‘গ্যাং-প্রথা’ প্রায় একান্ত ভাবে বিদ্যমান লিংকন, হান্টিংডন, কেম্বিজ, নরফোক, সাফোক, নটিংহাম প্রভৃতি কাউন্টিতে এবং এখানে সেখানে আশেপাশের নর্দাম্পটন, বেডফোর্ড ও বাটল্যাণ্ড প্রভৃতি কাউন্টিতে। লিংকনশায়ার আমাদের কাছে একটা দৃষ্টান্ত হিসাবে কাজ করবে। এই কাউন্টির একটা বড় অংশই আগে ছিল জলাভূমি, কিংবা, এমনকি সদ্য-উল্লিখিত পূর্বাঞ্চলের কাউন্টিগুলির বড় বড় অংশের মত, সম্প্রতি সমুদ্র থেকে জয় করে নেওয়া হয়েছে। জল-নিষ্কাশনের ব্যাপারে স্টিম-ইঞ্জিন বিস্ময়কর সব কাজ করেছে। এক সময় যা ছিল বিল আর বালিয়াড়ি, এখন তা রূপান্তরিত হয়েছে শস্য-তরঙ্গায়িত এক উচ্ছল সাগরে এবং উচ্চতম খাজনার উৎসে। একই কথা প্রযোজ্য মানবিক প্রয়াসে বিজিত পাললিক ভূখণ্ডসমূহ সম্বন্ধে যেমন অ্যাক্সেহোম দ্বীপে এবং ট্রেন্ট নদের তীরবর্তী প্যারিশগুলিতে। নোতুন নোতুন কৃষিক্ষেত্রের উদ্ভবের সঙ্গে, সেই অনুপাতে নোতুন কুটির নির্মাণ তো দূরের কথা, এমনকি পুরনো কুটিরগুলিও ভেঙ্গে ফেলা হত, ফলে শ্রমিকদের কাজে আসতে হত দূর-দূরান্তের মুক্ত গ্রামগুলি থেকে মাইলের পর মাইল পাহাড়ের গা বেয়ে একে-বেঁকে-চলা সুদীর্ঘ পথ পার হয়ে। শীতকালের অবিরাম বন্যা থেকে একমাত্র ঐ গ্রামগুলিতেই তারা আগে আশ্রয় সংগ্রহ করতে পেরেছিল। যে সমস্ত শ্রমিক বাস করে ৪০০-১,০০০ একরের জোতগুলিতে ( যাদের বলা হয় “আটক মজুর), তাদের একান্ত ভাবে নিযুক্ত করা হয় এমন সব ধরনের কৃষিকর্মে, যা স্থায়ী, কঠিন এবং সম্পন্ন করা হয় ঘোড়ার সাহায্যে। প্রতি ১০০ একরের জন্য গড়ে একটি কুটিরও আছে কিনা সন্দেহ। যেমন, একজন জলা কৃষক তদন্ত কমিশনের সমক্ষে তার সাক্ষ্যে বলেছিল, “আমি আবাদ করি ৩২০ একর গোটাটাই আবাদী জমি। সেই জমিতে একটাও কুটির নেই। আমার খামারে এখন আছে মাত্র একজন মজুর। আমার আছে চারজন ঘোড়-সওয়ার, যারা আশেপাশে কোথাও থাকে। হাল্কা কাজ আমরা ‘গ্যাং’ দিয়ে করাই।”[৭৪] জমিতে বেশ কিছু হালকা খেতি-কাজ করতে হয়, যেমন, আগাছা বাছাই, নিড়ানি, সার দেওয়া, ঢিল-চেলা সরানো ইত্যাদি। এই কাজগুলি করানো হয় গ্যাং’-এর সাহায্যে, অর্থাৎ, ছোট ছোট সংগঠিত মজুর-দলের সাহায্যে, যারা বাস করে মুক্ত গ্রামগুলিতে।
এক একটা গ্যাং-এ থাকে ১০ থেকে ৪০ অথবা ৫০ জন করে লোক—নারী, তরুণ-বয়স্ক ছেলে-মেয়ে (১৩ থেকে ১৮ বছর, যদি ছেলেমেয়েদের অধিকাংশকেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয় ১৩ বছর বয়সে), এবং শিশু (৬-১৩ বছর)। মাথায় থাকে একজন ‘গ্যাং-মাস্টার’ (সর্দার’)—একজন মামুলি মজুর যাকে সাধারণতঃ বলা হয় বদমাশ, বেপরোয়া, মতিচ্ছন্ন, মাতাল, কিন্তু সব সময়েই একটা কিছু করার মত উদ্যম এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার অধিকারী। সেই হচ্ছে দলটির রিক্রুটিং সার্জেন্ট (সমাহর্তা-দল নায়ক’) এবং সেটি কাজ করে তারই অধীনে, খামার মালিকের অধীনে নয়। সেই দলের জন্য ঠিকা-কাজের ব্যবস্থা করে; তার আয়, যা সচরাচর একজন সাধারণ কৃষি-মজুরের তুলনায় খুব বেশি নয়, সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কত দক্ষতার সঙ্গে কত অল্পসময়ের মধ্যে সে তার দলের কাছ থেকে কত বেশি কাজ আদায় করে নিতে পারে, তার উপরে।[৭৫] খামার-মালিকেরা দেখেছে যে, নারী-শ্রমিকেরা কেবল পুরুষদের অধীনেই নিষ্ঠাভরে কাজ করে, কিন্তু নারী ও শিশুদের যদি একবার কাজে চালু করে দেওয়া যায়, তা হলে তারা বেপরোয়া ভাবে তাদের প্রাণশক্তি ঢেলে দেয়, যেকথা ফুরিয়ার জানতেন, আর তখন সুচতুর পুরুষ শ্রমিক তার শ্রম যথাসম্ভব কমিয়ে আনে। গ্যাং’ সর্দার এক খামার থেকে আরেক খামারে যায় এবং এই ভাবে তার দলটিকে বছরে ৬ থেকে ৮ মাস কাজে নিযুক্ত রাখে। সুতরাং, ব্যক্তিগত খামার-মালিকের দ্বারা কর্মে নিয়োগের তুলনায় মেহনতি পরিবারগুলির পক্ষে গ্যাং-সর্দারের দ্বারা কর্ম-নিয়োগ ঢের বেশি লাভজনক ও ঢের বেশি নিশ্চিত হয়; খামার-মালিকেরা অনেক সময় কেবল শিশুদেরই নিয়োগ করে। এই ঘটনা তার মুক্ত গ্রামগুলিতে তার প্রভাবকে এমন ভাবে প্রতিষ্ঠা করে যে, কেবল তার মাধ্যমেই কেবল শিশুদের ভাড়া করা যায়। ‘গ্যাং’-কে বাদ দিয়েও শিশুদের এই ভাবে ভাড়া খাটানো তার দ্বিতীয় আয়ের উপায়।
এই ব্যবস্থার “দোষ-ত্রুটি” হল শিশু ও তরুণ-তরুণীদের, মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম, ৫, ৬ এমনকি ৭ মাইল দূরবর্তী ক্ষেতগুলিতে যাতায়াতের প্রাত্যহিক দীর্ঘ পদযাত্রা, এবং, সর্বশেষে গোটা দলটার নৈতিক অধঃপতন। যদিও গ্যাং-সর্দার, যাকে কোন কোন অঞ্চলে বলা হয় “গাড়োয়ান”, সব সময়েই হাতে রাখে একটা লম্বা লাঠি, সেটা সে কদাচিৎ ব্যবহার করে এবং তার বিরুদ্ধে নৃশংস আচরণের অভিযোগ খুবই বিরল। সে একজন গণতান্ত্রিক শাহানশাহ, কিংবা এক ধরনের সেই ‘হ্যামেলিনের রঙচঙে বাঁশীওয়ালা’। সুতরাং তাকে তার প্রজাদের কাছে জনপ্রিয় হতে হয়, এবং তাদেরকে তার অধীনে বেঁধে রাখে যাযাবর জীবনের নানা যাদু দিয়ে। উচ্ছংখল স্বাধীনতা, উদ্দাম উন্মাদনা, অশ্লীল বেহায়াপনা দঙ্গলটাকে যোগায় নানা আকর্ষণ। সচরাচর গ্যাং-সর্দার তাদের সরাইখানার বিল মিটিয়ে দেয় এবং, তার পরে, এক মিছিলের মাথায়, এক জাদরেল মানার হাত-ধরা অবস্থায়, ডাইনে-বাঁয়ে টলতে টলতে বাড়ির পথে ফেরে—হৈ-হুল্লোড় করতে করতে, অশ্লীল-অশ্রাব্য গান গাইতে গাইতে পিছে পিছে যায় বাচ্চা আর তরুণ-তরুণীরা। ফেরার পথে, ফুরিয়ার যাকে বলেন “পাগ সংযোগ”, তা একটা চলতি রেওয়াজ। ১৩-১৪ বছর বয়সের বালিকাদের পক্ষে সমবয়সী সঙ্গীদের সঙ্গ-ফলে সন্তান কোলে আসা মামুলি ব্যাপার। যে-সব মুক্ত গ্রাম এই সমস্ত ‘গ্যাং’-এর যোগান দেয়, সেগুলি হয় সোডোম’ আর ‘গোমোররা এবং সেগুলিতে অবৈধ জন্মের হার রাজ্যের বাকি অংশের তুলনায় দ্বিগুণ।[৭৬] এই ধরনের ইস্কুলে যাদের শিক্ষা, সেই মেয়েদের নৈতিক চরিত্র কিরকম হয় উপরে তা দেখানো হয়েছে। তাদের বাচ্চাগুলি যদি আফিমের চোটেও শেষ না হয়ে যায়, তা হলে জন্ম থেকেই এই সব ‘গ্যাং’-এর ‘রং-রুট’ হিসাবে বড় হয়।
