদনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজে এম-অর্থ সম্পর্কিত ইউরোপীয় ধারণাটির সবিস্তার আলোচনা করছি। এই বিষয়ে আমি আর এইটুকুমাত্র বলতে চাই যে ওয়েন-এর শ্রম-অর্থকে অর্থ বলে গণ্য করা এবং একটি থিয়েটার টিকিটকে অর্থ বলে গণ্য করা একই ব্যাপার। ওয়েন ধরে নিয়েছেন সরাসরিভাবে সম্মিলিত শ্রম, যা পণ্যোৎপাদনের সঙ্গে পুরোপুরি অসঙ্গতিপূর্ণ। শ্রমের সার্টিফিকেট হচ্ছে কেবল একটি সাক্ষ্যপত্র, সাধারণ শ্রমে ব্যক্তি-শ্রমিক যে অংশ নিয়েছে তার নিদর্শন। এর জোরে সে পরিভোগর জন্য উদ্দিষ্ট সাধারণ উৎপন্নসম্ভারের অংশ বিশেষের দাবিদার হয়। কিন্তু এটা ওয়েন-এর মাথায় ঢুকছে না যে পণ্যোৎপাদনের অস্তিত্বকে ধরে নিয়ে সেই সঙ্গে অর্থ নিয়ে কথার মারপ্যাচ করা হচ্ছে সেই উৎপাদনেরই আবশ্যিক শর্তগুলিকে এড়িয়ে যাওয়া।
২. বন্য এবং অর্ধসভ্য সঞ্জাতিগুলি (races) জিহ্বাকে ব্যবহার করে ভিন্নতরভাবে। বাফিন বে’-র তীরবর্তী অধিবাসীদের কথা বলতে গিয়ে ক্যাপ্টেন প্যারী বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে ( দ্রব্য-বিনিময়ের ক্ষেত্রে) তারা উপস্থাপিত দ্রব্যটিকে দুবার জিহবা দিয়ে লেহন করে, তারপরেই লেনদেনটি সন্তোষজনক ভাবে নিষ্পন্ন হয়েছে বলে তারা মেনে নেয়। অনুরূপভাবে, ইষ্টার্ণ একিমোরাও বিনিময়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত জিনিসগুলিকে চেটে নিত। উত্তরে যদি জিহ্বাকে এইভাবে ব্যবহার করা হত আত্মীকরণের ইন্দ্রিয় হিসেবে, তাহলে আশ্চর্যের কি আছে যে দক্ষিণে পাকস্থলীকে ব্যবহার করা হত সঞ্চিত সম্পত্তির ইন্দ্রিয় হিসেবে এবং এই কারণেই কোন ‘কাফির’ কারো ধনদৌলতের পরিমাপ করে তার পেটের আয়তন অনুসারে। কাফিররা কি বোঝাতে চায় তা যে তারা জানে তা এ থেকেই বোঝা যায় : ব্রিটিশ সরকারের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রিপোর্টে ১৮৬৪ সালে যখন প্রকাশ পায় যে শ্রমিক শ্রেণীর একটা বড় অংশ চর্বিজাতীয় খাদ্যের অভাবে ভুগছে, তখন জনৈক উ: হার্ভে (রক্ত-সঞ্চলনের আবিষ্কর্তা প্রখ্যাত ডঃ হার্ভে নন) এক বিজ্ঞাপন মারফৎ বুর্জোয়া এবং অভিজাতদের চর্বি কমাবার ব্যবস্থাপত্র প্রচার করেন।
