কয়লা ও অন্যান্য খনির শ্রমিকেরা ব্রিটিশ সর্বহারা (প্রোলেটারিয়েট’ ) শ্রেণীর সবচেয়ে ভাল মজুরি-প্রাপ্ত বর্গগুলির অন্তর্গত। যে-দাম দিয়ে তারা তাদের মজুরি ক্রয় করে, তা পূর্ববর্তী এক পৃষ্ঠায় দেখানো হয়েছে। এখানে আমি কেবল তাদের বাসস্থানের অবস্থার উপর দিয়ে দ্রুত চোখ বুলিয়ে যাবে। প্রচলিত রীতি এই যে, খনির খনিজ-আহরক, তা সে মালিকই হোক বা ইজারাদারই হোক, তার কর্মীদের জন্য কতকগুলি কুটির তৈরি করে। তারা কুটির আর কয়লা পায় “মাগনা”-অর্থাৎ এগুলি তাদের মজুরিরই অংশ, যা দেওয়া হচ্ছে দ্রব্যসামগ্রীর আকারে। যারা এই কুটির পায়না, তাদের বাৎসরিক ও পাউণ্ড হিসাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। খনি অঞ্চলগুলি দ্রুতবেগে জনসংখ্যা আকর্ষণ করে, যার মধ্যে খোদ খনি-শ্রমিকেরা ছাড়াও থাকে, কারিগর দোকানদার প্রভৃতি, যারা তাদের ঘিরে সমবেত হয়। জমির খাজনা উচু; যেখানে জনবসতি ঘন, সেখানে তাই হয়। সুতরাং, মানব চেষ্টা করে খনি খাদের কাছাকাছি যথাসম্ভব স্বল্প-পরিসর জায়গার মধ্যে ঠিক তত সংখ্যক কুটির তৈরি করে নিতে, যা তাদের কর্মীদের সপরিবারে ঘেঁষাঘেঁষি বাস করার পক্ষে যথেষ্ট হবে। যদি ধারে-কাছে নোতুন খনি খোলা হয়, কিংবা পুরানো খনি আবার চালু করা হয়, তা হলে চাপ বেড়ে যায়। কুটিগুলির নির্মাণের ব্যাপারে কেবল একটি দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্ব পায়; তা হল এই যে, যে-ব্যয় কোনক্রমেই পরিহার করা যায় না, তা ছাড়া বাকি সমস্ত ব্যয় থেকে “আত্ম-সংবরণ। ডাঃ জুলিয়ান হান্টার বলেন, নাম্বারল্যাণ্ড ও ডারহাম-এর কয়লাক্ষেত্রগুলির সঙ্গে সংযুক্ত ‘পিট-ম্যান’-রা (খনি-খাদের মজুরেরা। এবং অন্যান্য শ্রমিকেরা যে বাসস্থান পায়, তা সম্ভবতঃ মোটের উপরে, ইংল্যাণ্ডের এই ধরনের বড় আকারের নমুনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে খারাপ এবং সবচেয়ে দুমূল্য—একমাত্র মনমাউথ-শায়ারের ‘প্যারিশগুলির অনুরূপ নমুনাগুলি বাদে। . এগুলি যে কত চরম খারাপ তা লক্ষ্য করা যায় একটি মাত্র কামরায় ভিড় করা মানুষের অতিরিক্ত সংখ্যায়, একটি ক্ষুদ্র ভূমিখণ্ডে বহুসংখ্যক বাড়ির ঘন-সন্নিবেশে, জলের অভাবে, পায়খানার অনুপস্থিতিতে এবং প্রায়শই একটি বাড়ির মাথায় আরেকটি বাড়ি চাপিয়ে দেওয়ার, অথবা ফ্ল্যাট’ হিসাবে ভাগ করে দেওয়ায় জমির ইজারাদার এমন ভাবে কাজ করে যেন গোটা কলোনি’টা নিছক একটা ছাউনি, কোনো বাসস্থান নয়। [৩৮]
ডাঃ স্টিভেন্স বলেন, “আমার প্রতি প্রদত্ত নির্দেশ অনুসারে আমি ডারহাম ইউনিয়নের অধিকাংশ বড় বড় ‘কোলিয়ারি’ গ্রামই পরিদর্শন করেছি।….. অতি সামান্য কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাকি সবগুলির ক্ষেত্রেই ঢালাও ভাবে একথা বললে সত্যই বলা হবে যে, অধিবাসীদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। সমস্ত কয়লা-খাদের শ্রমিকই খনির ইজারাদার বা মালিকের কাছে বাধা থাকে ( বাধা থাক” কথাটা “বন্ধন-দশা” কথাটার মত ভূমি-দাস প্রথার আমলের মতই প্রাচীন) বারো মাসের জন্য। যদি তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে কিংবা কোনো ভাবে তদারক কারীর বিরক্তি উৎপাদন করে, তা হলে তাদের নামের পাশে একটি স্মারক-চিহ্ন একে দেওয়া হয়, এবং বাৎসরিক বন্ধনমুক্তি”-র সময়ে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। আমার মনে হয়, এই ঘনবসতিপূর্ণ জেলাগুলিতে ‘ট্রাক-সিস্টেম’-এর। মজুরি-সংশ্লিষ্ট বাধ্য বাধকতার ব্যবস্থার যে অংশই, প্রচলিত রয়েছে, তার চেয়ে খারাপ আর কোনো অংশই হতে পারে না। নিজেকে ভাড়া দেবার শর্ত হিসাবে তাকে নিতে হবে নানাবিধ দুষ্ট সংক্রামক প্রভাবের দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি বাসা; সে নিজেকে এ থেকে বাঁচাতে পারে না। এবং যে তার মালিক ছাড়া আর কেউ তাকে এ ব্যাপারে বাঁচাতে পারে কিনা, তাতে সন্দেহ আছে ( যে-কোনো দিক দেখলে সে একজন ভূমি-দাস, এবং তার মালিক প্রথম বিচার করবে তার আয়-ব্যয়ের হিসাব, এবং তার ফল কি হবে, তা প্রায় নিশ্চিত। মালিক অনেক সময়ে খনি-শ্রমিককে জলও সরবরাহ করে এব, সে জল ভাল হোক, মন্দ হোক, তার জন্য তাকে দাম দিতে হয় কিংবা, বরং এল! উচিত, সেটা তার মজুরি থেকে কেটে রাখা হয়। [৩৯]
“জনমত”-এর, এমনকি হেথ, অফিসারদের বিরোধিতার মুখেও, মূলধন অংশতঃ বিপজ্জনক ও অংশতঃ চরিত্ৰনাশক এই শর্তাবলীকে, যেগুলি দিয়ে সে শ্রমিক এবং তার পরিবারকে বেঁধে রাখে, সেগুলিকে সমর্থন করতে কোনো অসুবিধাই বোধ করে না; সে যুক্তি দেয় যে, মুনাফার স্বার্থে এগুলি অপরিহার্য যখন কারখানায় বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন খনিতে আলো-হাওয়; চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন ইত্যাদি থেকে সে “আত্ম-সংবরণ” করে, তখন ঠিক এই যুণ্ডিই সে দেয়। খনি-শ্রমিকদের আবাসনের ক্ষেত্রেও সেই একই যু9ি। প্রিভি কাউন্সিলের মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ সাইমন তার সরকারি রিপোর্টে বলেন ‘বাসস্থানের শোচনীয় অবস্থার কৈফিয়ৎ হিসাবে বলা হয়, খনিগুলি সাধারণতঃ ইজারায় খাটে; ইজারাদারের স্বার্থের মেয়াদ ২ কোলিয়ারিতে সচরাচর ২১ বছর ততটা দীর্ঘস্থায়ী নয় যে সে তার শ্রমিকদের জন্য, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য লোকজন যাদের সে টেনে এনেছে তাদের জন্য সুষ্ঠ, আবাসনের বন্দোবস্ত করা লাভজনক বলে। মনে করতে পারে; এমনকি সে যদি এ ব্যাপারে উদার মনোভাব নিয়ে কিছু করতে চেষ্টাও করে, তা হলেও সেই চেষ্টা সাধারণতঃ ব্যাহত হবে জমির মালিকের প্রবণতার দ্বারা; মাটির তলাকার সম্পত্তিতে কর্ম-নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য মাটির উপরে রুচিসম্পন্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ গ্রাম গড়ে তোলার বিশেষ অধিকারলাভের জন্য জমির মালিক তার উপরে জমির খাজনা বাবদে চাপিয়ে দেবে অতি উচ্ছ-হারে একটি অতিরিক্ত চার্জ এবং সেই নিষেধাজ্ঞা-মূলক দাম (যদি তা সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না-ও হয়। অন্যান্য যারা এমন গ্রাম গড়ে তোলার ইচ্ছা পোষণ করতে পারে, তাদেরও দুর্নিবারণ করবে। উল্লিখিত কৈফিয়তের গুণাগুণ বিচার করা রিপোর্টের পরিধিভুক্ত নয়। এমন কি, এখানে এটাও বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই যে, যদি সুষ্ঠ, আবাসনের ব্যবস্থা করা যেত, তা হলে খবরটা শেষ পর্যন্ত কার উপরে, বর্তাত-জমির মালিকের উপরে, ইজারাদারের উপরে, না কি সমাজের উপরে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রিপোর্টগুলিতে ( ডাঃ হান্টার, ডাঃ স্টিভেন্স প্রভৃতির রিপোর্টগুলিতে) যে লজ্জাকর তথ্যসমূহ প্রতিপন্ন হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্যই প্রতিকার দাবি করা যায়। জমিদারিত্বের দাবি ইত্যাদিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরাট সামাজিক অহিত-সাধনের কাজে। খনির মালিক হিসাবে জমিদার একটি শিল্প শ্রমিকবাহিনীকে আমন্ত্রণ করে তার জমিদারিতে কাজ করতে এবং তার পরে ভূমি পৃষ্ঠের মালিক হিসাবে সে যে-শ্রমিকদের সমবেত করল তাদের পক্ষে বাসস্থান সংগ্রহ করার ব্যাপারটা অসম্ভব করে তুলল। এদিকে ইজারাদারের (ধনতান্ত্রিক শোষণ কারীর) কোনো আর্থিক উদ্দেশ্য থাকে না এই দেনা-পাওনার ভাগাভাগিতে বাধা দেবার; সে বেশ ভাল ভাবেই জানে যে, শেষোক্ত শর্তাবলী যদি অত্যন্ত চড়াও হয়, তা হলেও তার ফলাফল তার উপরে বর্তাবে, বর্তাবে তার শ্রমিকদের উপরে যাদের এমন কোন শিক্ষা নাই যাতে তারা তাদের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত অধিকারগুলির মূল্য সম্পর্কে সচেতন হতে পারে; জানে যে, সবচেয়ে জঘন্য বাস-ব্যবস্থা বা সবচেয়ে দূষিত পানীয় জল-কোনোটাই তাদের ধর্মঘট করার মত যথেষ্ট প্রণোদনা হিসাবে কাজ করবে না।” [৪০]
