মূল্যের পরিমাপ এবং দামের মান হিসেবে অর্থের দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কাজ সম্পাদন করতে হয়। যে পরিচয়ে তা মনুষ্য শ্রমের সমাজ-স্বীকৃত মূর্তরূপ, যে পরিচয়ে অর্থ হচ্ছে মূল্যের পরিমাপ; যে পরিচয়ে তা কোন ধাতুর নির্দিষ্ট পরিমাণ সে, পরিচয়ে তা দামের মান। মূল্যের পরিমাপ হিসেবে তা সমস্ত বিচিত্র বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর বহুবিধ মূল্যকে দামে তথা সোনার বিভিন্ন কল্পিত পরিমাণে পরিবর্তিত করে; দামের মান হিসেবে তা আবার ঐ পরিমাণগুলির পরিমাপ করে। মূল্যের পরিমাপ পণ্যসামগ্রীকে পরিমাপ করে মূল্য হিসেবে; উল্টো দিকে, দামের মান পরিমাপ করে সোনার একটি এককের সাহায্যে সোনার বিভিন্ন পরিমাণ অন্য কোন পরিমাণ সোনার ওজনের সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার মূল্যকে নয়। মোনাকে দামের মানে পরিণত করতে হলে, তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণকে স্থির করতে হবে একক হিসেবে। একই অভিধার অন্তর্গত সমস্ত মূল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে যেমন, এ ক্ষেত্রেও তেমন, পরিমাপের একটি সুস্থির একক প্রতিষ্ঠা করার গুরুত্ব সর্বময়। অতএব, উক্ত একক যত কম অস্থির হবে, তত ভালো ভাবে দামের মান তার ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু কেবল তত দূর পর্যন্তই সোনা পারে মূল্যের পরিমাপ হিসেবে কাজ করতে, যতদূর পর্যন্ত সে নিজেই হচ্ছে শ্রমের ফল এবং সেই কারণেই অস্থিরমূল্যতার সম্ভাবনা-যুক্ত। [৬]
প্রথমত, এটা সম্পূর্ণ, পরিষ্কার যে সোনার মূল্যে কোনো পরিবর্তন দামের মান হিসেবে তার ভূমিকাকে কোনক্রমেই ক্ষুন্ন করে না। এই মূল্য কিভাবে পরিবর্তিত হয় তাতে কিছু এসে যায় না, উক্ত ধাতুর বিভিন্ন পরিমাণের মধ্যকার অনুপাত স্থিরই থাকে। মূল্য যত বেশিই হ্রাস পাক না কেন, ১২ আউন্স সোনার মূল্য তখনো থাকে ১ আউন্স সোনার ১২ গুণ আর দামের ক্ষেত্রে একমাত্র যে জিনিসটি বিবেচনা করা হয় তা হল সোনার বিভিন্ন পরিমাণের মধ্যকার সম্পর্কটি। যেহেতু একদিকে, এক আউন্স সোনার মূল্য, কোনো বৃদ্ধি বা হ্রাসই তার ওজনে কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারে না, সেই হেতু তার ভগ্নাংশগুলির ওজনেও কোনো পরিবর্তন ঘটতে পারে না। সুতরাং সোনার মূল্যে যতই পরিবর্তন ঘটুক না কেন, তা দামের অপরিবর্তনীয় মান হিসেবে একই কাজ দিয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ত, সোনার মূল্যে কোন পরিবর্তন মূল্যের পরিমাপ হিসেবে তার যে কাজ, তাকে ক্ষুন্ন করে না। এই পরিবর্তন সমস্ত পণ্যের উপরেই যুগপৎ প্রভাব বিস্তার করে এবং সেই কারণেই, caeteris paribus, তা তাদের আপেক্ষিক মূল্যগুলিকেও inter se, অপরিবর্তিতই রেখে দেয়—যদিও এই মূল্যগুলি এখন অভিব্যক্ত হয় উচ্চতর বা নিম্নতর স্বর্ণ-দামে।
যেমন আমরা অন্য কোন পণ্যের ব্যবহার-মূল্যের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দিয়ে কোন পণ্যের মূল্য হিসেব করে থাকি, ঠিক তেমনি সেই পণ্যটির মূল্য সোনার অঙ্কে হিসেব করতে গিয়ে, আমরা এথেকে বেশি কিছুই ধরে নেই না যে একটি বিশেষ সময়ে একটি বিশেষ পরিমাণ সোনা উৎপাদন করতে ব্যয় হয় একটি বিশেষ পরিমাণ শ্রম। সাধরণ ভাবে দামসমূহের ওঠা নামা সম্পর্কে উল্লেখ্য যে আগেকার একটি অধ্যায়ে যে প্রাথমিক আপেক্ষিক মূল্যের নিয়মগুলি সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে এই ওঠা-নাম। সেই নিয়মগুলিরই অধীন।
পণ্য সম্ভারের দামসমূহে একটা সাধারণ বৃদ্ধি ঘটতে পারে কেবল তখনি যখন অর্থের মূল্য স্থির থেকে তাদের মূল্য বৃদ্ধি পায় অথবা কেবল তখনি যখন পণ্য-সমুহের মূল্য স্থির থেকে অর্থের মূল্য বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, দামসমূহে একটি সাধারণ হ্রাস ঘটতে পারে কেবল তখনি, যখন—অর্থের মূল্য একই থেকে—পণ্যসম্ভারের মূল্য-সমূহে হ্রাস ঘটে, কিংবা—পণ্যসম্ভারের মূল্য-সমূহ একই থেকে—অর্থের মূল্যে বৃদ্ধি ঘটে। সুতরাং এ থেকে কিছুতেই এ সিদ্ধান্ত আসে না যে, অর্থের মূল্যে কোনো বৃদ্ধি আবশ্যিক ভাবেই ঘটায় পণ্যের দামে অনুপাতিক হ্রাস কিংবা এ সিদ্ধান্তও আসে না যে অর্থের মূল্যে হ্রাস ঘটলে পণ্যের দামেও ঘটে আনুপাতিক বৃদ্ধি। দামের এবংবিধ পরিবর্তন ঘটে কেবল সেইসব পণ্যের ক্ষেত্রে, যাদের মূল্য থাকে স্থির। দৃষ্টান্ত স্বরূপ যেসব জিনিসের মূল্য অর্থের মূল্যের সঙ্গে একই সময়ে এবং একই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়, সে সব জিনিসের বেলায় দামে কোনো বৃদ্ধি ঘটে না। এবং যদি তাদের মূল্য অর্থের মূল্য থেকে ধীরতর বা দ্রুততর তালে বৃদ্ধি পায়, তা হলে তাদের দামে হ্রাস বৃদ্ধি বা নির্ধারিত হবে তাদের মূল্য এবং অর্থের মূল্য—এই দুইয়ের পার্থক্যের দ্বারা ইত্যাদি ইত্যাদি।
এখন দাম-রূপের আলোচনায় যাওয়া যাক। কালক্রমে অর্থ হিসেবে চালু মহার্ঘ ধাতুটির বিভিন্ন ওজনের বিভিন্ন প্রচলিত অর্থ নামসমূহ এবং শুরুতে ঐ সমস্ত নাম যে যে ওজনের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করত, সেই সব ওজন এই দুয়ের মধ্যে ক্রমে ক্রমে পার্থক্য দেখা দেয়। এই পার্থক্য বিবিধ ঐতিহাসিক কারণের ফল, যেগুলির মধ্যে প্রধান প্রধান কারণগুলি নিম্নরূপ :-(১) একটি অপূর্ণাঙ্গ ভাবে বিকশিত সমাজে বিদেশী অর্থের আমদানি। রোমের প্রথম যুগে এই রকম ঘটেছিল, সেখানে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রথমে চালু হয়েছিল বিদেশী পণ্য হিসাবে। এই সমস্ত বিদেশী মুদ্রার নাম কখনো দেশীয় ওজন গুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতো না। (২) ধন-সম্পদ যতই বৃদ্ধি পায়, ততই অধিক মূল্য ধাতু অল্প মূল্য ধাতুকে মূল্যের পরিমাপকের ভূমিকা থেকে উৎখাত করে দেয়, রূপা দেয় তামাকে, সোনা দেয় রূপাকে,তা এই ঘটনাক্রম যতই কাব্যে বর্ণিত ঘটনাক্রমের বিরোধী হোক না কেন।[৭] যেমন ‘পাউণ্ড’ কথাটি শুরুতে ছিল সত্যকার এক পাউণ্ড ওজনের রূপার অর্থ-নাম। যখন মূল্যের পরিমাপক হিসেবে রূপার স্থান সোনা নিয়ে নিল, তখন রূপা ও সোনার মুল্যের অনুপাত অনুযায়ী সেই একই নাম প্রযুক্ত হ’ল সম্ভবতঃ সোনার ৫ ভাগ বোঝাবার জন্য। এইভাবে অর্থ-নাম হিসেবে পাউণ্ড কথাটির মানে ওজন-নাম হিসেবে তার যে মানে তা থেকে আলাদা হয়ে গেল।[৮]
