যারা পিছনে পড়ে রইল এবং উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যা থেকে মুক্তি পেল, আয়ার্ল্যাণ্ডের সেই সব শ্রমিকদের অবস্থা কি হল? অবস্থা হল এই যে, আপেক্ষিক উত্তজনসংখ্যা ১৮৪৬ সালেও যা ছিল, এখনো তাই রয়ে গেল; মজুরি তেমন নিচুই থেকে গেল; শ্রমিকদের উপরে অত্যাচার বেড়ে গেল; দুঃখ-দুর্দশা দেশকে নোতুন এক সংকটের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল। ঘটনাগুলি খুবই সরল। কৃষিতে বিপ্লব দেশত্যাগের সঙ্গে সমান তালে চলেছে। আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যা অনাপেক্ষিক জনসংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে কেবল সম-তালেই চলেনি, তার তুলনায় এগিয়ে গিয়েছে। ‘গ’ সাণীটির দিকে দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যায় আবাদি জমি থেকে চারণ-জমিতে পরিবর্তন ইংল্যাণ্ডের তুলনায় আয়ার্ল্যাণ্ডে অবশ্যই আরো তীক্ষভাবে কাজ করবে। ইংল্যাণ্ডে গবাদি পশু প্রজননের সঙ্গে সব জি শস্যের চাষও বৃদ্ধি পায়; আয়ার্ল্যাণ্ডে তা হ্রাস পায়। যখন, আগে যেগুলি চাষ হত এমন অনেক অনেক একর জমি এখন হয় পতিত পড়ে আছে বা স্থায়ীভাবে ঘাস-জমিতে পরিবর্তিত হয়েছে, তখন আগে যা কখনো কাজে লাগানো হয়নি, এমন অনেক পতিত জমি ও শুনো বিল এখন কাজে লাগানও হল গো পালনের জন্য। ছোট ও মাঝারি কৃষকেরা—যাদের মধ্যে আমি ধরছি তাদের যারা ১০০ একরের বেশি চাষ করেনা—এখনে! গঠন করে মোট সংখ্যার ৮/১০ ভাগ।[৮৭] একের পর এক এবং এমন এক বলের প্রকোপে যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি, তারা ধ্বংস হতে থাকে মূলধনের পরিচালনাধীন কৃষিকর্মের প্রতিযোগিতায়; আর এইভাবে তারা। নিরন্তর যুগিয়ে চলে মজুরি শ্রমিকদের শ্রেণীতে নোতুন নোতুন রুট। আয়ার্ল্যাণ্ডের একমাত্র বৃহৎ শিল্প হল শন-কাপড়ে ( লিনেন) শিল্প; কিন্তু তাতে বয়স্ক পুরুষ লাগে অপেক্ষাকৃত অল্প সংখ্যায় এবং, ১৮৬১-১৮৬৬-তে তুলোর দাম বেড়ে যাবার দরুন তা এই শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটা সত্ত্বেও, যত লোককে নিযুক্ত করে তা ইংল্যাণ্ডের জনসংখ্যার একটি নগণ্য অংশ। অন্যান্য বৃহৎ আধুনিক শিল্পের মত, তা অবিরাম ওঠা-নামার মাধ্যমে, নিরন্তর সৃষ্টি করে তার নিজের পরিধির মধ্যে একটি আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জন সংখ্যা—এমনকি তার দ্বারা কর্ম-নিযুক্ত জনসমষ্টির অনাপেক্ষিক বৃদ্ধি প্রাপ্তি সত্ত্বেও। কৃষি-জনসংখ্যার এই দুঃখ-দুর্দশাই রচনা করে বিরাট বিরাট শার্ট-ফ্যাক্টরির বনিয়াদ, যেগুলির শ্রমিক-বাহিনী বাহিনী ছড়িয়ে থাকে গোটা দেশ জুড়ে। এখানে আমরা আবার মুখোমুখি হই উপরে বর্ণিত ঘরোয়া শিল্পের সঙ্গে, যা তার মাত্রল্প মজুরি আর মাত্রাধিক কাজের ব্যবস্থার মধ্যে পেয়ে যাই তার সংরক্ষিত কর্মী-বাহিনী সৃজনের প্রয়াজনীয় উপায়। সর্বশেষে, যদি জনসংখ্যার এই হ্রাস একটি পূর্ণ-বিকশিত ধনতান্ত্রিক দেশে যে-ধ্বংসাত্মক পরিণতি ঘটাত, এখানে তা ঘটায় না, তা স্বদেশের বাজারে নিরন্তর প্রতিক্রিয়া না ঘটিয়ে পারে না। দেশত্যাগের ফলে এখানে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা কেবল শ্রমের জন্য স্থানীয় চাহিদাকেই সীমাবদ্ধ করেনা, তা ঘোট ঘোট দোকানদার, কারিগর, সাধারণ ভাবে ব্যবসায়ীদের আয়ও সীমাবদ্ধ করে। এই কারণেই ‘ঙ’ সারণীতে ৬০ পাউণ্ড এবং ১০০ পাউণ্ডের মধ্যবর্তী আয়ের এই হ্রাস প্রাপ্তি।
আয়ার্ল্যাণ্ডের কৃষি-শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে একটা পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায় আইরিশ ‘গরিব আইন পরিদর্শকদের প্রতিবেদনে (১৮৭০)।[৮৮] যে সরকারকে টিকিয়ে রাখা হয় কেবল সঙ্গীন ও, কখনো প্রচ্ছন্ন কখনো প্রকাশ্য, অবরোধ-আরোপের সাহায্যে, সেই সরকারের কর্মচারীদের স্বভাবতই তাদের ভাষা সম্পর্কে যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে, যা করতে তাদের ইংল্যাণ্ডের সহকর্মীরা ঘৃণা বোধ করতেন। অবশ্য, তা সত্ত্বেও তারা তাদের সরকারকে মোহের মায়ায় মুগ্ধ থাকতে দেননি। তাদের মতে, মজুরির হার, যদিও এখনো খুবই কম, তা হলেও তা গত ২০ বছরে শতকরা ৫০-৬০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং এখন তা গড়ে দাড়িয়েছে সপ্তাহে ৬ শিলিং থেকে ৯ শিলিং। কিন্তু এই আপাত বৃদ্ধির নেপথ্যে লুকিয়ে আছে আসল হ্রাস, কেননা ইতিমধ্যে জীবন ধারণের দ্রব্যসামগ্রীর যে-দাম বৃদ্ধি হয়েছে মজুরি বৃদ্ধি তার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করেনি। প্রমাণ হিসাবে একটি আইরিশ দুঃস্থ-নিবাসের সরকারি হিসাব থেকে একটি অনুচ্ছেদ নিচের সারণীতে উদ্ধৃত করা হল :
মাথাপিছু সাপ্তাহিক গড় ব্যয়
ছবি। পেজ ৪৪৯
দেখা যাচ্ছে, জীবনধারণের উপায়-উপকরণের দাম ২০ বছর আগে যা ছিল, তার চেয়ে পুরোপুরি দুগু, এবং পোষাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে সঠিক দ্বিগুণ।
এমনকি এই অনুপাত-বৈষম্য ছাড়া, সোনার অঙ্কে প্রকাশিত মজুরি-হারের তুলনা থেকে এমন একটা ফল পাওয়া যাবে যা সঠিক থেকে অনেক দূর। দুর্ভিক্ষের আগে মজুরির বেশির ভাগটাই দেওয়া হত জিনিষ-পত্রে কেবল একটা সামান্য অংশ দেওয়া হত অর্থে; আজকাল অর্থের আকারে মজুরি দেওয়াটাই রেওয়াজ। এ থেকে যা আসে তা এই যে আসল মজুরির পরিমাণ যাই হোক, তার অর্থের হার অবশ্যই উচ্চতর হতে হবে। “দুর্ভিক্ষের আগে শ্ৰমিক ভোগ করত তার কামরা: এক রুড, আধ-একর বা এক একর জমি এবং এক ফলন আলুর:…..”সুবিধা সমেত। সে তাতে শুয়োর-মুৰ্গী পালন করতে পারত ……এখন তাদের কিনতে হয় রুটি; থাকেনা এমন কোনো আবর্জনা যা থেকে চলতে পারে শুয়োর মুর্গীর খোরাক; সুতরাং তারা এখন পায়না শুয়োর, মুর্গী বা ডিমের কোনো সুবিধা।”[৮৯] বাস্তবিক পক্ষে, আগে, কৃষি শ্রমিকেরা ছিল ছোট কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট কৃষক এবং গঠন করত তারা যে মাঝারি ও ছোট খামারগুলিতে কাজ করত, সেগুলিরই শেষের সারি। কেবল ১৮৪৬-এর মহাবিপর্যয়ের পরেই তারা পরিণত হতে লাগল নিছক মজুরি-শ্রমিকের একটি শ্ৰেণীতে—এমন একটি বিশেষ শ্রেণীতে যা তাদের মজুরি-মনিবদের সঙ্গে কেবল আর্থিক সম্পর্কেই সম্পর্কিত।
