১৮৬৬ সালের সংকটের পরবর্তী দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে একটি টোরি পত্রিকা থেকে নিয়োত একটি অনুচ্ছেদ। ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, এখানে বলা হচ্ছে লণ্ডনের ‘ইস্ট-এণ্ড’-এর কথা, যা কেবল লৌহ-জাহাজ নির্মাণেরই কেন্দ্র নয়, সেই সঙ্গে স্বল্প-মজুরি-প্রদত্ত একটি তথাকথিত গৃহ-শিল্পেরও কেন্দ। “মহানগরের একটি অংশে গতকাল দেখা গিয়েছিল একটি ভয়ংকর দৃশ্য। যদিও ইস্ট এণ্ডের হাজার হাজার বেকা: সকলেই দল বেঁধে কালো পতাকা হাতে মিছিল করেনি, তবু সেই জন প্রবাহ ছিল খুবই শক্তিব্যঞ্জক। এরা কী যন্ত্রণা ভোগ করছে, তা মনে করে দেখুন। এরা মারা যাচ্ছে ক্ষুধার তাড়নায়। এটাই হল সরল অথচ নিষ্ঠুর সত্য। এরা আছে ৪০,০০। আমাদের চোখের সামনে, এই মহাশ্চর্য মহানগরের এক অংশে পৃথিবী কখনো যেমন দেখেনি, তেমন বিপুল ঐশ্বর্যের সর্বোচ্চ সঞ্চয়ের ঠিক পাশের দরজার গায়ে-গায়ে ধুকছে ৪০ হাজার অসহায়, অনাহার-ক্লিষ্ট মানুষ। এই হাজার হাজার মানুষ এখন আছড়ে পড়ছে মহানগরের অন্যান্য অংশে; সব সময়েই অর্ধভুক্ত, এই দুর্ভাগার। আমাদের কানের কাছে চেঁচিয়ে বলছে তাদের দুর্গতির কথা তার। চেঁচিয়ে বলেছে ভগবানের উদ্দেশ্যে, তাদের শোচনীয় কুঁড়েঘরগুলি থেকে তারা আমাদের বলছে, তাদের পক্ষে কাজ পাওয়া অসম্ভব, ভিক্ষা করা অনর্থক। স্থানীয় কর-দাতারা নিজেরাই যাজকতন্ত্রের নানাবিধ দক্ষিণ। মেটাতে গিয়ে দুঃস্থর কিনারায় গিয়ে পৌঁছেছে।”; ‘স্ট্যাণ্ডার্ড’, ৫ই এপ্রিল, ১৮৬৭)।
যেহেতু ইংরেজ ধনিকদের মধ্যে একটা রেওয়াজ হয়ে দাড়িয়েছে শ্রমিকের ভূস্বর্গ সাবে বেলজিয়ামকে উল্লেখ করা কারণ সেখানে “শ্রমের স্বাধীন ভাষান্তরে। “মূলধনের স্বাধীনতা” ট্রেড ইউনিয়নের যথেচ্ছাচার বা কারখানা-আইনের দ্বারা সীমিত নয়, সেহেতু বেলজিয়ান শ্রমিকের “খ” সম্পর্কে দু-একটি কথা বলে নেব। নিশ্চয়ই প্রয়াত শ্রম ডাকপিটিয়, যিনি ছিলেন বেলজিয়ান কারাগার ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান সমূহের ইনপেক্টর জেনারেল ( ‘মহা-পরিদর্শক’) এবং বেলজিয়ান পরিসংখ্যানের কেন্দ্রীয় কমিশনের সদস্য, তার চেয়ে আর কেউ এই সুখের রহস্য সম্পর্কে অবহিত নন। তার বইখানাই নেওয়া যাক : “Budgets economiques des classes ouvriercs de la Belgique,” ব্রুকসেলেস, ১৮৫৫। এখানে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে আমরা পাই একটি সাধারণ বেলজিয়ান পরিবারের চিত্র, যার বাৎসরিক আয় ও ব্যয় তিনি হিসাব করেছেন যথার্থ তথ্যের ভিত্তিতে এবং তার পরে তার পুষ্টি গ্রহণের মানকে তুলনা করেছেন সৈনিক, নাবিক এবং বন্দীর পুষ্টি গ্রহণের সঙ্গে। পরিবার গঠিত হয় পিতা, মাতা ও চারটি সন্তানকে নিয়ে।” এই ছ-জনের মধ্যে চারজন গোটা বছর ধরেই প্রয়োজনপূর্ণ কাজে নিযুক্ত থাকতে পারে।” ধরে নেওয়া হচ্ছে, তাদের মধ্যে এমন একজনও নেই, যে অসুস্থ বা কর্মে অশক্ত; আরো ধরে নেওয়া হচ্ছে, গীর্জার আসনের জন্য নামমাত্র ব্যয় ছাড়া ধর্মীয়, নৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কারণে তাদের কোনো ব্যয় নাই, কিংবা সঞ্চয়ব্যাংকে বা কল্যাণ সংস্থায় কোনো কিছু দেয় নাই, কিংবা “বিলাস বা অমিতাচারজনিত কোনো ব্যয় নাই।” অবশ্য, পিতা ও পুত্র নিজেদের জন্য “তামাকু সেবনের অবকাশ রাখে এবং রবিবার-রবিবার ‘ক্যাবারে’-তে যায়, যার জন্য সপ্তাহে মোট ৮৬ সঁতিম ধরে রাখা হয়। বিভিন্ন শিল্পে শ্রমিকদের যে মজুরি দেওয়া হয় তার একটা সার্বিক সংকলন থেকে বেরিয়ে আসে যে দৈনিক মজুরির উচ্চতম গড় হল পুরুষদের জন্য ১ ফ্র। ৫৬ সঁতি, মহিলাদের জন্য ৮৯ সঁতিম, বালকদের ৫৬ সঁতিম এবং বালিকাদের ৫৫ সঁতিম। এই ভিত্তিতে হিসাব করলে পরিবারটির বার্ষিক অর্থসঙ্গতির পরিমাণ দাঁড়াবে সবচেয়ে বেশি হলে ১,০৬৮ ফ্রাঁ। …প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা হিসাবে নেওয়া এই পরিবারটিতে আমরা হিসাবে ধরেছি সমস্ত সম্ভাব্য অর্থাগম। কিন্তু মায়ের ক্ষেত্রে মজুরি আরোপ করতে গিয়ে আমরা উত্থাপন করি গৃহস্থালী পরিচালনার প্রশ্নটি, তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি কিভাবে পরিপোষিত হবে? শিশু-সন্তানদের কে দেখাশোনা করবে? কে খাবার প্রস্তুত করবে? ধোয়া-মোছা, সেলাই-ফোড়াইয়ের কাজ কে করবে? শ্রমিকেরা সবসময়েই এই উভয়-সংকটের মুখোমুখি হয়।”
এই অনুসারে উক্ত পরিবারটির বাৎসরিক বাজেট এই :
পিতা : ৩০০ কর্ম-দিবস ১.৫৬ ফ্রাঁ হারে ৪৬৮ ফ্রাঁ
মাতা : ,, ,, ৮৯ ,, ,, ২৬৭ ফ্রাঁ
পুত্র : ,, ,, ৫৬ ,, ,, ১৬৮ ফ্রাঁ
কন্যা : ,, ,, ৫৫ ,, ,, ১৬৫ ফ্রাঁ
———————————————
মোট ১,০৬৮ ফ্রাঁ
যদি ধরে নেওয়া যায় যে, শ্রমিকের খাদ্য নাবিক, সৈনিক বা বন্দীর খাদ্যের অনুরূপ, তা হলে পরিবারটির বাৎসরিক ব্যয়ে ঘাটতির পরিমাণ ঈবে যথাক্রমে নিম্নরূপ :
নাবিকের অনুরূপ খাদ্য-গ্রহণের ক্ষেত্রে : ১,৮২৮ ফ্রাঁ ঘাটতি : ৭৬০ ফ্রাঁ
সৈনিকের ,, ,, ,, ,, ১,৪৭৩ ,, ,, ৪০৫ ,,
বন্দীর ,, ,, ,, ,, ১,১১২ ,, ,, ৪৪ ,,
নাবিক বা সৈনিকের খাবারের গড়ে পৌছানো তো দূরের কথা, এমন কি বন্দীর গড়ে পৌছানোও খুব নগণ্য-সংখ্যক শ্রমিক-পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয়। (১৮৪৭ থেকে ১৮৪৯ পর্যন্ত বিভিন্ন কারাগারে প্রত্যেক বন্দীর খরচের) সাধারণ গড় সমস্ত কারাগারের ক্ষেত্রে গড়েছে ৬৩ সঁতিম। এই খরচের সঙ্গে শ্রমিকের দৈনিক খোরপোষের খরচের তুলনা করলে ১৩ সঁতিম-এর পার্থক্য দেখা যায়। বলা দরকার যে, বন্দীদের ক্ষেত্রে যেমন প্রশাসন ও প্রহরার খরচ হিসাবের মধ্যে ধরতে হয়, তেমন আবার তাদের বাসা-ভাড়া দিতে হয়না; তা ছাড়া, ক্যান্টিন থেকে তারা যে কেনাকাটা করে, তা তাদের খোরপোষের খরচের মধ্যে পড়েনা; তার উপরে, বহুসংখ্যক বন্দী একই সঙ্গে থাকে বলে এবং তাদের খাদ্য ও ভোগ-ব্যবহারের অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী পাইকারি হারে চুক্তি বা ক্রয়ের মারফতে সংগ্রহ করা হয় বলে, এই ব্যয়পত্রও অনেক কমে যায়।…এটা কেমন করে ঘটে যে, শ্রমিকদের একটা বৃহৎ অংশ, বলতে পারি, সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অন্যান্যদের তুলনায় অধিকতর মিত্যব্যয়ী ভাবে জীবন-যাপন করে? এটা তারা করে এমন সব কৌশল অবলম্বন করে, যার রহস্য কেবল শ্রমিকেরাই জানে; এটা তারা করে তাদের দৈনিক আহারের পরিমাণ কমিয়ে, গমের রুটির বদলে ‘ই’-এর রুটি খেয়ে, মাংস একেবারে বাদ দিয়ে বা প্রায় বাদ দিয়ে এবং মাখন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই কৌশল অবলম্বন করে; একটি বা দুটি রুমের মধ্যেই গোটা পরিবারটি গাদাগাদি করে থেকে, ছেলে-মেয়ের। পাশাপাশি একই খড়ের তোষকে নিদ্রাসুখ উপভোগ করে; জামা-কাপড়, পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতার ক্ষেত্রে সাশ্রয় ঘটিয়ে; রবিবারের আমোদ-প্রমোদ বিদায় দিয়ে; এক কথায় বলা যায়, সবচেয়ে যন্ত্রণাকর বঞ্চনার মধ্যে আত্মসমর্পন করে। একবার এই চরম সীমায় নেমে যাবার পরে, খাদ্যের দামে সামান্য বৃদ্ধি, কাজের ছেদ, অসুখ-বিসুখ শ্রমিকের অবস্থাকে অসহ্য করে তোলে এবং তাকে ধ্বংস করে দেয়। ধারের বোঝা জমতে থাকে, পরে ধারও পাওয়া যায় না, সবচেয়ে দরকারি জামা-কাপড় ও আসবাবও বন্ধক দিতে হয়; এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারটি আবেদন করে দুঃস্থ-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য।” (ডাকপিটিয়ক্স, ঐ, পৃঃ ১৫১, ১৫৭, ১৫৫)। বস্তুতঃ পক্ষে, ধনিকদের এই ভূস্বর্গে জীবনধারণের পক্ষে অত্যধিক আবশ্যক দ্রব্যসামগ্রীর দামে সামান্যতম পরিবর্তন ঘটলেই মৃত্যু ও অপরাধের সংখ্যাতেও পরিবর্তন ঘটে ! ( দ্রষ্টব্য : ‘মাশাপ্লিজ-এর ইশতাহার’ : “De Vlamingen Vooruit!” সেলস, ১৮৬০, পৃঃ ১৫, ১৬)। সমগ্র বেলজিয়ামে আছে ৯;৩০,০০০ পরিবার, যাদের মধ্যে সরকারি হিসাবমতে ৯০,০০০ বিত্তবান এবং ভোটার তালিকায় আছে ৪,৫০,০০০ ব্যক্তি; শহর ও গ্রামের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্য। ৩,৯০,০০০ যাদের মধ্যে বৃহত্তর অংশ ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছে ‘প্রোলেটারিয়েট’-এর স্তরে : সংখ্যা ১৯,৫০,০০০ ব্যক্তি। সর্বশেষে, ৪,৫০,০০০ শ্রমিক শ্রেণীর পরিবার= ২২,৫০,০০০ ব্যক্তি, যাদের মধ্যে যারা আদর্শস্বরূপ, তারা ভোগ করে ডাকপিটিয়ক্স বর্ণিত স্বর্গসুখ। ৪,৫০,০০০ শ্রমিক-পরিবারের মধ্যে, ২, ৩,০০০-এর বেশি রয়েছে দুঃস্থের তালিকায়।
