(ঘ) শ্ৰমিক-শ্রেণীর সর্বোত্তম মজুরি-প্রাপক অংশের উপরে সংকটের ফলাফলঃ
নিয়মিত কৃষি-শ্রমিকদের বিষয়ে আলোচনা শুরু করার আগে আমি আপনাদের অনুমতি চাই, কিভাবে শিল্পগত ঝড়ঝাপ্টা শ্রমিক শ্রেণীর এমনকি সর্বোচ্চ মজুরি প্রাপক অংশকে ( অভিজাত বর্গকে) পর্যন্ত আঘাত করে; আমি কেবল একটি দৃষ্টান্তই দেব। স্মরণীয় যে ১৮৫৭ সালটি নিয়ে এসেছিল অন্যতম বৃহত্তম সংকটকে, যা সূচনা করে শিল্প-চক্রের পর্যায়ক্রমের পরিসমাপ্তি। পরবর্তী সংকট-বিরতির কাল ছিল ১৮৬৬। নিয়মিত কারখানা-জেলাগুলিতে তুলা-দুর্ভিক্ষের দরুন ইতিমধ্যে হ্রাসপ্রাপ্ত যে-দুর্ভিক্ষ বহুল পরিমাণ মূলধনকে তার চিরাভ্যস্ত ক্ষেত্র থেকে তাকে ছুড়ে দিল টাকার বাজারের বিরাট বিরাট কেন্দ্রে—সেই সংকট ধারণ করল বিশেষ ভাবে একটি আর্থিক চরিত্র। এই সংকটের সংকেত পাওয়া গিয়েছিল একটি অতিকায় লণ্ডন ব্যাংকের ‘ফেল পড়া থেকে, যার পিছু পিছু ভেঙে পড়ল অসংখ্য প্রতারক কোম্পানি। এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জড়িত লণ্ডনের বিরাট বিরাট শিল্প-শাখার মধ্যে একটি হল লোহার জাহাজ নির্মাণ। তেজীর মরশুমে এই শিল্পশাখার দিকপালেরা যে কেবল সমস্ত মাত্রাছাড়া অতি-উৎপাদনে মেতে উঠেছিল, তাই নয়, দরকার-মত ক্রেডিট পাওয়া যাবে এই ফাটকাবাজির ভিত্তিতে তারা বিরাট বিরাট চুক্তিতেও লিপ্ত হয়েছিল। এখন, এক ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া শুরু হল; এমনকি এত দিন পরে আজও পর্যন্ত (১৮৬৭ সালের মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত। সেই প্রতিক্রিয়া লণ্ডনের এই শিল্পে ও অন্যান্য শিল্পে চলে আসছে।[৪১] শ্রমিকদের অবস্থা, কি ছিল, তা দেখাবার জন্য আমি মর্নিং স্টার পত্রিকার এক সাংবাদিকদের একটি তথ্যবহুল রিপোর্ট এখানে তুলে ধরছি, যিনি ১৮৬৬ সালের শেষে এবং ১৮৬৭ সালের শুরুতে দুর্দশার কেন্দ্রগুলি ঘুরে দেখেছিলেন, “পপুলার, মিলওয়াল, গ্রীনউইচ, ডেপ, টফোর্ড লাইমহাউজ, ক্যানিং টাউন প্রভৃতি ইস্ট-ইণ্ড অঞ্চলগুলিতে অন্তত পক্ষে ২০ হাজার কর্মী ও তাদের পরিবারবর্গ চরম দুঃস্থতার অবস্থায় ছিল এবং ৩০০০ কুশলী মেকানিক (আধ বছরেরও বেশি কালব্যাপী দুর্দশার পরে) দুঃস্থনিবাসের উঠোনে শান-বাঁধানো পাথর ভাঙছিল। ঐ দুঃস্থ নিবাসের ফটক পর্যন্ত যেতে আমার দারুণ কষ্ট হয়েছিল, কেননা এক ক্ষুধাত জনতা তাকে অবরোধ করে রেখেছিল। তারা তাদের টিকিটের জন্য প্রতীক্ষা করেছিল যদিও টিকিট বিতরণের সময় তখনো আসেনি। উঠোনটা ছিল একটা মন্ত চৌক, যার চার দিক ঘিরেছিল একটা খোল। শেড’ (ছাউনি, এবং মধ্যিখানটা চেকে রেখেছিল কয়েকটি বড় বড় বরফের স্তুপ। তা ছাড়া, মধ্যিখানে ভেড়ার খোঁয়াড়ের মত ডালপালার বেড়া দেওয়া ছোট ছোট জায়গাও ছিল; কিন্তু আমি যেদিন সেখানে দেখতে গিয়েছিলাম, সেগুলি বরফে এত টাকা ছিল যে কারো পক্ষে সেখানে বসা সম্ভব ছিল না। সেদিন যাই হোক, সেই খোল শেডে লোকজন শান বাধানো পাথর ভেঙে খোয়া তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। প্রত্যেকের বসার জন্য ছিল একটি করে বড় শানবাঁধানো পাথর; সে একটা বড় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে চলছিল কঠিন বরফে ঢাক। একটা গ্রনিট পাথরের উপরে, যতক্ষণ না সেট। টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল এবং ভাবুন? এই ভাবে তাকে ভরতে হবে পাঁচ পাঁচটি বুশেল; তা হলেই শেষ হবে তার এক রোজের কাজ এবং সে পাবে তার রোজের মজুরি-তিন পেন্স আর বরাদ্দ খাদ্য। উঠোনের অন্য প্রান্তে ছিল একটা ভগ্ন খায় কাঠের বাড়ি, এবং আমরা যখন তার দুয়োর খুললাম, আমরা দেখতে পেলাম সেটা একেবারে ভতি –লোকেরা গাদাগাদি করে বসে আছে পরস্পরের গায়ের ও প্রশ্বাসের গরমটুকুর জন্য। তারা হাতে ফেঁসে। তৈরি করছিল আর মুখে তর্ক করছিল একই পরিমাণ খাবার খেয়ে কে সবচেয়ে বেশি সময় কাজ করতে পারে—কার কতটা সহশক্তি সেটাই ছিল এখানে মর্যাদার বিষয়। এই দুঃস্থ-নিবাসটিতে : সাত হাজার পাচ্ছিল ত্রাণ-সাহায্য দেখা গেল, তাদের মধ্যে অনেকে ছয় থেকে আট মাস আগে পর্যন্ত উপার্জন করত কারিগরদের জন্য বরাদ্দ সবচেয়ে উচু মজুরি। এদের সংখ্যা হত দ্বিগুণেরও বেশি যদি, যারা সব সঞ্চয় খরচ হয়ে যাবার পরেও প্যারিশে আবেদন করতে অস্বীকার করছে, কেননা বন্ধক রাখার মত তখনো কিছু অবশিষ্ট ছিল, তাদেরও যদি হিসাবে গোনা হত। দুঃস্থ নিবাসটি ছেড়ে আমি পপলারের আশেপাশে রাস্তা ধরে এক-তলা ছোট ছোট বাড়িগুলির মধ্য দিয়ে একটু হাঁটলাম; এমন বাড়ি সেই অঞ্চলে প্রচুর। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বেকার-কমিটির একজন সদস্য। আমার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটল একজন লোহা-শ্রমিকের সঙ্গে, সাতাশ সপ্তাহ ধরে যে কর্মহীন। আমি তাকে আর তার পরিবারকে পেলাম পিছন দিককার একটি ঘরে। ঘরটি একেবারে আসবাব পত্ৰ-হীন ছিল না, একটা আগুন জ্বলছিল দিনটা ছিল দারুণ ঠাণ্ডা এবং আগুনটার দরকার ছিল যাতে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ের খালি পাগুলি হিমে অসাড় হয়ে না যায়। আগুনটার সামনে একটা কাঠের থালায় ছিল কিছু পরিমাণ ফেসে, প্যারিশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্যের বিনিময়ে যা ঐ বেকার শ্রমিকের স্ত্রী ও সন্তানেরা তৈরি করে দিচ্ছিল। লোকটি কাজ করছিল দুঃস্থ-নিবাসের পাথরের উঠোনে দৈনিক একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারের বরাদ্দ (ব্যাশন’) ও তিন পেন্স-এর জন্য। একটু বিষ হাসি হেসে সে আমাকে বলল, তখন সে বাসায় এসেছিল ভোজনের জন্য। ছিল খুবই ক্ষুধার্ত; আর খাবার ছিল দু-তিন টুকরো রুটি, একটু চর্বি এবং এক পেয়ালা দুধ-ছাড়া চা! . দ্বিতীয় যে-বাড়ির দরজায় আমরা টোকা দিলাম, সেটা খুলে দিলেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা। তিনি কোনো কথা না বলে আমাদের নিয়ে গেলেন পিছন দিককার একটি বৈঠকখানায়, সেখানে বসেছিল তার গোটা পরিবারে; নীরব এবং সকলেরই দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল নিবুনিবু, আগুনটার উপরে। লোকগুলিকে এবং তাদের ছোট্ট ঘরটিকে ঘিরে ছিল এমন এক শূন্যতা ও নৈরাশ্য, যা আমি দ্বিতীয় বারের মত দেখতে চাইনা। তার ছেলেদের দিকে আঙুল দেখিয়ে মহিলাটি বললেন, “গত এক-কুড়ি ছ-হপ্তা ধরে কোনো কিছুই ওরা করেনি। আমাদের সব টাকা ফুরিয়ে গেছে; সময় যখন ভাল ছিল তখন বাবা আর আমি মিলে যে-কুড়ি পাউণ্ড জমিয়ে ছিলাম, যখন কাজ থাকবেনা, তখন কিছু সাহায্য হবে—সবি ফুরিয়ে গেছে। একটা ব্যাংকের বই নিয়ে এসে তিক্ত কণ্ঠে বললেন, “দেখুন, এটা দেখুন !” যাতে আমরা দেখতে পারি, কবে কত টাকা জম! দিয়েছিলেন, কবে কত তুলেছিলেন; কি ভাবে শুরুতে পাঁচ শিলিং জমা দেবার পরে আসে আস্তে গড়ে উঠেছিল সেই ছোট পুঁজি; কি ভাবে তা আবার পাউণ্ড থেকে শিলি”-এ, শিলি’ থেকে সে শত্যে পরিণত হয়ে বইট। হয়ে পছে একটা ফাকা কাগজের মত মূল্যহীন। এই পরিবারটি প্যারিশ থেকে ত্রাণ-সাহায্য পাচ্ছিল এবং তাতে তাদের দিনে একবার করে সামান্য খাবারের সংস্থান হচ্ছিল। … তার পরে আমরা গেলাম এক লোহা-শ্রমিকের স্ত্রীর কাছে, যার স্বামী কাজ করতেন শিপইয়ার্ডে। আমরা তাকে দেখতে পেলাম খাদ্যের অভাবজনিত পীড় – গ্রস্ত অবস্থায়, জামা-কাপড় পড়ে শুয়ে আছেন একটা জাজিমের উপরে, যার উপ. বিছানো ছিল কেবল একটা গালিচা, কারণ বাকি সবই বন্ধকে চলে গিয়েছিল। দুটি বেচারা শিশুসন্তান তার শুশ্রুষা করছিল, যাদের নিজেদেরই তাদের মায়ের মতই শুশ্রষার দরকার। উনিশ সপ্তাহের চাপিয়ে-দেওয়া কর্মহীনতার দরুন তাদের এই দুর্গতি, আর যখন তাদের মা এই তিক্ত অতীতের কথা বলছিলেন, তখন এমন ভাবে হা-হুতাশ করছিলেন যেন ভবিষ্যতের উপরে তার সমস্ত বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গিয়েছে এমন ভবিষ্যৎ আর কখনো আসবেনা, যা এই দুর্গতির জন্য প্রায়শ্চিত্ত করবে … বাইরে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে এক যুবা-বয়স্ক ব্যক্তি আমাদের পিছে পিছে ছুটে এল এবং আমাদের অনুরোধ করল তার ঘরে পদার্পণ করতে, যদি আমরা তাদের জন্য কিছু করতে পারি। তার দেখাবার মত যা ছিল তা হল সব মিলিয়ে তার তরুণী বধু, দুটি সুন্দর শিশু, এক গোছ বন্ধকী টিকিট এবং একটি খালি ঘর।”
