মূলধন ও শ্রমের জোয়ার-ভাটার দরুন কোন শিল্প-শহরের আবাসন-পরিস্থিতি আজকে অসহনীয়, কালকে সহনীয় হতে পারে। কিংবা শহরের প্রশাসক কর্তৃপক্ষ এইসব সাংঘাতিক অব্যবস্থাগুলি অপসারণের জন্য তৎপরতা দেখাতে পারে। কালকেই। আবার পঙ্গপালের মত দলে দলে ধেয়ে আসবে ছিন্ন-বস্তু-পরিহিত আইরিশ বা জীর্ণ শীর্ণ-দেহ ইংরেজ কৃষি-শ্রমিকেরা। তাদের গুদামজাত করা হবে মাটির তলার কুঠরি বা মাথার উপরের খুপরিগুলিতে, কিংবা এতকাল যা ছিল শ্রমিকদের চলনসই বাসা বাড়ি, তাকেই রূপান্তরিত করা হয় সাময়িক অবস্থানের ভাড়াটে আস্তানায়, যে আস্তানাগুলির লোজনের তিরিশ বছরের যুদ্ধের ছাউনিগুলির সৈন্যদের চেয়েও তাড়াতাড়ি বদল হয়ে যায়। নমুনা: ব্রাডফোর্ড (ইয়র্কশায়ার)। সেখানকার পৌর ফিলিস্তিনটি কেবল ব্যস্ত থাকত শুধুমাত্র শহরের উন্নয়ন নিয়ে। তা ছাড়া, ব্রাডফোর্ডে ১৮৬১ সালেও ছিল ১,৭৫১টি এমন বাড়ি, যেগুলিতে কোনো বাসিন্দা ছিল না। কিন্তু এখন এল শিল্প-বাণিজ্যের সেই পুনর্জাগরণ যা নিয়ে সম্প্রতি এত মধুর ভাবে চেঁচামেচি করলেন নিগ্রো বন্ধু, বিনম্র উদারনীতিকে (লিবারল) মিঃ ফস্টার। শিল্প-বাণিজ্যের পুনর্জাগরণের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই এল চির-হ্রাস-বৃদ্ধিশীল সংরক্ষিত বাহিনী”-র বা “আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার ঢেউ থেকে উপচে পড়া জন-প্লাবন। একটি বীমা কোম্পানির এজেন্টের কাছ থেকে ডাঃ হান্টার পুঞ্জীভূত কুঠরি-আশ্রয়ের যে-তালিকা পেয়েছিলেন, সেগুলির অধিবাসী ছিল ভাল-আয়ের শ্রমিকেরা। তারা ঘোষণা করেছিল যে, যদি ভাল বাসস্থান পাওয়া যায়, তা হলে তারা বেশি ভাড়া দিতে রাজি আছে। ইতিমধ্যে তাদের অবনতি ঘটল, তারা একে একে সকলে অসুখে পড়ল এবং অন্য দিকে, আমাদের বিনম্র উদার নীতিক, সংসদ-সদস্য মিঃ ফস্টার অবাধ বাণিজ্যের আশীর্বাদ এবং উলের কারবারে লিও ব্রাডফোর্ডের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মুনাফার উপরে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন। ১৮৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের রিপোর্টে ব্রাডফোর্ডের গরিব আইন’-এর ডাক্তারদের মধ্যে একজন, ডাঃ বেল তার জরাক্রান্ত রোগীদের ভয়াবহ মৃত্যু-হারের কারণ হিসাবে নির্দেশ করেন বাসস্থানের অবস্থাকে। ১৫০০ কিউবিক ফুটের একটি ছোট ভূগর্ভস্থ কুঠরিতে বাস করে দশ জন ব্যক্তি। ভিমেন্ট স্ট্রিট, গ্রীন এয়ার প্লেস এবং লেইজ-এ রয়েছে ২২৩টি বাড়ি, যাদের অধিবাসী-সংখ্যা ১,৪৫৩, বিছানা ৪৩৫ এবং পায়খানা ৩৬টি। বিছানা বলতে আমি এখানে ধরছি নোরা ন্যাকড়ার যে-কোনো পুটলি বা সামান্য কিছু চোকলা, এমন এক-একটি বিছানাপিছু রয়েছে গড়ে ৩৩ জন করে লোক; কিছু সংখ্যক বিছানা-পিছু আছে ৫ ৬ জন; এবং আমি শুনলাম, কিছু লোকের বিছানা বলতে একেবারে কিছুই নেই। তারা শোয় তাদের মামুলি পোশাকে খালি তক্তার উপরে—যুবক-যুবতী, বিবাহিত-অবিবাহিত, সকলে একসঙ্গে। বলা বাহুল্য, এই কুঠরিগুলির বেশির ভাগই অন্ধকার, স্যাতসেতে, কদর্য, দুর্গন্ধপূর্ণ কূপ বিশেষ—মানুষের বাসের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযোগী; ঠিক এই কেন্দ্রগুলি থেকেই জন্ম নেয় রোগ ও মৃত্যু, যা ছড়িয়ে পড়ে তাদের মধ্যে যারা আছে উন্নততর অবস্থানে এবং এদেরকে এই ভাবে পচতে দিয়েছে আমাদের মধ্যে। [৩৩]
বাসস্থানের শোচনীয় দুরবস্থায় ব্রিস্টলের স্থান লণ্ডনের পরে তৃতীয়। “ব্রিস্টল যেখানে প্রত্যক্ষ হয় ইউরোপের সমৃদ্ধতম শহরের চরম দারিদ্র্য ও পারিবারিক দুর্দশার বিপুল বিস্তার।” [৩৪]
(গ) যাযাবর জনসংখ্যা
আমরা এখন এমন এক শ্রেণীর মানুষের দিকে মনোযোগ দেব যারা মূলতঃ ছিল কৃষিজীবী কিন্তু যাদের পেশা এখন বহুলাংশে শিল্পগত। তারা হচ্ছে মূলধনের লঘুভার পদাতিক-বাহিনী, মূলধনের প্রয়োজনমত যাদের নিক্ষেপ করা হয় কখনো এখানে, কখনো সেখানে। যখন তারা চলমান নয়, তখন তারা “তাবু খাটায়”। যাযাবর এমকে নিয়োগ করা হয় বাড়ি নির্মাণ, জল-নিস্কাশন, ইট-তৈরি, চুন-পোড়ানো, রেলপথ বানানো ইত্যাদি নানা কাজে। মহামারীর একটি চলন্ত বাহিনী, এই যাযাবর শ্রম যেখানেই বয়ে নিয়ে যায় বসন্ত, টাইফাস, কলেরা, সংক্রামক অর ইত্যাদি।[৩৫] রেলপথের মত যে-সব উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ মূলধন নিয়োগের প্রয়োজন হয়, সেখানে ঠিকাদার নিজেই তার বাহিনীর জন্য কাঠের কুঁড়েঘর ইত্যাদির ব্যবস্থা করে এবং এইভাবে স্থানীর পর্ষদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গজিয়ে ওঠে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যবস্থাবলীর কোনো সংস্থান ছাড়াই গ্রাম আর গ্রাম, যেগুলি ঠিকাদারের পক্ষে হয় খুবই মুনাফাজনক, কারণ সে শ্রমিক শোষণ করতে থাকে দুভাবে প্রথমত, শিল্পের সৈনিক হিসাবে এবং, দ্বিতীয়ত, ভাড়াটে হিসাবে। কাঠের কুঁড়েঘর গুলির যেটায় যতসংখ্যক খুপরি, ১, ২, বা ৩, সেটার ভাড়াও তেমনি সাপ্তাহিক ১, ৩ বা ৪ শিলিং।[৩৬] একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। ১৮৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভাঃ সাইমন রিপোর্ট করেন, সেভেনোক নামক ‘প্যারিশ’-এর (যাজক পল্লী’র আবর্জনা অপসারণ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রসচিব স্যার জর্জ গ্রের কাছে নিম্নলিখিত নিন্দাপত্র পাঠিয়েছেন, “প্রায় বারো মাস আগে পর্যন্ত এই প্যারিশে বসন্ত বগের কথা খুবই কদাচিৎ শোনা যেত। তার কিছুকাল আগে লিউইস থেকে টানব্রিজ পর্যন্ত একটি রেলপথের কাজকর্ম এখানে আরম্ভ হয়, এবং প্রধান কর্মশালাটি এই শহরের একেবারে গায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছাড়াও, এখানে স্থাপন করা হয় এই গোটা কর্মকাণ্ডটির মাল-গুদাম, যার ফলে স্বভাবতই এক বিরাট সংখ্যক মানুষ এখানে কর্মনিযুক্ত হয়। যেহেতু কটেজগুলিতে সকলের জন্য আবাসনের সংস্থান করা যায়নি, সেইহেতু কর্মস্থলের লাইন বরাবর জায়গায় মিঃ জে এই কাজের জন্য কুঁড়েঘর তৈরি করে নেন। এই কুঁড়েগুলিতে না আছে কোনো আলো-হাওয়া চলাচলের ব্যবস্থা, না আছে কোনো নর্দমা; তা ছাড়া, এগুলি ছিল স্বভাবতই অতিরিক্ত জনাকীর্ণ, কেননা প্রত্যেক ভোগদখলকারীকে আবার ঠাই দিতে হয় আবাসিকদের, তা তার নিজের পরিবারে সদস্যসংখ্যা যাই হোক না কেন;-যদিও এক একটি কুঁড়েঘরে আছে মাত্র দুখানা করে কামরা। আমরা যে-মেডিক্যাল রিপোর্ট পেয়েছি, তাতে দেখা যায় যে, এর পরিণামে রাতের বেলায় জানালার ঠিক নিচেই জমে থাকা নোংরা জল ও পায়খানা থেকে যে-দুর্গন্ধ বের হয়, তা এড়াতে গিয়ে এই গরিব বেচারাদের সহ্য করতে হয় শ্বাসরুদ্ধ অবস্থার সমস্ত বিভীষিকা। এই কুঁড়েঘরগুলি দেখার উপলক্ষ্য ঘটেছিল এমন একজন ডাক্তার ভদ্রলোক এই সম্পর্কে বিস্তারিত নালিশ জানিয়েছিলেন। তিনি কঠোরতম ভাষায় তাদের থাকার অবস্থার কথা বিবৃত করেছিলেন এবং এই আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন যে, যদি স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তা হলে অত্যন্ত গুরুতর কিছু পরিণতি ঘটাতে পারে। এক বছর আগে মিঃ জে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কুটির আলাদা করে রাখবেন, যে-কুটিরে তার অধীনস্থ লোকদের মধ্যে যারা সংক্রামক রোগাক্রান্ত, তাদের সকলকে অবিলম্বে স্থানান্তরিত করা হবে গত ২৩শে জুলাই তিনি ঐ একই প্রতিজ্ঞার পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু যদিও তার পর থেকে তার কুঁড়েগুলিতে বেশ কয়েকটি বসন্ত রোগের ঘটনা ঘটেছে এবং দুজন মারা গিয়েছে, তবু তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে তিনি কোন কিছুই করেননি। সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে সার্জন ( শল্যচিকিৎসক) মিঃ কেলসন আমার কাছে রিপোর্ট করেন, ঐ কুঁড়েগুলিতে আরো কয়েক জন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং তিনি তাদের অবস্থা চরম কলংকজনক বলে বর্ণনা করেন। আপনার (স্বরাষ্ট্রসচিবের) জ্ঞাতার্থে আমি আরো জুড়ে দিতে চাই যে, এই প্যারিশের অধিবাসীদের মধ্যে যারা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, তাদের জন্য রোগী-নিবাস’ বলে যে বাড়িটি আলাদা করা আছে, সেটি গত কয়েক মাস ধরে এই জাতীয় রোগীদের দ্বারা ক্রমাগত ভর্তিই থাকছে, এবং এখনো ভর্তিই আছে; একটি পরিবারে পাঁচ পাচটি শিশুই বসন্ত ও জ্বরে মারা গিয়েছে। এই বছরে ১লা এপ্রিল থেকে ১লা সেপ্টেম্বর—এই পাঁচ মাসে এই প্যারিশে বসন্ত রোগে মারা গিয়েছে অন্তত দশ জন, যাদের মধ্যে চারজন ছিল ঐ কুঁড়েগুলির বাসিন্দা; কত লোক ঐ রোগের কবলে পড়েছে, তার সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব নয়, কেননা সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলি তা যথাসাধ্য গোপন রাখতে চেষ্টা করে; তবে অনেক মানুষই যে কবলিত হয়েছে, তা জানা গিয়েছে। [৩৭]
