ল্যাংটফটে বারোটি বাড়ি
ছবি। পেজ ৪৩০
(৯) কেন্ট
কেনিংটনঃ ১৮৫৯ সাল, অতিরিক্ত জনাকীর্ণ, ডিপথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব, প্যারিশের ডাক্তার কর্তৃক গরিব শ্রেণীগুলির অবস্থা সম্পর্কে তদন্ত-পরিচালনা। তিনি দেখতে পেলেন, ঐ জায়গায়, যেখানে শ্রম খাটানো হয়, সেখানে অনেক কুটির ভেঙে ফেলা হয়েছে অথচ কোনো নোতুন কুটির তৈরি করা হয়নি। একটা জেলায় চারটি বাড়ি ছিল, যেগুলিকে বলা হত পাখির খাচা; প্রত্যেকটিতে ছিল চারটি করে রুম, প্রত্যেক রুমের মাপ ছিল এই রকম :
রান্নাঘর : দৈর্ঘ্য ৯ ফু ৫ ই— প্রস্থ ৮ ফু ১১ ই— উচ্চতা ৬ ফু ৬ ই
ধোলাই ঘর : ,, ৮ ফু ৬ ই— ,, ৪ ফু ৬ ই — ,, ৬ ফু ৬ ই
শোবার ঘর : ,, ৮ ফু ৫ ই— ,, ৫ ফু ১০ ই— ,, ৬ ফু ৩ ই
শোবার ঘর : ,, ৮ ফু ৩ ই— ,, ৮ ফু ৪ ই— ,, ৬ ফু ৩ ই
(১০) নর্দাম্পটনশায়ার
ব্রিনওয়র্থ, পিকফোর্ড এবং ফ্লুরঃ এই গ্রাম তিনটিতে কাজের অভাবে ২১-৩০ জন লোক পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কৃষকেরা সব সময়ে শস্য ও শালগমের জমিগুলি যথেষ্ট-ভাষে চাষ করে না এবং জমিদার দেখেছে যে তার সব জোতগুলিকে এক করে ২-৩টি জোতে পরিণত করাই সবচেয়ে ভাল। সুতরাং কাজের অভাব। দেওয়ালের এক দিকে যখন জমি হাতছানি দিচ্ছে শ্রমিককে, অপর দিকে তখন প্রবঞ্চিত শ্রমিকেরা তার দিকে তাকিয়ে আছে সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে। গ্রীষ্মকালে হাড়-ভাঙ্গা খাটুনি আর শীতকালে আধ-পেটা খাওয়া; লোকগুলো যদি তাদের অদ্ভুত গ্রাম্য কথায় বলে, ‘পাদ্রী আর ভদ্দরলোকেরা আমাদের মারি ফেতি চায়, তা হলে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই।
ফ্লুর-এর কয়েকটি নমুনা : ক্ষুদ্রতম আকারের একটি শোবার ঘরে ৪, ৫, ৬টি শিশু সহ দম্পতি; ৫টি শিশু সহ ৩ জন বয়স্ক ব্যক্তি; ঠাকুর্দা ও স্কালেট জরে শয্যাগত ৬টি শিশু সহ একটি দম্পতি; দুটি শোবার ঘর বিশিষ্ট দুটি বাড়িতে দুটি পরিবার, বাস করে যথাক্রমে ৮ ও ৯ জন বয়স্ক লোক।
(১১) উইল্টশায়ার
স্ট্রাটনঃ ৩১টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়; ৮টিতে কেবল একটা করে শোবার ঘর। একই প্যারিশের অন্তর্গত পেন্টিল : একটা কুঁড়েতে থাকে ৪ জন বয়স্ক লোক sটি শিশু; ভাড়া দিতে হয় সপ্তাহে . শিলিং ৩ পেন্স; এবড়োখেবড়ো পাথরের টুয়োর মেঝে থেকে, জরাজী খড়ের ছাদ পর্যন্ত খাড়া পাচিলগুলো ছাড়া ভাল বলতে আর কিছু নেই।
(১২) ওয়রসেস্টশায়ার
এখানে বাড়িঘর ধ্বংসের পরিমাণ খুব মাত্রাতিরিক্ত নয়,; তবু বাড়ি-প্রতি বাসিন্দার সংখ্যা, ১৮৫ থেকে ১৮৬১ সাল অবধি, গড়ে বেড়ে দাড়িয়েছে ৪২ থেকে ৪৬।
ব্যাডসিঃ কুটির অনেক, বাগান প্রায় নেই। কোন কোন জোতমালিক বলে যে, কুটিরগুলি “এখানে একটা বিরাট আবর্জনা-বিশেষ, কারণ সেগুলি গরিবদের ডেকে আনে।” জনৈক ভদ্রলোকের বিবৃতি অনুযায়ী : “এর জন্য গরিবদের অবস্থার আদৌ কোনো সুরাহা হয় না। যদি আপনি ৫ … কুটির তৈরি করেন, তা হলে তারা চটপট সেগুলিকে ভাড়া নিয়ে নেবে। বস্তুতঃ পক্ষে, আপনি যত তৈরি করবেন, তারা তত চাইবে।” (তাঁর মতে কুটিরগুলিই বাসিন্দারের জন্ম দেয়, যারা তার পরে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে “আবাসনের অবলম্বনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে)। ডাঃ হান্টার মন্তব্য করেন, “এই গরিব লোকগুলি নিশ্চয়ই কোথাও-না কোথা থেকে এসে থাকবে, এবং যেহেতু এখানে, ব্যাডসিতে খয়রাত ইত্যাদির মত কোনো আকর্ষণ নেই, সেহেতু নিশ্চয়ই অন্য কোনো অনুপযুক্ত জায়গার বিকর্ষণ তাদের এখানে ঠেলে পাঠিয়েছে। যদি প্রত্যেকে তার কর্মস্থলের কাছে একটা করে প্লট পেত, তা হলে সে ব্যাডসিকে বেছে নিত না, যেখানে তাকে তার থাকার জায়গার জন্য দিতে হয়, তাকে জোতমালিক যা দেয়, তার দ্বিগুণ।”
গ্রাম থেকে শহরে ক্রমাগত জন-প্রবাহ, জোতের সংকেন্দ্রীভবনের দরুন গ্রামাঞ্চলে উত্ত-জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধিপ্রাপ্তি, আবাদী জমির চারণভূমিতে রূপান্তর, মেশিনারি ইত্যাদি এবং কুটিরগুলিকে ধ্বংস করে কৃষি-জনসংখ্যার ক্রমাগত উচ্ছেদ-সাধন হাতে হাত দিয়ে চলে। অঞ্চলটি যতই জনশূন্য হয়, “আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যা ততই বৃদ্ধি পায়, ততই কর্মসংস্থানের উপায়ের উরে তাদের চাপ প্রবলতর হয়, ততই আবাসনের অবলম্বনের তুলনায় কৃষি-জনসংখ্যার অনাপেক্ষিক আধিক্য বিপুলতর হয়; সুতরাং, গ্রামগুলিতে স্থানীয় উদ্যত্ত লোকসংখ্যার এবং মারাত্মক ঠাসাঠাসি জমায়েত ‘আরে বৃহদাকার ধারণ করে। ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ছোট ছোট গ্রামগুলিতে ও ক্ষুদ্র মফঃস্বলের শহরগুলিতে ‘গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষের এই গাদাগাদি-ভিড় এবং সেই সঙ্গে ভূমিপৃষ্ঠ থেকে মানুষের সবলে নিষ্কাশন একযোগে চলে। কৃষি-শ্রমিকদের হ্রাসমান সংখ্যা এবং তাদের উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রীর বর্ধমান সম্ভার সত্ত্বেও, তাদের নিরন্তর প্রতিস্থাপনের ফলে তাদের মধ্যে দুঃস্থতার প্রাদুর্ভাব ঘটে। শেষ পর্যন্ত এই দুঃস্থতা তাদের উচ্ছেদে হেতু এবং শোচ•ীয় বাস-ব্যবস্থার প্রধান উৎস হিসাবে কাজ করে, যা তাদের শেষ প্রতিরোধ ক্ষমতাটুকুও অবসান ঘটায় এবং তাদের পরিণত করে জমির মালিক ও কৃষকদের নিছক গোলামে।[৭১] এই ভাবে ন্যূনতম মজুরি তাদের কাছে হয়ে ওঠে প্রকৃতির নিয়ম স্বরূপ। অন্য দিকে, তার নিৱন্তর “আপেক্ষিক উভ-জনসংখ্যা সত্বেও জমি একই সময়ে হয় সংখ্যার জন-অধ্যুষিত ( ‘আণ্ডার-পপুলেটেড)। যেসব জায়গা থেকে শহর, খনি, রেলপথ-নির্মাণ ইত্যাদিতে জনপ্রবাহ ঘটেছে, কেবল সেই সব জায়গাতেই যে এই পরিস্থিতি চোখে পড়ে তা নয়। এটা চোখে পড়ে সর্বত্র-যেমন ফসল কাটার সময়ে, তেমন বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে, সেই নিয়মিত ব্যবধানে আবর্তনশীল মরশুমগুলিতে যখন ইংল্যাণ্ডের এত সতর্ক ও সংহত কৃষিকর্মের আবশ্যক হয় অতিরিক্ত কর্মী। জমি-চাষের সাধারণ প্রয়োজন-পূরণের পক্ষে সেখানে কর্মীসংখ্যা সব সময়েই অতিরিক্ত রকম বেশি এবং অসাধারণ ও সাময়িক প্রয়োজনপূরণের পক্ষে সব সময়েই অতিরিক্ত রকম কম।[৭২] এইজন্যই সরকারি দলিলপত্রে আমরা দেখতে পাই, একই সব জায়গা থেকে একই সঙ্গে ঘাটতি ও বাড়তির নালিশ। শ্রমের সাময়িক বা স্থানীয় অভাবের দরুন মজুরিতে কোনো বৃদ্ধি ঘটে না; যা ঘটে তা হল নারী ও শিশুদের ক্ষেতের কাজে যেতে বাধ্য করা এবং শিশুদের শোষণ করার বয়স ক্রমশঃ হ্রাস করা। যখনই নারী ও শিশুদের শোষণ ব্যাপক আয়তনে শুরু হয়, তখনি তা হয়ে ওঠে পুরুষ কৃষি-শ্রমিকদের উত্ত-জনসংখ্যায় পরিণত করার এবং তাদের মজুরি দাবিয়ে রাখার একটা হাতিয়ারে। ইংল্যাণ্ডের পূর্বাঞ্চলে এই পাপ-চক্রের একটি সুন্দর ফুলের বাড় বাড়ন্ত ঘটে, যাকে বলা হয় ‘গ্যাং-প্রথা, যে-সম্পর্কে আমি এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করব।[৭৩]
