শস্য আইন প্রত্যাহারের ঠিক আগেকার সময়টা কৃষি-শ্রমিকদের অবস্থার উপরে নোতুন আলোক সম্পাত করে। এক দিকে, শস্য আইনগুলি সত্য সত্যই যারা উৎপাদনকারী তাদের স্বার্থ কত সামান্য ভাগ রক্ষা করে, সেটা দেখানো ছিল মধ্য শ্রেণীর আন্দোলনকারীদের স্বার্থের পক্ষে অনুকূল। অন্য দিকে, কারখানা-ব্যবস্থার। প্রতি ভূম্যধিকারী অভিজাত-বর্গের ধিক্কারে এবং কারখানা-কর্মীদের প্রতি ঐ চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, হৃদয়হীন ও কেতাদুরস্ত নিষ্কর্মাদের কপট সহানুভূতিতে এবং কারখানা আইনের জন্য তাদের “কূটনৈতিক আগ্রহে” শিল্প-বুর্জোয়ারা চাপা আক্রোশে ফুসত। ইংরেজিতে একটা পুরানো প্রবাদ আছে যে, “যখন চোরদের মধ্যে ঝগড়া হয়, তখন সাধু লোক কারা তা আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে”, এবং, বাস্তবিক পক্ষে, শাসক দুটি গোষ্ঠর মধ্যে কোন্ গোষ্ঠীটি শ্রমিকদের অধিকতর নির্লজ্জ ভাবে শোষণ শ্রেণীর করেছিল—এই নিয়ে যখন তাদের মধ্যে জোর গলায় উত্তেজনাপূর্ণ ঝগড়া হয়, তখন সেই পারস্পরিক ঝগড়াই হয় সত্য-প্রসবের ধাত্রী। আল শ্যাফটসবেরি, তদানীন্তন লর্ড অ্যাশলি ছিলেন অভিজাততান্ত্রিক, লোকহিতৈষী, কারখানা-বিরোধী অভিযানের প্রধান সেনানায়ক। সুতরা”, ১৮৪৫ সালে ‘মর্নিং ক্রনিক্স পত্রিকায় যেসব তথ্য উদঘাটিত হয়, তিনি ছিলেন তাতে একটি প্রিয় বিষয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই উদারনৈতিক মুখপত্রটি কৃষিপ্রধান জেলাগুলিতে কয়েকজন বিশেষ কমিশনার প্রেরণ করেছিল, যারা কেবল সাধারণ বর্ণনা ও পরিসংখ্যান নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন না, যে-সমস্ত শ্রমজীবী পরিবারকে পরীক্ষা করেছিলেন তাদের নাম এবং সেই তাদের জমিদারদেরও নাম প্রকাশ করেছিলেন। নিম্ন-প্রদত্ত তালিকাটিতে ব্ল্যানফোর্ড, উইমবোর্ন এবং পুল-এর নিকটবর্তী তিনটি গ্রামে যে মজুরি দেওয়া হয়, তা দেখানো হয়েছে। এই তিনটি গ্রাম হল মিঃ জি ব্যাংক এবং শ্যাফট্সবেরি আল-এর সম্পত্তি। লক্ষ্যণীয় যে, ব্যাংকস-এর মত এই “নিম্ন গীর্জার পোপ”, এই ইংরেজ পুরোহিত-প্রধানও বাড়িভাড়ার নাম করে শ্রমিকদের শোচনীয় মজুরির একটা বড় অংশ পকেটস্থ করে। (৪১৩ পৃঃ সারণী দ্রষ্টব্য)
ছবি। পেজ ৪১৩
শস্য আইন প্রত্যাহারের ফলে ইংল্যাণ্ডের কৃষিকর্মে একটা প্রেরণা সঞ্চারিত হল।[৫০] সবচেয়ে ব্যাপক আকারে জল-নিকাশের ব্যবস্থা, গোশালায় খাওয়াবার নোতুন পদ্ধতি, সবুজ ফসলের কৃত্রিম চাষের নোতুন পদ্ধতি, যান্ত্রিক সার-প্ৰয়োগ ব্যবস্থার প্রবর্তন, মাটি তৈরির নোতুন প্রণালী, খনিজ সাবের বর্ধিত ব্যবহার, বাম্প-ইঞ্জিনের এবং নানান ধরনের নোতুন মেশিনারির প্রচলন, সাধারণ ভাবে আরো নিবিড় কৰ্ষণ-এই সবই হল এই যুগের বৈশিষ্ট্য। রাজকীয় কৃষি সংস্থার সভাপতি মিঃ পুসে ঘোষণা করেন, নোতুন মেশিনারি প্রবর্তনের কল্যাণে চাষের ( আপেক্ষিক) ব্যয় প্রায় অর্ধেক হ্রাস পেয়েছে। অন্য দিকে, মৃত্তিকার প্রতিদান বস্তুতই বৃদ্ধি পেয়েছে। একরপ্রতি অধিকতর মূলধনের নিয়োজন এবং, তার ফলে, জোতসমূহের দ্রুততর সংকেন্দ্রীভবন এই হল নোতুন কৃষি-পদ্ধতির আবশ্যিক শর্ত।[৫১] একই সময়ে ১৮৪৬ থেকে ১৮৫৬ সালের মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ ৪,৬৪,১১৯ একরেরও বেশি বৃদ্ধি পেল; তা ছাড়াও, পূর্বাঞ্চলের কাউন্টিগুলিতে যে-বিরাট এলাকা পড়েছিল, সেগুলিকে খড়গোসের বাসভূমি ও নিকৃষ্ট চারণক্ষেত্র থেকে রূপান্তরিত করা হল চমৎকার শস্যক্ষেত্রে। আগেই দেখানো হয়েছে, ঐ একই সময়ে কৃষিকর্মে নিযুক্ত মোট ব্যক্তির সংখ্যা হ্রাস পেল। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সকল বয়সের শ্রমিকের সংখ্যা ১৮৫১ সালে যেখানে ছিল ১২,১১,৩৯৬, ১৮৬১ সালে তা কমে গিয়ে দাড়াল ১১,৬৩,২১৭।[৫২] সুতরাং ইংরেজ রেজিস্ট্রার-জেনারেল সঠিক ভাবেই যে-মন্তব্য করেন, “১৮০১ সাল থেকে কৃষক ও কৃষি-শ্রমিকদের যে-বৃদ্ধি ঘটে, তা : কৃষিজাত দ্রব্যাদির বৃদ্ধির সঙ্গে কোনো অনুপাত রক্ষা করেনি,[৫৩] সেই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, অনুপাত-বৈষম্য অনেক বেশি মাত্রায় ঘটে সর্বশেষ পর্যায়ে, যখন আরো নিবিড় কর্ষণ, মুক্তিকায় বিনিয়োজিতও তার উৎপাদন-কার্যে প্রযুক্ত মূলধনের অভূতপূর্ব অগ্রগতি এবং মাটির ফলনের পরিমাণে ইতিহাসে তুলনাবিহীন বৃদ্ধি, জমিদারদের ঘর-ভাড়ার উচ্চহার এবং ধনতান্ত্রিক কৃষকদের বর্ধিষ্ণু ধনসম্পদের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিকর্মে নিযুক্ত জনসমষ্টির চরম সংখ্যা হ্রাস। যদি আমরা দ্রুত ও অবিরাম গতিতে বাজারের তথা শহরের বিস্তার ও অবাধ বাণিজ্যের রাজত্বের সঙ্গে এই জিনিসটিকে এক সঙ্গে করে দেখি, তা হলে তো কৃষি-শ্রমিককে দেখতে পাব শেষ পর্যন্ত post tot discrimina rerum, এমন এক অবস্থায় যাতে তার হওয়া উচিত, ১ecundum artem, মুখের মদে মাতাল।।
অথচ অধ্যাপক রজার্স সিদ্ধান্ত করেছেন যে, আজকের ইংরেজ কৃষি-শ্রমিকের ভাগ্য তার চতুর্দশ শতকের শেষার্ধের বা পঞ্চদশ শতকের পূর্বপুরুষের সঙ্গে তো দূরের কথা, কেবল ১৭৭৩ থেকে ১৭৭০ সালের পূর্বপুরুষের ভাগ্যের সঙ্গে তুলনাতেও অস্বাভাবিক মাত্রায় আরো খারাপের দিকে গিয়েছে, “কৃষি-শ্রমিক আবার পরিণত হয়েছে ভূমিদাসে। এমন একজন ভূমিদামে যার খাওয়া-পরা হয়েছে আরো শোচনীয়।[৫৪] ডাঃ হান্টার কবি-শ্রমিকের আবাসন সম্পর্কে তাঁর যুগান্তকারী রিপোর্টে বলেছেন, “খেতি-র (কৃষি শ্রমিক, ভূমিদাস-প্রথার আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নাম } খরচ ধার্য হয় তার বেঁচে থাকার মত যথাসম্ভব নিম্নতর পরিমাণে তাকে খাটিয়ে যে-মুনাফা কামানো হয়, তার সঙ্গে তাকে যে-মজুরি ও আস্তানা দেওয়া হয়, তার কোনো সম্পর্ক নেই। চাষের কাজের খরচের হিসাবে সে একটা শূন্য।[৫৫] প্রাণ-ধারণের দ্রব্য-সামগ্রীকে সব সময়েই ধরা হয় একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বলে।[৫৬] তার আয় আরো কমলে সে বলতে পারে, inihil habeo nilhil curo, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার কোনো ভয় নেই, কেননা কেবল টিকে থাকার জন্য যতটুকু চাই, ততটুকুই এখন সে পায়। সে এখন পৌছে গিয়েছে শূন্যে, যেখান থেকে শুরু হয় তার নিয়োগকারী কৃষকের গোনাগুনি। যাই আসুক না কেন, সম্পদেও যেমন তার কোনো ভাগ নেই, বিপদেও তেমন তার কোনো ভাগ নেই।” [৫৭]
