সরকারি প্রশিক্ষকেরা কৃষি-শ্রমিকের বৈষয়িক অবস্থা সংক্ষেপে এই ভাবে বিবৃত করেছেন : “যদিও সে বাস করে কঠোরতম মিতব্যয়িতার সঙ্গে, তবু তার মজুরি একটি সাধারণ পরিবারের খাদ্য-যোগাবার পক্ষে এবং বাড়িভাড়া দেবার পক্ষে যথেষ্ট হয় না, এবং তার নিজের, তার স্ত্রী ও সন্তানদের জামা-কাপড়ের জন্য তাকে নির্ভর করতে হয় আয়ের অন্যান্য উৎসের উপরে। এই কুঠরিগুলির আবহাওয়া এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য যেসব অভাব-অনটন তাদের সহ করতে হয় তা এই শ্ৰেণীটিকে একটা ঘুষঘুষে জ্বর ও ফুসফুস-সংক্রান্ত ক্ষয়রোগের পক্ষে বিশেষ ভাবে প্রবণ করে তোলে।”[৯৯] এর পরে, এতে আর আশ্চর্যের কি আছে, যে-কথা সমস্ত পরিদর্শকই এক বাক্যে। সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, এই শ্রেণীর মধ্যে একটা বিষন্ন অসন্তোষের ধারা সব সময়েই প্রবাহিত হয়, তারা অতীত দিনে ফিরে আসার জন্য আকুলতা বোধ করে, বর্তমান কালকে ঘৃণা করে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশা পোষণ করে, “আন্দোলনকারীদের দুই প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং একটি মাত্র নির্দিষ্ট কামনা মনে মনে লালন করে—তা হল আমেরিকায় চলে যাওয়া। এই হল সেই কোকেইন-ল্যাণ্ড ( অলস বিলাসের কল্প-দেশ)—জনসংখ্যা হ্রাসের ম্যালথুসীয়া সর্বরোগহর ব্যবস্থাপত্র সবুজ এরিনকে (আয়ল্যাণ্ডকে ) যে-দেশে রূপান্তরিত করেছে।
আয়ার্ল্যাণ্ডের কারখানা-কর্মীরা কী সুখী জীবন ভোগ করে, একটি দৃষ্টান্ত দিলেই তা প্রকাশ পেয়ে যাবে : ইংল্যাণ্ডের কারখানা-পরিদর্শক রবার্ট বেকার বলেন, “তার শিশুদের লেখাপড়া শেখাবার জন্য একজন আইরিশ দক্ষ শ্রমিক কত চেষ্টা করেছিল, তার এই সাক্ষাৎটি সম্প্রতি উত্তর আয়ার্ল্যাণ্ডে সফর কালে আমার গোচরে আসে এবং আমি মুখ থেকে এই সাক্ষ্য যেমন শুনেছি, ঠিক তেমনটিই লিপিবদ্ধ করছি। সে ছিল একজন দক্ষ কারখানা-শ্রমিক—এই কথাটার মানে তখন বোঝা যাবে, যখন আমি বলি যে সে নিযুক্ত ছিল ম্যাঞ্চেস্টার-বাজারের জন্য মাল-ফিনিশের কাজে। জনসন–আমি একজন ‘বিটলার’ (বিটল’ মেশিনের কর্মী, কাপড় পরিপাটি ও চকচকে করা যে-মেশিনের কাজ ); সোমবার থেকে শুক্রবার আমি প্রতিদিন কাজ করি সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। শনিবার আমি ছাড়া পাই সন্ধ্যা ৬টায়, এবং তার পরে তিন ঘণ্টা পাই ভোজন ও বিশ্রামের জন্য। আমার সবসুদ্ধ পাঁচটি সন্তান আছে। এই কাজের জন্য আমি সাপ্তাহিক ১০ শি ৬ পে পাই। আমার স্ত্রীও এখানে কাজ করে, সে পায় সাপ্তাহিক ৫ শি। সবচেয়ে বড় মেয়েটি, বয়স ১২ বছর, সংসারের কাজকর্ম করে। সেই আমাদের রাধুনি ও চাকরানি—সবই। সে ছোটদের ইস্কুলে যাবার জন্য তৈরি করে দেয়। একটি মেয়ে আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যায়, সে আমাকে ভোর সাড়ে পাঁচটায় জাগিয়ে দেয়। আমার স্ত্রীও উঠে পড়ে এবং আমার সঙ্গে চলে। কাজে আসবার আগে আমরা কোনো খাবার খেতে পাইনা। ঐ ১২ বছরের শিশুটি সারাদিন বাকি শিশুদের যত্ন-আত্তি করে, এবং বেলা আটটায় প্রাতরাশের আগে পর্যন্ত আমাদের কিছুই জোটেনা। আটটার সময়ে আমরা বাড়ি যাই। সপ্তাহে একদিন আমরা চা পাই, অন্যান্য সময়ে আমরা পাই ‘পরিজ’-কখনো জইয়ের, কখনো ভারতীয় চাল-ডালের, যখন যেমন মেলে। শীতকালে ভারতীয় খাবারের সঙ্গে একটু চিনি ও জল পাই। গরম কালে পাই কিছু আলু যা এক টুকরো জমিতে আমরাই ফলাই; এবং যখন তা ফুরিয়ে যায় আবার ফিরে যাই পরিজে। কখনো-সখনো আমাদের একটু দুধও জুটে যায়। এই ভাবেই কাটে আমাদের প্রতি দিন, রবিবারই হোক আর কাজের দিনই হোক—সারা বছর একই ভাবে। রাতে কাজ শেষ করার পরে আমি ক্লান্ত বোধ করি। কখনো-সখনো আমাদের এক টুকরো মাংসও মিলে যায় তবে খুবই কালেভদ্রে। আমাদের শিশুদের মধ্যে তিনটি ইস্কুলে যায়, তাদের জন্য আমাদের মাথাপিছু দিতে হয় প্রতি সপ্তাহে ১ পেন্স করে। আমাদের বাড়ি ভাড়া সপ্তাহে ৯ পেন্স। আলানীর জন্য আমাদের দুসপ্তাহে ব্যয় হয় অন্তত ১ শি ৬ পে।”[১০০] এই হল আইরিশ মজুরি এই হল আইরিশ জীবন!
বস্তুতঃ পক্ষে আয়ার্ল্যাণ্ডের দুঃখ-দুর্দশা ইংল্যাণ্ডে আবার আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ১৮৬৬-র শেষে ও ১৮৬৭-র শুরুতে আয়ার্ল্যাণ্ডের জনৈক বৃহৎ জমিদার লর্ড-ডাফরিন ‘টাইমস’ পত্রিকায় এই সমস্যার সমাধানে তার প্রস্তাব প্রকাশ করেছিলেন। “Wie menschlich von solch grossem Herrn !”
(ঙ) সারণীতে আমরা দেখেছিলাম যে, ১৮৬৪ সালে £ ৪,৩৬৮,৬১০ মোট মুনাফার মধ্যে তিন জন মালিক উদ্বৃত্ত-মূল্য পকেটস্থ করেছিল মাত্র ৫ ২৬২,৮১৯ পাউণ্ড, কিন্তু ১৮৬৫ সালে ৫৪৬৬,৯৭৯ মোট মুনাফার মধ্যে “ভোগ-সংবরণ”-এর ঐ তিন পয়গম্বরই পকেটস্থ করেছিল ২৭৪,৫২৮ পাউণ্ড; ১৮৬৪ সালে ২৬ জন উদ্বৃত্ত মূল্য মালিক পৌছেছিলে ৬৪৬,৩৭৭ পাউণ্ডে; ১৮৬৫ সালে ২৮ জন উদ্বৃত্ত-মূল্য মালিক ৭,৩৬,৪৪৮ পাউণ্ডে; ১৮৬৪ সালে ১২১ জন, ১০,৭৬,৯১২ পাউণ্ডে; ১৮৬৫ সালে ১৫০ জন উদ্বৃত্ত-মূল্য মালিক ১৩,২৩,৯০৬ পাউণ্ডে; ১৮৬৪ সালে ১,১৩১ জন উদ্বৃত্ত-মূল্য মালিক ২,১৫,৮১৮ পাউণ্ডে, মোট বাৎসরিক মুনাফার প্রায় অর্ধেকে; ১৮৬৫ সালে ১,১৯৪ জন উদ্বৃত্ত-মূল্য মালিক, ২,৪১৮,৮৩৩ পাউণ্ডে, মোট বাৎসরিক মুনাফার অর্ধেকেরও উপরে। কিন্তু বাৎসরিক জাতীয় খাজনার এমন সিংহভাগ ইংল্যাণ্ড, স্কটল্যাণ্ড ও আয়ার্ল্যাণ্ডের এত অবিশ্বাস্য রকমের স্বল্পসংখ্যক সুবৃহৎ জমিদার গ্রাস করে যে ইংল্যাণ্ড রাষ্ট্রের প্রজ্ঞাবান কর্তৃপক্ষ মুনাফা বণ্টনের পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেও খাজনা-বণ্টন সম্পর্কে অনুরূপ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা সমীচীন মনে করেননি। লর্ড ডাফরিন ঐ সুবৃহৎ জমিদারদের মধ্যে একজন। খাজনা ও মুনাফা যে কখনো অত্যধিক” হতে পারে কিংবা খাজনা ও মুনাফার প্রাচুর্য যে কোন রকমে জনগণের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, এমন একটা ধারণা যেমন “দুষ্ট” তেমন “ভ্রান্ত”। তিনি তথ্যের প্রতি নিষ্ঠাবান। তথ্য এই যে যখন আয়ার্ল্যাণ্ডের জনসংখ্যা হ্রাস পায়, তখন আয়ার্ল্যাণ্ডের খাজনা বৃদ্ধি পায়; জনসংখ্যা-হ্রাস জমিদারকে উপকার করে, অতএব, জমিরও উপকার করে এবং স্বভাবতই, যারা জমির অনুষঙ্গমাত্র সেই মানুষদেরও উপকার করে। সুতরাং তিনি ঘোষণা করেন, আয়াণ্ড এখনো অতিরিক্ত জনাকীর্ণ এবং দেশান্তর-যাত্রার প্রবাহ এখনো মন্থর। সর্বাঙ্গীণ সুখী হতে হলে, আয়াণ্ডকে অবশ্যই শ্রমজীবী জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ থেকে নিষ্কৃতি পেতে হবে। কেউ যেন মনে না করেন যে, এই প্রভুটি, উপরন্তু যিনি আবার কবিও, সাংগ্রাতো-র অনুসারী কোন ডাক্তার, যিনি যখনি দেখলে রোগীর উন্নতি ঘটছে না, তখনি নির্দেশ দিতেন রক্ত-মোক্ষণের (বিটমি’-র) এবং আরো রক্ত-মোক্ষণের যতক্ষণ না বোগী তার রোগ ও রক্ত থেকে একই সঙ্গে মুক্তি পায়। লর্ড ডাফরিন নোতুন করে মাত্র সাড়ে তিন লক্ষের মত লোকের রক্ত-মোক্ষণ দাবি করেছেন, ২০ লক্ষের মত লোকের দাবি করেননি; বস্তুতঃ পক্ষে এদের হাত নিষ্কৃতি না পেলে এরিনে (আয়ার্ল্যাণ্ডে) সত্যযুগ (মিলেনিয়াম) আসতে পারে না। প্রমাণটা খুবই সহজে দেওয়া যায়।
