১৮৬৩ সালে, দ্বীপান্তর ও সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদের পুষ্টি ও শ্রম সম্পর্কে একটি সরকারি তদন্ত পরিচালিত হয়। এই তদন্তের ফলাফল দুটি বৃহদাকার “রু-বুকে লিপিবদ্ধ করা হয়। অন্যান্য বিষয় ছাড়াও এতে বলা হয়েছে, “ইংল্যাণ্ডে কয়েদখানার কয়েদীদের আহার এবং ঐ একই দেশে দুঃস্থ নিবাসের দুঃস্থদের ও মুক্ত শ্রমিকদের আহারের মধ্যে বিস্তারিত তুলনা করলে, এটা নিশ্চিত ভাবেই দেখা যায়। যে, কয়েদীদের আহার বাকি দুটি শ্রেণীর আহার থেকে অনেক ভাল,[৫৮] অথচ সশ্রম কারাদণ্ডভোগী কয়েদীকে যে-পরিমাণ শ্রম করতে হয়, তা একজন মামুলি দিন-মজুরের শ্রমের অর্ধেক।”[৫৯] সাক্ষীদের সাক্ষ্যের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যসূচক দৃষ্টান্ত : এডিনবরা। কারাগারের কারাপাল জন স্মিথ-এর সাক্ষ্য : নং ৫৫ ৫৬। “ইংল্যাণ্ডে মামুলি মজুরদের খাবারের তুলনায় সেখানকার কারাগারের কয়েদীদের খাবার উৎকৃষ্টতর।” নং ৫০। “এটা ঘটনা যে, স্কটল্যাণ্ডের সাধারণ কৃষি মজুরেরা খুব কদাচিৎ আদৌ কোনো মাংস পায়। উত্তর নং ৩০ ৪৭। “সাধারণ শ্রমিকদের তুলনায় তাদের অনেক বেশি ভাল খাবার খাওয়াবার আবশ্যকতার কোনো কারণ আপনি দেখাতে পারেন কি? নিশ্চয়ই না।” নং ৩০ ৪৮। সরকারি পূর্ত কর্মে নিযুক্ত বন্দীদের জন্য মুক্ত শ্রমিকদের খাদ্যতালিকার প্রায় অনুরূপ একটি খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করার জন্য আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো কর্তব্য বলে কি আপনি মনে করেন না?”[৬০]…“সে। (কৃষি-শ্রমিক। বলতে পারে, “আমি কঠোর পরিশ্রম করি, কিন্তু আমি যথেষ্ট খাবার পাই না; অথচ আমি যখন জেলে ছিলাম, আমি কঠোর পরিশ্রম করতাম না কিন্তু প্রচুর খাবার পেতাম; সুতরাং এখানে থাকার চেয়ে আমার জেলে যাওয়াই ভাল।”[৬১] উক্ত বিপোর্টের প্রথম খণ্ডটির সঙ্গে প্রদত্ত সংযোজনীটির সারণীগুলির থেকে আমি নিচেকার তুলনামূলক সার-সংক্ষেপটি সংকলন করেছি।
সবচেয়ে কম-ভুক্ত শ্রেণীগুলির খাদ্য সম্পর্কে ১৮৬৩ সালে মেডিক্যাল কমিশন যে তদন্ত করেছিল, তার সাধারণ ফল পাঠকের কাছে পরিজ্ঞাত। তার নিশ্চয়ই স্মরণে
ছবি। পেজ ৪১৭
আছে যে “অনাহার-মৃত্যু রোধ করার জন্য যে-ন্যূনতম খাদ্যের প্রয়োজন, কৃষি শ্রমিকদের পরিবারগুলির বেশির ভাগেরই আহার তার চেয়ে কম। কর্ণওয়াল ডেভন, সমারটেস, উইলস, স্ট্যাফোর্ড, অক্সফোর্ড, বার্কস্ এবং হের্টস্-এর মত সমস্ত বিশুদ্ধ গ্রামীণ জেলাগুলির পক্ষেই অবস্থাটা বিশেষভাবে এই রকম। ডাঃ স্মিথ বলেন, “গড় পরিমাণ থেকে যা বোঝা যায়, শ্রমিক নিজের জন্য তার চেয়ে বেশি পুষ্টি পেয়ে থাকে, কেননা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় সে তার কাজ করার ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য- বেশি অংশটা খায়; দরিদ্রতর জেলাগুলিতে সমস্ত মাংস ও বেকনটাই সে খায়। তার স্ত্রী ও তার শিশুরাও দ্রুত বৃদ্ধির কালে যে-পরিমাণ খাদ্য পায়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এবং প্রায় সব কাউন্টিতেই স্বল্প, বিশেষ করে নাইট্রোজেনে অপ্রতুল।[৬২] কৃষকদের নিজেদের সঙ্গে যে পুরুষ ও নারী দাস-দাসীর। থাকে, তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি পায়। ১৮২১ সালে তাদের সংখ্যা ছিল ২,৮০,২৭৭ জন; ১৮৬১ সালে তা কমে গিয়ে দাড়ায় ২,৪,৬২। ডাঃ স্মিথ বলেন, “ক্ষেতে নারীদের শ্রমের যতই অসুবিধা থাক না। কেন: আজকের পরিস্থিতিতে তা পরিবারের পক্ষে বিরাট সুবিধাজনক, কেননা তা সেই পরিমাণ মজুরি যোগ করে যা জুতো ও পোষাক-আশাকের খরচ এবং বাড়ি ভাড়ার যোগান দেয় এবং এইভাবে পরিবারটির জন্য ভালো খাবারের সংস্থান করে।”[৬৩] উক্ত তদন্তের একটি লক্ষণীয় ফল হল এই যে, “যুক্তফ্রাজ্যের অন্যান্য অংশের মধ্যে ইংল্যাণ্ডের কৃষি-শ্রমিকই “বিশেষভাবে সবচেয়ে স্বল্পভুক্ত, নিচের সাণীটি থেকে যা দেখা যাবে :
একজন গড়পড়তা কৃষি-শ্রমিক কর্তৃক সপ্তাহ-প্রতি পরিভুক্ত কার্বন ও নাইট্রোজেনের পরিমাণঃ
ইংল্যান্ড — কার্বন-গ্রেন ৪৬,৬৭৩ — নাইট্রোজেন-গ্রেন ইংল্যান্ড ১,৫৯৪
ওয়েলস — ,, ৪৮,৩৫৪ — ,, ২,০৩১
স্কটল্যান্ড — ,, ৭৮,৯৮০ ,, ২,৩৪৮
আয়ারল্যাণ্ড — ,, ৪৩,৩৬৬ — ,, ২,৪৩৪
ডাঃ সাইমন তার সরকারি রিপোর্টে বলেন, “আমাদের কৃষি-শ্রমিকেরা সাধারণ ভাবে যে-বাসস্থান প্রাপ্ত হয়, তার সীমাবদ্ধ পরিমাণ ও শোচনীয় গুণমান সম্পর্কে ডাঃ হান্টারের রিপোর্টটির প্রত্যেকটি পাতাই একটি করে প্রমাণপত্র। এবং, অনেক বছর ধরে, ক্রমে ক্রমে, এইদিক থেকে শ্রমিকদের অবস্থা আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে। ঘর খুজে পাওয়াই এখন তার পক্ষে হয়ে উঠেছে আরো দারুন একটা কঠিন ব্যাপার, আর যদি খুজে পেতে একটা পাওয়াও যায়, তা এমন অনুপযুক্ত যে সম্ভবতঃ কয়েক শতাব্দীর মধ্যে তেমন আর হয়নি। বিশেষ করে, গত কুড়ি থেকে তিরিশ বছরের মধ্যে এই দুর্ঘটনা দ্রুত বেড়েই চলেছে এবং শ্রমিকের ঘর-সংসারের অবস্থা এখন হয়ে উঠেছে চরম মাত্রায় শোচনীয়। যে পর্যন্ত তারা, যারা তার শ্রমের দৌলতে সমৃদ্ধ হয়, তার প্রতি কিছুটা সদয় প্রশ্রয়ের সঙ্গে আচরণ করে, ততটুকু পর্যন্ত ছাড়া এ ব্যাপারে সে অত্যন্ত অদ্ভুত ভাবে অসহায়। যে-জমি চাষের কাজে সে অংশ নেয়, সেই জমিটার এক কোণায় সে একখানা ঘর পাবে কিনা, যদি পায় তা হলে সেই ঘরটা শুয়োরের খোঁয়াড় না হয়ে মানুষের থাকার উপযুক্ত হবে কিনা, ঘরের সঙ্গে, একটা ছোট্ট বাগান করার মত জায়গা—যা তার দারিদ্র্যের চাপ বহুল পরিমাণ লাঘব করতে পারে-থাকবে কিনা, এই সব তার প্রয়োজন মত ভদ্র বাসস্থান পাবার জন্য যুক্তিসঙ্গত ভাড়া দেবার ইচ্ছা ও সঙ্গতির উপরে নির্ভর করেনা, নির্ভর করে অন্যান্য যারা ঘর পেয়েছে তাদের নিজের জিনিস ইচ্ছামত ব্যবহারের অধিকারের সঙ্গে ব্যাপারটা সঙ্গতিপূর্ণ হচ্ছে বলে তারা মনে করে কিনা, তার উপরে। একটা জোত যত বিরাটই হোক না কেন, এমন কোনো আইন নেই যে তার ওপরে কিছু সংখ্যক শ্রমিকের থাকার ঘরের ব্যবস্থা (ভদ্র ব্যবস্থার তো কথাই ওঠেনা) করতে হবে; এমনকি এমন কোনো আইনও নেই যা, যে-জমির পক্ষে তার শ্রম রৌদ্র ও বৃষ্টির মতই অবশ্য-প্রয়োজন, সেই জমিতে তার জন্য এতটুকুও অধিকারও সংরক্ষিত করে না। একটি বাইরের ব্যাপার প্রবল ভাবে তার বিরুদ্ধে কাজ করে : গরিব আইনের আবাসন ও আর্থিক দায় সংক্রান্ত সংস্থানগুলির প্রভাব।[৬৪] এই সংস্থানগুলির দরুন প্রত্যেকটি প্যারিশ চায় তার আবাসিক শ্রমিকদের সংখ্যা যথাসম্ভব ন্যূনতম মাত্রায় হ্রাস করতে কেননা তাতে তার আর্থিক স্বার্থ থাকে; তার কারণ এই যে, কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিক ও তার পরিবারের জন্য নিরাপদ ও নিত্যস্থায়ী স্বনির্ভরতার নির্দেশক না হয়ে কৃষি-শ্রম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্দেশ করে দুঃস্থতায় উপনীত হবার দীর্ঘ বা হ্রস্ব পথ-পরিক্রমা—এমনি এক দুঃস্থতা যা পরিক্রমার সমগ্র পথটি ধরেই থাকে তার এত কাছে যে, যে-কোনো অসুখ বা সাময়িক কর্ম বিরতি তাকে বাধ্য করে ত্রাণ-সাহায্যের জন্য প্যারিশের দ্বারস্থ হতে;-অতএব, কোন প্যারিশে কৃষি-জনসংখ্যার গোটা বসতিটার ফল দাড়ায় তার গরিব-করের পরিমাণে বিপুল বৃদ্ধি। বড় বড় জমিদারের[৬৫] সিদ্ধান্ত করে তাদের জমিদারিতে শ্রমিকদের জন্য কোনো বাসস্থান হবে না, এবং সেক্ষেত্রে তাদের জমিদারি গরিবদের দায়-দায়িত্ব থেকে কার্যত আধাআধি মুক্ত থাকবে। ইংরেজদের সংবিধানে ও বিধানে এটা কতদূর পর্যন্ত অভিপ্রেত হয়েছে যে, জমিতে এই ধরনের নিঃশর্ত সম্পত্তি আয়ত্ত করা যাবে এবং জমিদার তার নিজের জিনিস ইচ্ছামত ব্যবহারের অধিকারের বলে এই দেশেরই চাষীদের সঙ্গে আচরণ করবে পর-দেশীদের মত, যাদের সে তাড়িয়ে দিতে পারে তার জমির সীমানা থেকে—এটা এমন একটা প্রশ্ন, যা নিয়ে এখানে আমি আলোচনা করার দাবি করছি না। কেননা জমি থেকে উচ্ছেদের সেই ক্ষমতা। কেবল তত্ত্বের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। কার্যক্ষেত্রেও ব্যাপক আকারে তা বিদ্যমান রয়েছে বিদ্যমান হয়েছে কৃষি-শ্রমিকের গার্হস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নিয়ামক শর্ত হিসাবে। . এই অনাচারের ব্যাপকত। সম্পর্কে ডাঃ হান্টার গত আদমশুমারিতে যে তথ্য প্রমাণ সংকলিত করেছিলেন, তার উল্লেখ করাই যথেষ্ট : ঘর-বাড়ির জন্য স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও গত দশ ‘ছর ধরে ই’লণ্ডের ৮২১টি আলাদ। আলাদা প্যারিশে বা টাউনশিপে। উপ-নগরে। ক্রমাগত বাড়ি-ঘর ধ্বংস করা হচ্ছে, যার ফলে যে-সমস্ত আবাসিক অনাবাসিকে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছে (অর্থাৎ প্যারিশগুলিতে যেখানে তারা কাজ করত। তাদের হিসাবে না ধরেও, এই সব প্যারিশ ও টাউনশিপগুলি ১৮৫১ সালে যে-পরিমাণ বাসস্থান যত সংখ্যক লোক ধারণ করত, ১৮৬১ সালে তার তুলনায় শতকরা ৪ কম পরিমাণ বাসস্থানে শতকরা ৫৪ বেশি সংখ্যক লোককে ধারণ করছে। ডাঃ হান্টার বলেন, যখন জনসংখ্যার-উচ্ছেদনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হল, তখন তার ফলে তৈরি হল এক একটি প্রদর্শনী পল্লী, যেখানে কুটিরগুলিকে পর্যবসিত করা হয়েছে অল্পমাত্র সংখ্যায় এবং যেখানে মেষপালক, উদ্যান মালী, শিকার-রক্ষী ইত্যাদির মত জমিদারের নিজস্ব প্রয়োজনের লোকজন ছাড়া আর কেউ রইল না–অর্থাৎ রইল কেবল নিয়মিত দাস-দাসী যারা তাদের শ্রেণী অনুযায়ী ভাল ব্যবহার পায়।[৬৬] কিন্তু জমির জন্য চাষ, এবং দেখা যায় যে তার জন্য নিযুক্ত শ্রমিকেরা আর জমির মালিকের ভাড়াটে নয়, তারা আসে কাছাকাছি কোনো মুক্ত গ্রাম থেকে, হয়ত তা তিন মাইল দূরে, তাদের কুটিগুলি ধ্বংস করে দেবার পরে যে-গ্রামের ছোট ছোট বাড়ি-মালিকেরা তাদের ভাড়াটে হিসাবে গ্রহণ করেছে। যখন পরিস্থিতি এই পরিণতির দিকে এগোয়, তখন যে-কটি কুটির তখনো সংস্কার বিহীন ভগ্নপ্রায় দশায় দাড়িয়ে থাকে, তারা নির্দেশ করে তাদের আসন্ন অবলুপ্তির ভবিষ্যতের দিকে। তাদের দেখা যায় স্বাভাবিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে। যতদিন পর্যন্ত কাঠামোটা কোনক্রমে দাড়িয়ে থাকে, ততদিন শ্রমিককে ওটা ভাড়ায় দেওয়া হয় এবং, এমনকি একটা ভালো বাসার সমান ভাড়া দিয়েও শ্রমিক খুশি হয়ে সেটা ভাড়া নেয়। কিন্তু তাতে না করা হয় আর কোনো রকম উন্নয়ন, না কোনো রকম মেরামতির কাজ; তবে কেবল সেইটুকু হয়, যতটুকু তার কপর্দকহীন ভাড়াটেরা নিজের করে নিতে পারে। এবং তার পরে যখন তা হয়ে পড়ে একেবারে বাসের অযোগ্য এমনকি সামান্যাম ভূমি-দাসেরও বাসের অযোগ্য, তখন ধ্বংসস্তুপের তালিকায় আরো একটি সংযোজন ঘটে, এবং ভবিষ্যৎ গরিব-করের বোঝ কিছুট। লাঘব হয়। এক দিকে যখন বড় বড় মালিকেরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন জমিগুলিকে এই ভাবে জনবসতি-শূন্য করে গরিব-কর এড়িয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে তখ। নিকটতম শহর বা মুক্ত গ্রামে উচ্ছিন্ন মানুষেরা গিয়ে দলে দলে ভিড় করছে; আমি বলছি বটে “নিকটতম” কিন্তু এই “নিকটতম”-র মানে হচ্ছে শ্রমিক যে কৃষি-জোতে দৈনিক খাটে ত’ থেকে তিন-চার মাইল দূরে। তখন সেই দৈনিক খাটুনির সঙ্গে যুক্ত হয় রুটি রোজগারের জন্য ছয় বা আট মাইল হাঁটবার দৈনিক প্রয়োজন, যেন সেটা কিছুই নয়। এবং যেন তার স্ত্রী বা সন্তানেরা কৃষি-জোতে যে-কাজই করুক না কেন, তাদেরকেও সহ্য করতে হয় ঐ অসুবিধা। এই দূরত্বজনিত যে বাড়তি খাটুনি, সেটাও সবখানি নয়। মুক্ত গ্রামটিতে বাড়ির ফটকাবাজের। ছোট ছোট জমির টুকরো কিনে নেয়, যেগুলি তারা যথাসম্ভব সস্তা কুঁড়েঘরে গায়ে গায়ে ছেয়ে ফেলে। আর সেই শোচনীয় আস্তান। গুলির মধ্যে (যেগুলি যদিও অবস্থিত মুক্ত গ্রামে, তবু কলংকিত শহরের সবচেয়ে কদর্য বৈশিষ্ট্যগুলির দ্বারা ভিড় করে ইংলণ্ডের কৃষি শ্রমিকেরা।[৬৭] অন্য দিকে ভাবলে ভুল হবে যে, যে-শ্রমিক তার চাষের জমিতেই থাকার ঘর পায়, সেখানে তার বাসস্থানের ব্যবস্থা সাধারণত এমন যে, তা তার উৎপাদনশীল শ্রমের জীবনের পক্ষে উপযুক্ত। এমনকি রাজকীয় জমিদারিতে পর্যন্ত তার কুটিরটি হতে পারে অতি জঘন্য ধরনের এমন সব জমিদার আছে, যারা মনে করে যে-কোনো খোয়াড়ই শ্রমিক আর তার পরিবারের থাকার পক্ষে যথেষ্ট এবং তবু তার লজ্জা হয় না ভাড়া নিয়ে বচেয়ে কঠোর দরকষাকষি করতে।[৬৮] হয়তো সেই সর্বনাশা কুঁড়েটায় আছে একটা মাত্র শোবার ঘর, যার না আছে কোনো আগুনের ঝাঁঝরি, না কোনো পায়খানা, না কোন খোলা জানাল, ডােবা ছাড়া না আছে কোনো জলের ব্যবস্থা, না কোনো বাগান—কিন্তু এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে শ্রমিক অসহায়। আইনসমূহ . আর আবর্জনা অপসারণ হল কেবল বাজে কাগজের টুকরো যার ব্যবহার নিন্দ্র করে এমন সব কুটির মালিকের উপর যাদের একজনের কাছ থেকে সে তার কুঁড়েঘরটা ভাড়া পেয়েছে ন্যায়নীতি স্বার্থে এটা অত্যাবশ্যক যে, আলো-ঝলমল অতি-বিরল স্থানগুলি থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে এনে তা নিবদ্ধ করা উচিত এই ব্যাপ্ত ঘটনাবলীর উপরে, যা ইংল্যাণ্ডের সভ্যতার পক্ষে একটা ধিক্কার-স্বরূপ। বস্তুত পক্ষে এটা একটা শোচনীয় পরিস্থিতি যে, বর্তমান আবাসন-পরিস্থিতির গুণগত অপকর্ষ এত প্রকট হওয়া সত্ত্বেও, উপযুক্ত পর্যবেক্ষকদের অভিন্ন সিদ্ধান্ত এই যে, বাসস্থানগুলির সাধারণ অপকৃষ্ট অবস্থার তুলনাতেও ঢের বেশি জরুরি সমস্যা হল সেগুলির স’খ্যাগত অপ্রতুলতা। অনেক বছর ধরেই গ্রামীণ শ্রমিকদের অতি-জনাকীর্ণ বাসস্থানগুলি কেবল ” সাস্থ্য-সংক্রান্ত কল্যাণের বিষয় ভাবেন কেবল তাদের কাছেই নয়, সেই সঙ্গে স্বর। ভদ . নৈতিক সম্বন্ধে ভাবেন, তাদের কাছেও গভীর উদ্বেগের ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। গ্রাঞ্চলে মহামাৰি-ব্যাধিগুলির বিস্তার সঙ্গে প্রতিবেদকে বারংবার এমন অভিন্ন ভাষায় এই অতি-জনাবীর্ণতার উপরে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে মনে হয় যেন তারা একই গৎ-বঁধ! বুলি আউডে চলেছেন; তারা এই অতি জনাকীর্ণতার উপরে চরম গুরুত্ব দিয়েছেন এই কারণে যে, এটা এমনি একটা ঘটনা যা সংক্রমণ রোধের প্রত্যেকটি প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দেয়। এবং বারংবার এই দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়েছে যে, পল্লী-পরিবেশে বহু স্বাস্থ্যকর উপাদান থাকা সত্ত্বেও, এই অতি জনাকীর্ণতা, যা সংক্রামক ব্যাধি বিস্তারের পক্ষে এত অনুকূল, এমন সব ব্যাধিরও জন্ম দেয়, যা সংক্রামক নয়। এবং যারা আমাদের গ্রামীণ জনসংখ্যার এই ভিড-আক্রান্ত পরিস্থিতিকে নিন্দা করেছেন, তার তার। আরো একটি ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নীরব থাকেন নি। যদিও তাদের পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক বিষয় ছিল স্বাস্থ্যের পক্ষে অনিষ্টকর দিকগুলি, অনেক সময়ই তারা বাধ্য হয়েছেন উল্লিখিত বিষয়টির অন্যান্য দিকগুলি সম্পর্বেও উল্লেখ করতে। বয়স্ক নারী-পুরুষের, বিবাহিত ও অবিবাহিতরা : প্রায়শই একটি ছোট্ট শোবার ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয়, তা দেখাতে গিয়ে, তাদের রিপোর্টগুলিতে দৃঢ় ভাবে এই কথা বলা হয়েছে যে, উল্লিখিত অবস্থায় শালীনতা বিনষ্ট হতে বাধ্য। এবং নৈতিকতাও স্বভাবতই ক্ষগ না হয়ে পারে না।[৬৯] যেমন দৃষ্টান্ত হিসাবে, আমার গত শরৎকালীন রিপোর্টের পরিশিষ্টে বাকিংহাম শায়ারে উইং-এ জ্বরের আক্রমণ। সম্পর্কে রিপোর্ট করতে গিয়ে ডাঃ অর্ড বলেন, কেমন করে একজন যুবক উইনগ্রেভ থেকে জ্বর নিয়ে সেখানে এসেছিল, “তার অসুখের প্রথম ক’দিন একই রুমে আরো ন’জনের সঙ্গে ঘুমোত। এক পক্ষকালের মধ্যে তাদের আরো ক’জন জ্বরে আক্রান্ত হল এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ন’জনের মধ্যে পাঁচজনই শয্যাগত হল, এবং একজন মারা গেল। সেন্ট জর্জ হাসপাতালের ডাঃ হার্ভে, যিনি ঐ মহামারীর সময়ে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কারণে উইং-এ গিয়েছিলেন, তার কাছ থেকে ঠিক এই মর্মে একটি রিপোর্ট আমি পেয়েছিলাম :: “একটি জ্বরাক্রান্ত তরুণী একই ঘরে রাতে তার বাবা ও মা, তার জারজ সন্তান, দুজন তরুণ (তার দু ভাই) এবং তার দু বোন ও তাদের প্রত্যেকের একটি করে জারজ সন্তানকে নিয়ে-মোট ১০ জন একসঙ্গে ঘুমোত। কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত সেখানে ঘুমোত ১৩ জন।[৭০]
