আমরা জানি, ১৮৪৬ সালে তাদের বাসস্থানের কি অবস্থা ছিল। তারপর থেকে অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। কৃষি-শ্রমিকদের একটা অংশযে-অংশটা অবশ্য দিন-দিনই কমে যাচ্ছে-এখনো বাস করে কৃষকদের খামারে ভিড়ে-ঠাসা কুঁড়েগুলিতে, যার জঘন্যতা ইংল্যাণ্ডের কৃষি-শ্রমিকদের এই ধরনের কুঁড়েগুলির জঘন্যতাকে অনেক ছাপিয়ে যায়। এবং এই মন্তব্য আলস্টারের কয়েকটা অংশ বাদে সর্বত্রই প্রযোজ্য : দক্ষিণে কর্ক, লিমারিক, কিলকেন্নি ইত্যাদি কাউন্টিগুলিতে; পূর্বে উইকৃলল, ওয়েক্স ফোর্ড ইত্যাদিতে; আয়ার্ল্যাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে, রাজ-রানীর কাউন্টি, ডাবলিন ইত্যাদিতে, পশ্চিমে গিগা, বসকমন, মেয়ো, গ্যালোয়ে ইত্যাদিতে। জনৈক পরিদর্শক সোচ্চারে বলেন, “কৃষি-শ্রমিকদের কুঁড়েগুলি এই দেশের খ্ৰীষ্টধর্ম ও সভ্যতার পক্ষে কলংক স্বরূপ।”[৯০] শ্রমিকদের এই কোটরগুলির আকর্ষণ বাড়াবার জন্য স্মরণাতীত কাল থেকে সেগুলির সঙ্গে সংলগ্ন ভূমিখণ্ডগুলিকে ধারাবাহিক ভাবে বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। “জমিদার ও তার দালালদের এই জাতীয় নিষেধাজ্ঞার অধীনে তারা রয়েছে—নিছক এই বোধ…শ্রমিকদের মনে সেই লোকগুলির প্রতি বৈরিতা ও বিক্ষোভের জন্ম দেয়, যারা তাদের এই ভাবে নিজেদেরকে ভাবতে বাধ্য করেছে যে তারা একটা নিষিদ্ধ জাতি।[৯১]
কৃষি-বিপ্লবের প্রথম কাজ হল শ্রমের ক্ষেত্রে অবস্থিত কুঁড়েগুলিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। এটা করা হয়েছিল বৃহত্তম আয়তনে এবং করা হয়েছিল যেন উপরের কারো নির্দেশের প্রতি আনুগত্য অনুসারে। এই ভাবে অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়েছিল গ্রামে ও শহরে আশ্রয়ের সন্ধান করতে। সেখানে তারা আবর্জনার মত নিক্ষিপ্ত হয়েছিল ছাদের উপরে চিলেকোঠায়, মাটির তলায় কোটরে, খুপরিতে আনাচে কানাচে, সবচেয়ে নোংরা ঘিঞ্জি এলাকায়। আইরিশদের বিরুদ্ধে জাতিগত সংস্কারে আচ্ছন্ন যে ইংৰ্বেজ, তাদেরও সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে হাজার হাজার আইরিশ পরিবার—ঘর-সংসারের প্রতি অসাধারণ আকর্ষণের জন্য, আনন্দোচ্ছলতা ও পারিবারিক জীবনের বিশুদ্ধতার জন্য যারা সুখ্যাত-হঠাৎ তারা নিজেদের দেখতে পেল আপন পরিবেশ থেকে উৎপাটিত এবং পাপের পঙ্কে নিক্ষিপ্ত অবস্থায়। মানুষগুলি বাধ্য হল নিকটবর্তী কৃষকদের কাছে কাজের খোঁজ করত; তাদের ভাড়া হত কেবল এক দিনের ভিত্তিতে এবং স্বভাবতই, অত্যন্ত অনিশ্চিত মজুরিতে। সুতরাং, “কাজের জন্য যেতে আসতে অনেক সময়ে তাদের হাঁটতে হত অনেক দূর, প্রায়ই ভিজে যেত, সহ্য করতে দারুণ দুর্ভোগ—অনেক সময়েই যা শেষ হত অসুখে, ব্যাধিতে ও অভাবে।”[৯২]
“পল্লী-অঞ্চলে যে জনসংখ্যা উদ্বও বলে পরিগণিত হত, বছরের পর বছর সেই জনসংখ্যা শহরকে গ্রহণ করতে হত;”[৯৩] এবং তার পরেও মানুষ সবিস্ময়ে দেখত যে, “তখনো শহর ও পল্লীগ্রামে উদ্বও শ্রম থেকে গিয়েছে অথচ একই সময়ে কতগুলি পল্লী অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে হয় শ্রমের স্বল্পতা বা স্বল্পতার আশংকা।”[৯৪] সত্য ঘটনা এই যে, এই স্বল্পতা প্রকট হয়ে উঠত “ফসল কাটার মরশুমে, বসন্ত কালে, কিংবা এমন এমন সময়ে, যখন কৃষিকর্মে তৎপরতা বৃদ্ধি পায়; বছরের বাকি সময়ে অনেক হাতই বেকার থাকে; [৯৫] প্রধান ফসল যে- আলু, অক্টোবর মাসে তা খুড়ে ভোলার কাজ শেষ হয়ে যায় এবং তখন থেকে পরবর্তী বসন্তকাল পর্যন্ত তাদের কোনো রুজি-রোজগার থাকে না;[৯৬] আর তা ছাড়া, যখন কাজের সাড়া পড়ে যায়, তখনো তাদের অনেক ভাঙা-রোজ -ও আরো হরেক রকম ব্যাঘাত ও বিরতির দুর্ভোগ পোহাতে হয়।”[৯৭]
কৃষি-বিপ্লবের এই ফলাফল, যথা, চাষের জমিতে চারণ-জমি পরিবর্তন, মেশিনারির প্রচলন, শ্রমের ব্যবহারে কঠোরতম ব্যয়-সংকোচন ইত্যাদি আদর্শ জমিদারদের কাজে আরো বেগ ও ব্যাপ্তি লাভ করে, যারা তাদের খাজনা অন্য দেশে ব্যয় করার বদলে নিজেদের খাসমহলে ব্যয় করতে খুশি হন। যোগান ও চাহিদার নিয়মটি যাতে লজ্জিত না হয়, সেই জন্য এই ভদ্রলোকের সংগ্রহ করে তাদের শ্রমের যোগান: : প্রধানতঃ তাদের ছোট প্রজাদের মধ্য থেকে, যারা জমিদারদের দরকার মত বাধ্য হয় তাদের কাজ করে দিতে-সাধারণ শ্রমিকদের যে-মজুরি দেওয়া হয়, তার চেয়ে অনেক কম মজুরিতে এবং বীজ-বোনা ও ফসল-তোলার মত জরুরি সময়ে নিজেদের কাজের ক্ষতি করেও জমিদারদের কাজ করে দিতে।[৯৮]
কর্মসংস্থানের এই অনিশ্চয়তা, শ্রমের বাজার বারংবার ও দীর্ঘস্থায়ী এই জনবাহুল্য, আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার এই সমস্ত উপসর্গ গরিব আইন প্রশাসন’-এর প্রতিবেদন গুলিতে প্রকাশিত হয় কৃষি-সর্বহারা। প্রোলেটারিয়েট’। শ্রেণীর নানা রকমের দুর্ভোগ হিসাবে। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, ইংল্যাণ্ডের কৃষি-সর্বহারা শ্রেণীর ক্ষেত্রেও আমরা একই দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু পার্থক্য এই যে, যেখানে শিল্প-প্রধান দেশ ইংল্যাণ্ডে তার সংরক্ষিত শিল্পকর্মী-বাহিনী সংগৃহীত হয় তার গ্রামাঞ্চল থেকে সেখানে কৃষিপ্রধান দেশ আয়ার্ল্যাণ্ডে সংরক্ষিত কৃষি-কর্মী বাহিনী সংগৃহীত হয় শহরাঞ্চল থেকে বহিষ্কৃত কৃষি-শ্রমিকেরা যেখানে আশ্রয় নেয়। প্রথম ক্ষেত্রে কৃষির সংখ্যাতিরিক্ত অংশ রূপান্তরিত হয় কারখানা-শ্রমিকে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে, যাদের জোর করে শহরে ঠেলে দেওয়া হয়, তারা শহরের মজুরির উপরে চাপ সৃষ্টি করলেও, কৃষি শ্রমিকই থেকে যায় এবং সব সময়েই কাজের সন্ধানে গ্রামে ফিরে যায়।
