(ঙ) ব্রিটেনের কৃষি-সর্বহারা
ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ও সঞ্চয়নের স্ব-বিরোধী চরিত্র ইংল্যাণ্ডে কৃষিকর্মের (গো প্রজনন সহ) অগ্রগতি এবং কৃষি-কর্মীর পশ্চাৰ্গতিতে যেমন ভাবে আত্ম-প্রতিষ্ঠা করে, তেমন পাশবিক ভাবে আর কোথাও করে না। তার বর্তমান পরিস্থিতির আলোচনার আগে আমি একবার তার অতীতের উপর দিয়ে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিতে চাই। ইংল্যাণ্ডে আধুনিক কৃষিকর্মের সূচনা হয় আঠারো শতকের মধ্যভাগে, যদিও যাকে ভিত্তি করে এই পরিবর্তিত উৎপাদন-পদ্ধতির শুরু, ভূমিগত সম্পত্তিতে সেই বিপ্লবের সূচনা হয় আরো অনেক আগে।
আর্থার ইয়ং, যিনি চিন্তার ক্ষেত্রে অগভীর হলেও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে ছিলেন যত্নবান, ১৭৭১ সালে কৃষি-শ্রমিকের অবস্থা সম্পর্কে তাঁর বিবৃতিগুলিকে যদি আমরা গ্রহণ করি, তা হলে আমরা দেখতে পাই যে চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ দিকে তার পূর্ববর্তী কৃষি-শ্রমিকের তুলনায় তার অবস্থা ছিল অতীব শোচনীয়; “তখন শ্রমিক : ভোগ। করতে পারত প্রাচুর্য এবং সঞ্চয় করতে পারত ঐশ্বর্য”[৪২], ‘শহর ও গ্রামের শ্রমিকের পক্ষে স্বর্ণযুগ” যে-পঞ্চদশ শতাব্দী, তার কথা নাইবা তুললাম। যাই হোক, আমাদের অতদূর যাবার দরকার নেই। ১৭৭৭ সালের অনেক বেশি তথ্যপূর্ণ অন্য একটি বইয়ে আমরা পাই : “বৃহৎ কৃষক প্রায় তার (‘ভদ্রলোকের’) সমপর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। অন্য দিকে বেচারা কৃষি-শ্রমিক প্রায় মাটিতে অধঃপাতিত হয়েছে। যদি মাত্র চল্লিশ বছর অবস্থার সঙ্গে এখানকার অবস্থা তুলনা করা যায়, তা হলেই তার দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জমিদার আর তার প্রজা দুজনেই হাতে হাত মিলিয়ে শ্রমিককে দাবিয়ে রেখেছে।[৪৩] তারপরে ঐ বইটিতে সবিস্তারে দেখানো হয়েছে যে, ১৭৩৭ থেকে ১৭৭৭ সাল অবধি কৃষি-মজুরি প্রায় ৪ ভাগ বা ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ডঃ রিচার্ড প্রাইস-ও বলেন, “আধুনিক কর্মনীতি, বাস্তবিক পক্ষে, উচ্চতর শ্রেণীগুলির পক্ষেই অনুকূল; এবং এর পরিণতি এমন পর্যন্ত দাড়াতে পারে যে গোটা রাজ্যটাই পর্যবসিত হবে ‘ভদ্রলোক’ আর ভিখারীতে, কিংবা অভিজাত আর ক্রীতদাসে।”[৪৪]
যাই হোক, কি আহার ও বাসস্থান, কি আত্মসম ও আমোদ-প্রমোদকোনো ব্যাপারেই ইংল্যাণ্ডের কৃষি শ্রমিক ১৭৭০ থেকে ১৮০ সালে যে-অবস্থায় ছিল, ওর পরে আর কোনো সময়েই সেই আদর্শে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। ১৭৭০-৭১ সালে গমের পাইন্টের হিসাবে তার গড় মজুরি ছিল ৯০ পাইণ্ট, এডেন-এর সময়ে ( ১৭৯৭) কেবল ৬৫, ১৮০৮ সালে মাত্র ৬০। [৪৫]
জ্যাকোবিন-বিরোধী যুদ্ধের শেষে, যখন জমিদার, জোতদার, কারখানা-মালিক, সওদাগর, ব্যাংক-ব্যবসায়ী, শেয়ার-দালাল, সেনাবাহিনীর ঠিকাদার ইত্যাদির অসাধারণ-পরিমাণ বিত্ত গুছিয়ে নিয়েছিল, তখন কৃষি-শ্রমিকদের অবস্থা কী ছিল, তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। অংশতঃ ব্যাংক-নোটের অবমূল্যায়নের দরুন, অংশতঃ ঐ অবমূল্যায়ন-ব্যতিরেকেই জীবনধারণের প্রাথমিক দ্রব্যসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির দরুন আর্থিক মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু আসল মজুরিতে কতটা-কি অদল-বদল ঘটেছিল, তা অপ্রয়োজনীয় বিবরণের মধ্যে না গিয়েও একটি সহজ উপায়ে বোঝা যায়। ‘গরিব আইন’ ১৭৯৫ সালেও যা ছিল, ১৮১৪ সালেও তাই ছিল। এই আইন গ্রামাঞ্চলে কিভাবে কার্যকরী করা হয়েছিল, সেট। স্মরণে রাখা দরকার : শ্রমিকের নিছক প্রাণ-ধারণের জন্য যে-সামান্য পরিমাণ অর্থ দরকার, তার আর্থিক মজুরির সঙ্গে সামান্য অর্থ যোগ করে প্যারিশ সেই পরিমাণ-টুকু তাকে পুষিয়ে দিত—ভিক্ষা হিসাবে। কৃষক তাকে যে মজুরি দিত এবং প্যারিশ তাকে তার মজুরি-ঘাটতি পুষিয়ে দেবার জন্য যা দিত এই দুটির মধ্যেকার পার্থক্যটি থেকে দুটি বিকাশ প্রকাশ পায়। প্রথমতঃ প্রকাশ পায় ন্যূনতম মজুরি থেকেও প্রদত্ত মজুরি কতটা নেমে গিয়েছিল, তার মাত্রা, এবং দ্বিতীয়ত, কৃষি-শ্রমিক কতটা ছিল দুঃস্থ অর্থাৎ কতটা সে পরিণত হয়েছিল প্যারিশের ভুমি-দাসে (সাফ’-এ, তার মাত্রা। সমস্ত কাউন্টিগুলি গড়পড়তা অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, এমন একটা কাউন্টির কথা বিবেচনা করা যাক। নর্দাম্পটনশায়ারে, ১৭৯৫ সালে, গড় সাপ্তাহিক মজুরি ছিল ৭ শি ৬ পে; ৬ জনের একটি পরিবারের বার্ষিক ব্যয় ছিল ৩৬ পা ১২ শি ৫ পে; তাদের মোট আয় ছিল £ ২৯ পা ১৮ শি; প্যারিশ কর্তৃক ঘাটতি-পূরণের পরিমাণ ছিল ৬ পা ১৪ শি ৫ পে। ১৮১৪ সালে, ঐ একই কাউন্টিতে সাপ্তাহিক মজুরি ছিল ১২ শি ২ পে; ৫ জনের একটি পরিবারের মোট বাৎসরিক ব্যয় ছিল ৪ ৫৪ পা ১৮ শি ৪ পে; তাদের মোট আয় ৪ ৩৬ পা ২ শি; প্যারিশ কর্তৃক ঘাটতি-পূরণের পরিমাণ ১৮ পা ৬ শি ৪ পে।[৪৬] ১৭৯৫ সালে ঘাটতি ছিল ৪ ভাগের কম, ১৮১৪ সালে অর্ধেকের বেশি। এটা সুস্পষ্ট যে, এই পরিস্থিতিতে, কৃষি-শ্রমিকের কুটিরে ইডেন যে-সামান্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তখনো প্রত্যক্ষ করেছিলেন, ১৮১৯ সালের মধ্যে তা উধাও হয়ে গিয়েছে।[৪৭] যতগুলি জীব জন্তুকে কৃষক রাখত, সেগুলির মধ্যে তখন থেকে শ্রমিকই, কথা-বল। যন্তরটি’-ই, হল সবচেয়ে অত্যাচারিত, সবচেয়ে অপুষ্টি-পীড়িত, সবচেয়ে পাশবিক আচরণ-প্রাপ্ত প্রাণী।
এই একই পরিস্থিতি নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছিল যে-পর্যন্ত না “১৮৩০ সালে, সুইংগ-এর দাঙ্গা-হাঙ্গামা জলন্ত ফসল-গোলার আগুনে আমাদের ( অর্থাৎ শাসক-শ্রেণীগুলির ) কাছে প্রকাশ করে দিল সেই দুঃখ-দুর্দশা ও বিদ্রোহ-উন্মুখ অসন্তোষকে যা ভয়ংকর ভাবে ধূমায়িত হচ্ছিল যেমন কৃষি-প্রধান ইংল্যাণ্ডের, তেমনি শিল্প-প্রধান ইংল্যাণ্ডের উভয়েরই অন্তস্থলে।[৪৮] এই সময়ে কমন্স সভায় স্যাডলার কৃষি-শ্রমিকদের অভিহিত করেন “শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস” বলে এবং লর্ড সভায় একজন বিশপ এই অভিধানটির প্রতিধ্বনিত করেন। সে আমলের সর্বাপেক্ষা খ্যাতনামা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিবিদ ই জি ওয়েকফিল্ড বলেন, “দক্ষিণ ইংল্যাণ্ডের কৃষি-মজুর মুক্ত-মানুষ নয়, আবার গোলামও নয়; সে দুঃস্থ।” [৪৯]
