(৩) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজ-রাজড়ারা অর্থের এমন মাত্রায় অপকর্ষ ঘটিয়েছে যে বিভিন্ন মুদ্রার মূল ওজন সমূহের নামগুলি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না। [৯]
এই সব ইতিহাসগত কারণের দরুণ ওজন-নাম থেকে অর্থ-নামের এই যে বিচ্ছেদ তা সমাজের পক্ষে প্রতিষ্ঠিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। যেহেতু অর্থের মান হচ্ছে একদিক থেকে, নিছকই একটি রীতিগত ব্যাপার এবং অন্যদিক থেকে, তাকে অবশ্যই হতে হয় সাধারণতগ্রাহ, সেইহেতু শেষ পর্যন্ত তা নিয়ন্ত্রিত হয় আইনের দ্বারা। মহার্ঘ ধাতুগুলির মধ্যে একটি ধাতুর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণকে, ধরা যাক, এক আউন্স সোনাকে সরকারীভাবে ভাগ করা হয় বিভিন্ন ভগ্নাংশে, দেওয়া হয় আইনগত সব নাম, যেমন পাউণ্ড, ডলার ইত্যাদি।[১০] এই ভগ্নাংশগুলি তখন থেকে কাজ করতে থাকে অর্থের বিভিন্ন একক হিসেবে; এবং বিভিন্ন উপভাগে বিভক্ত হয়ে পেয়ে থাকে আইনগত সব নাম, যেমন, শিলিং পেনি ইত্যাদি। কিন্তু এইসব ভাগ বিভাগের অগে এবং পরে—উভয় সময়েই কোন একটি ধাতুর নির্দিষ্ট পরিমাণই থাকে ধাতব অর্থের মান। একমাত্র যে পরিবর্তন ঘটে তা হ’ল এই বিভক্তীকরণ আর নামকরণ।
পণ্যের মূল্য ভাবগত ভাবে যে দামে বা সোনার পরিমাণে পরিবর্তিত হয়, তা এখন অভিব্যক্ত হয় মুদ্রার নামে অথবা স্বর্ণ মানের বিভিন্ন উপভাগের আইনগত ভাবে সিদ্ধ নামে। অতএব, এক কোয়ার্টার গম এক আউন্স সোনার সমান, একথা না বলে, আমরা বলি এক কোয়ার্টার গম হ’ল ৩ পা: ১৭ শিঃ ১০ই পেঃ। এই ভাবে পণ্য তার দামের মারফৎ বলে দেয় তার মর্যাদা কতটা এবং যখনি কোন জিনিসের মূল্য তার অর্থ-রূপে স্থির করার প্রশ্ন দেখা দেয় তখনি অর্থ কাজ করে হিসাবের অর্থ হিসাবে। [১১]
কোন জিনিসের নাম এমন কিছু যা তার গুণাবলী থেকে স্বতন্ত্র। কোন মানুষের নাম জ্যাকব, এইটুকুমাত্র জানলে আমি সেই মানুষটির সম্বন্ধে আর কিছুই জানি না। অর্থের ক্ষেত্রেও এই একই কথা; পাউণ্ড, ডলার, ফ্রা, ডুকাট ইত্যাদি নামে মূল্য সম্পর্কের প্রত্যেকটি চিহ্নই অন্তৰ্হিত। এই সমস্ত গোপনীয়তা ঘাতক অভিজ্ঞানগুলির উপরে প্রচ্ছন্ন তাৎপর্য আরোপ করে, ব্যাপারটিকে ঢের বেশি বিভ্রান্তিকর করে তোলা হয়, কেননা এই অর্থ-নামগুলি একই সময়ে দুটি জিনিসকে প্রকাশ করে থাকে—পণ্যের মূল্যকে এবং সংশ্লিষ্ট ধাতুটির বিভিন্ন ভগ্নাংশের ওজনকে, যা অর্থের মান।[১২] অন্যদিকে, এটা চূড়ান্তভাবে আবশ্যক যে, যাতে করে বিবিধ পণ্যের বিভিন্ন দেহগত রূপগুলি থেকে মূল্যকে আলাদা করা যায়, সেইহেতু তাকে ধারণ করতে হবে এই বস্তুগত এবং নিরর্থক, অথচ একই সময়ে, বিশুদ্ধ সামাজিক রূপ।[১৩]
দাম হচ্ছে কোন পণ্যে যে-শ্রম বাস্তবায়িত হয়, তার অর্থ-নাম। সুতরাং কোন পণ্যের দাম-বাচক অর্থের পরিমাণটির সঙ্গে তার সমার্থতা প্রকাশ করা নিছক একই কথা পুনরুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়[১৪], ঠিক যেমন সাধারণ ভাবে কোন পণ্যের আপেক্ষিক মূল্যকে প্রকাশ করা পুনরুক্তি করা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু যদিও, কোন পণ্যের মূল্যের আয়তনের প্রতিনিধি হওয়ার কারণে দাম অর্থের সঙ্গে তার বিনিময় হারের প্রতিনিধি, এ থেকে এ সিদ্ধান্ত করা যায় না এই বিনিময় হারের প্রতিনিধিটি আবশ্যিক ভাবেই হবে উক্ত পণ্যটির মূল্যের আয়তনের প্রতিনিধি। ধরুন, সামাজিক ভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমের দুটি সমান পরিমাণের প্রতিনিধিত্ব করছে যথাক্রমে ১ কোয়ার্টার গম এবং £২ ( প্রায় ২ আউন্স সোনা); এক্ষেত্রে ৫২ হচ্ছে উক্ত এক কোয়াটার গমের মূল্যের আয়তনের অর্থের অঙ্কে অভিব্যক্তি, তার মানে, এক কোয়ার্টার গমের দাম। এখন যদি ঘটনাক্রমে গমের দাম বৃদ্ধি পেয়ে দাড়ায় £ অথবা হ্রাস পেয়ে দাড়ায় ৫১, তা হলে, যদিও £১ এবং £3 গমের মূল্যকে যথাযথ ভাবে প্রকাশ করবার পক্ষে খুব কম বা খুব বেশি হয়ে পড়তে পারে, তা হলেও এরাই হবে তার দাম; কেন না প্রথমতঃ এরাই হচ্ছে সেইরূপ যে-রূপের অধীনে মূল্য তার মূল্য দৃশ্যমান হয় অর্থাৎ অর্থরূপ; এবং দ্বিতীয়ত, এরাই হচ্ছে অর্থের সঙ্গে তার বিনিময় হার। যদি উৎপাদনের অবস্থাবলী বা ভাষান্তরে, যদি শ্রমে উৎপাদিকা শক্তি থাকে স্থির, তা হলে, দাম পরিবর্তনের আগে এবং পরে, একই পরিমাণ সামাজিক শ্রম-সময় ব্যয়িত হবে এক কোয়ার্টার গমের পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে। কি গম-উৎপাদনকারীর খুশি-অখুশি আর কি অন্যান্য পণ্যের উৎপাদনকারীদের খুশি-অখুশি—এই ঘটনা এদের কোনটির উপর নির্ভর করে না।
মূল্যের আয়তন প্রকাশ করে একটি সামাজিক সম্পর্ককে; কোন একটি জিনিস আর সেই জিনিসটিকে উৎপাদন করতে সমাজের মোট শ্রম-সময়ের ব্যায়িতব্য অংশ এই দুয়ের মধ্যে যে সম্পর্কটি আবশ্যিক ভাবে বিদ্যমান মূল্য প্রকাশ করে সেই সম্পর্কটিকে। যে মুহূর্তে মূল্যের আয়তন পরিবর্তিত হয় দামে, সেই মুহুর্তে উল্লিখিত আবশ্যিক সম্পর্কটি একটি একক পণ্য এবং অন্য একটি পণ্যের-অর্থ-পণ্যের-মধ্যে মোটামুটি আপতিক একটা বিনিময়-হারের আকার ধারণ করে। কিন্তু এই বিনিময় হার যে কোন একটা জিনিসকে প্রকাশ করতে পারে- হয়, উক্ত পণ্যটির মূল্যের যথার্থ আয়টিকে, নয়তো, ঘটনাচক্রে উক্ত মূল্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যে পরিমাণ সোনার বিনিময়ে ঐ পণ্যটিকে হাতছাড়া হতে হয়েছে, সেই পরিমাণ সোনাকে। অতএব, দাম এবং মূল্য-আয়তনের মধ্যে অসঙ্গতির অথবা মূল্য-আয়তন থেকে দামের বিচ্যুতির এই যে সম্ভাব্যতা, তা স্বয়ং দাম-রূপের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এটা কোনো দুষণীয় ব্যাপার নয় বরং তা দাম-রূপটিকে প্রশংসনীয় ভাবেই এমন একটি উৎপাদন-পদ্ধতির সঙ্গে অভিযোজিত করে নেয়, তার অন্তর্নিহিত নিয়মগুলি পারস্পরিক প্রতিপূরণকারী বাহত উচ্ছংখল অনিয়মিকতাগুলির উপরে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করে কেবল মধ্যবর্তী হিসাবে।
