ছবি। পেজ ৪৪৪
আয়র্ল্যাণ্ডের জনসংখ্যা ও কৃষি-উৎপন্নের গতি-প্রকৃতির বিষয় থেকে এবারে আমরা মনোযোগ সরিয়ে নেব তার জমিদার, বৃহৎ কৃষক ও শিল্প-ধনিকদের টাকার থলির গতি প্রকৃতির দিকে। এটা প্রতিফলিত হয় আয়করের হ্রাস-বৃদ্ধিতে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, তালিকা (ঘ) (কৃষকদের মুনাফা বাদ দিয়ে অন্যান্যদের মুনাফার তালিকা )-র মধ্যে ধরা হয়েছে তথাকথিত “বৃত্তিজীবী”-দেরও মুনাফা অর্থাৎ আইনজীবী, চিকিৎসক ইত্যাদিরও আয়; এবং তালিকা (গ) ও (ঙ), যে-দুটির মধ্যে কোনো বিশেষ বিবরণ দেওয়া হয়নি, তাতে ধরা হয়েছে কর্মচারী, অফিসার, সরকারী পদ-শোভী (সাইনেকিউয়্যারিস্ট), সরকারি ঋণপত্ৰ-অধিকারীদের।
(খ)-তালিকার অন্তর্ভূক্ত, ১৮৫৩ থেকে ১৮৬৪ পর্যন্ত, আয়ের গড়পড়তা বাৎসরিক বৃদ্ধি ঘটেছিল মাত্র ৩৯৩; অন্য দিকে ঐ একই সময়ে গ্রেট ব্রিটেনে ঘটেছিল ৪৫৮। নিচের সারণীতে দেখানো হল ১৮৬৪ ও ১৮৬৫ সালের মুনাফা-বণ্টন (কৃষকদের মুনাফা বাদ দিয়ে)।
সারণী (ঙ)ঃ তালিকা (ঘ) আয়র্ল্যাণ্ডে মুনাফা (£ ৬০-এর উপরে) থেকে আয়
ছবি। পেজ ৪৪৫
*এই সারণীতে (ঘ) তালিকার অধীনে মোট বাৎসরিক আয় পূর্ববর্তী সারণীগুলির উক্ত তালিকার অধীনস্থ মোট বাৎসরিক আয় থেকে ভিন্ন, তার কারণ আইন-অনুমদিত কয়েকটি বাদ।
ইংল্যাণ্ড হল একটি পূর্ণ-বিকশিত ধনতান্ত্রিক দেশ এবং প্রধানত শিল্পায়ত; আয়ার্ল্যাণ্ডের মত যদি সেখানে জনসংখ্যার এমন নিষ্কাশন ঘটত, তা হলে ইংল্যাণ্ডে রক্তমোক্ষণে সাদা হয়ে যেত। কিন্তু অয়্যাণ্ড এখন হচ্ছে ইংল্যাণ্ডের একটা কৃষি অঞ্চল মাত্র, যে-দেশটিকে সে যোগায় শস্য, পশম, গবাদি পশু এবং শিল্প ও সামরিক ‘রংরুট’, সেই দেশটি থেকে একটি প্রশস্ত প্রণালী দ্বারা বিচ্ছিন্ন।
আয়ার্ল্যাণ্ডের এই জনসংখ্যা-হ্রাসের দরুন তার বেশির ভাগ জমি চাষের বাইরে চলে গেল এবং তার জমির উৎপন্ন দারুণ ভাবে কমে গেল,[৮৪] এবং গবাদি পশু প্রজননের জন্য বৃহত্তর এলাকা নিয়োজিত করা সত্ত্বেও কয়েকটি শাখায় ঘটল চরম অবনতি আর বাকি কয়েকটি ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলেও তা এত সামান্য যে অনুল্লেখ্য এবং বারংবার পশ্চাৎ গতির দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত। যাই হোক, জনসংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে, খাজনা ও কৃষকের মুনাফা বৃদ্ধি পেল, যদিও দ্বিতীয়টি প্রথমটির মত অমন অবিচল গতিতে বৃদ্ধি পেল না। এর কারণ সহজেই বোধগম্য। এক দিকে ঘোট ঘোট জোতগুলি বড় বড় পরিণত হওয়ায় এবং আবাদি জমি চারণ-জমিতে পরিবর্তিত হওয়ায়, সমগ্র উৎপন্ন ফসলের একটা বৃহৎ অংশ উদ্বৃত্ত উৎপন্নে রূপান্তরিত হল। উদ্বৃত্ত-উৎপন্ন বৃদ্ধি পেল, যদিও যে-মোট উৎপন্নের তা একটি ভগ্নাংশ মাত্র, তা হ্রাস পেল। অন্য দিকে, গত ২০ বছরে, বিশেষ করে, গত ১০ বছরে ইংল্যাণ্ডের বাজারে মাংস, পশম ইত্যাদির দাম বেড়ে যাবার ফলে, এই উত্ত-উৎপন্নের পরিমাণ যত তাড়াতাড়ি বেড়েছিল, তার চেয়ে বেশি তাড়াতাড়ি বেড়েছিল তার আর্থিক মূল্য।
উৎপাদনের বিক্ষিপ্ত উপায়গুলি, যেগুলি অপরের শ্রম আঙ্গীকৃত করে তাদের নিজেদের মূল্যের সম্প্রসারণ না ঘটিয়ে, নিজেরাই উৎপাদনকারীদের কাজ করে কর্ম সংস্থান ও জীবনধারণের উপায় হিসাবে, সেগুলি, স্বয়ং উৎপাদনকারীর নিজের দ্বারা পরিভুক্ত উৎপন্ন দ্রব্য যতটা মাত্রায় পণ্য, তার চেয়ে বেশি মাত্রায় মূলধন নয়। যদি জনসমষ্টির সঙ্গে কৃষিতে নিয়োজিত উৎপাদন-উপায়সমূহের পরিমাণ হ্রাস পেত তা হলে কৃষিতে নিয়োজিত মূলধনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত, কেননা উৎপাদন-উপায়সমূহের একটা অংশ, যা আগে ছিল বিকেন্দ্রীভূত, তা হত সংকেন্দ্রীভূত এবং রূপান্তরিত হত মূলধনে।
কৃষির বাইরে, শিল্পে ও ব্যবসায়ে বিনিয়োজিত, আয়ার্ল্যাণ্ডের মোট মূলধন গত। দুই দশক ধরে সঞ্চয়ীকৃত হয়—এবং সঞ্চয়ীকৃত হয় বিপুল ও বারংবার ওঠা-নামার মাধ্যমেসেই সঙ্গে আরো দ্রুত গতিতে তার আলাদা আলাদা সংগঠনী উৎপাদন গুলির সংকেন্দ্রীভবনও বিকাশ লাভ করে। এবং তার অনপেক্ষিক বৃদ্ধি যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, ক্ষীয়মান জনসংখ্যার অনুপাতে তা বৃহৎ।
তা হলে এখানে আমাদের চোখের সামনে এবং বৃহৎ আয়তনে উদঘাটিত হয় এমন একটি প্রক্রিয়া, যার তুলনায় চমৎকার আর কোনো কিছু নিষ্ঠাবান অথত তার এই আপ্তবাক্যটির সমর্থনে খুঁজে পাবে না: দুর্দশার উদ্ভব হয় অনাপেক্ষিক উত্তজন সংখ্যা থেকে এবং ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় জনসংখ্যা-হ্রাসের দ্বারা। চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগের যে প্লেগ সম্পর্কে ম্যাঙ্কসপন্থীরা এত পঞ্চমুখ, তার চেয়ে এটা একটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার। আরো দ্রষ্টব্য : যদি কোন ইস্কুল মাস্টারের সরলতা, উনিশ শতকের উৎপাদন ও জনসংখ্যার পরিস্থিতিতে, চতুর্দশ শতকের মানটিকে প্রয়োগ করতে পারত, তাহলে সেই সরলতা, তদুপরি, এই ঘটনাটিকে উপেক্ষা করত যে, সেই প্লেগ তার অনুষঙ্গী গণ-মড়কের ফলে ঘটেছিল ‘চ্যানেল’-এর এপারে, ইংল্যাণ্ডে কৃষি-জনসংখ্যার ভোটাধিকার ও সমৃদ্ধি লাভ, এবং ওপারে, ফ্রান্সে আরো বেশি দাসত্ব, আরো বেশি দুর্দশা।[৮৫]
১৮০৬-এর আইরিশ দুর্ভিক্ষ ১০,০০,০০০ মানুষের প্রাণ হরণ করেছিল, কিন্তু প্রাণ হারিয়েছিল কেবল গরিব পাপাত্মারাই। দেশের সম্পদকে তা এতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। পরবর্তী ২০ বছরের গণ- নিষ্ক্রমণ যা আজও ক্রমবর্ধিত হারে অব্যাহত ভাবে চলছে, তা মানুষের সংখ্যা হ্রাস ঘটলেও সেই সঙ্গে তাদের উৎপাদনের উপায় উপকরণের সংখ্যা হ্রাস ঘটায়নি, যেমন ঘটিয়েছিল ‘ত্রিংশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধ। দুর্দশার স্থান থেকে একটি দরিদ্র জাতিকে হাজার হাজার মাইল দূরে উধাও করে দেবার সম্পূর্ণ নোতুন এক পন্থা আবিষ্কার করল আইরিশ প্রতিভা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত এই লোকগুলি প্রতি বছর তাদের বাড়িতে টাকা পাঠাত, যাদের তারা ফেলে গিয়েছিল, তাদের যাবার খরচ হিসাবে। এক বছর যে-দল যেত, পরের বছর সেই দল আরেকটি দলের যাবার ব্যবস্থা করে দিত। এইভাবে গণ-নিমণ আয়ার্ল্যাণ্ডের পক্ষে কোনো ব্যয়ের কারণ তো হলই না, বরং তা হয়ে উঠল তার একটি সবচেয়ে লাভজনক রপ্তানি-বাণিজ্য। সর্বশেষে, এটা এমন একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা কেবল জন সংখ্যায় একটা সাময়িক শূন্যস্থানই সৃষ্টি করেনা, অধিকন্তু প্রতি বৎসর, সেই স্থান পূরণে যত মানুষের জন্ম হয়, তা থেকে অধিকতর সংখ্যক মানুষকে তা নিষ্ক্রান্ত করে দেয়; ফলে, বছরের পর বছর জনসংখ্যার অনাপেক্ষিকমান হ্রাস পায়। [৮৬]
