ভাড়া দেওয়া হয় সাপ্তাহিক ভিত্তিতে, এবং এই ভদ্রলোকেরা কোনো ঝুকিই নেন না। মহানগরে রেলপথ নির্মাণের ফলে, “ইস্ট-লণ্ডনে সম্প্রতি একটা দৃশ্য দেখা গিয়েছে —দুঃস্থ-নিবাস ছাড়া আর কোনো আশ্রয় না থাকায়, তাদের সামান্য যা কিছু পার্থিব সম্পত্তি আছে, তাই পিঠে নিয়ে কিছু সংখ্যক পরিবার শনিবার রাতে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।[২৭] দুঃস্থ-নিবাসগুলি ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত ভিড়ে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। এবং পার্লামেন্ট যে-“উন্নয়ন পরিকল্পনা মঞ্জুর করেছে, তার কাজ সবেমাত্র শুরু হয়েছে। তাদের পুরনো ঘর-বাড়িগুলি ভেঙে দেবার ফলে শ্রমিকের বিতাড়িত হলেও তারা তাদের যাজক-পল্লী ছেড়ে যায় না, বড় জোর, তারা তার সীমানায় বসতি স্থাপন করে—যত কাছে পারে, তত কাছে। “অবশ্য, তারা তাদের কারখানার যথাসম্ভব সন্নিকটে থাকতে চেষ্টা করে। অধিবাসীরা একই যাজক-পল্লীর কিংবা পরবর্তী যাজক-পল্লীর বাইরে যায় না তাদের দু-ঘরের ভাড়া-বাসাগুলিকে একটি করে ঘরে ভাগ করে নিতে হলেও, এমনকি সেগুলিতে গাদাগাদি করে থাকতে হলেও। …….এমনকি বেশি ভাড়াতেও, স্থানচ্যুত মানুষেরা তাদের ছেড়ে-আসা সামান্য আয়টির মত ভাল আশ্রয় পাবে না।…….স্ট্রা-এর অর্ধেক শ্রমিক দু-মাইল হেঁটে তাদের কাজে যায়।[২৮] এই যে স্ট্রাণ্ড, একটি প্রধান রাজপথ, যা আগন্তুকদের কাছে তুলে ধরে লণ্ডনের ঐশ্বর্যের এক মনোমুগ্ধকর চিত্র, তাই আবার সেই শহরের মানুষদের গাদাগাদি করে থাকার একটা নমুনা হিসাবে কাজ করতে পারে। হেথ, অফিসারের হিসাবে দেখা যায়, যাজক-পল্লীগুলির একটিতে একর পিছু ৫৮১ জন লোক বাস করে, যদিও টেমস নদের প্রস্থের অর্ধেকটা হিসাবে ধরা হয়েছে। এটা আপনা-আপনিই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত প্রত্যেকটি ব্যবস্থা, বাসের অযোগ্য বাড়িগুলিকে ভেঙে দিয়ে, কেবল শ্রমিকদের এক কোয়ার্টার থেকে তাড়িয়ে নিয়ে আরেক কোয়ার্টারে আরো গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য করে, যেমন লণ্ডনে হয়েছে। ডাঃ হান্টার বলেন, “হয়, এই সমস্ত কার্যক্রম একটা অসম্ভব ব্যাপার হিসাবে বন্ধ হয়ে যাবে, আর, নয়তে, সর্বজনিক অনুকম্পাকে এমন এক কর্তব্য সাধনে—যাকে ‘জাতীয়’ বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না-তেমন এক সাধনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, যাতে, যারা তাদের মূলধন নেই বলে নিজেদের মাথার উপরে আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে পারেনা, কিন্তু দফায় দফায় টাকা দিয়ে তার দাম শোধ করে দিতে পারে, তাদের জন্য আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করা হয়।”[২৯] ধনতান্ত্রিক ন্যায়-বিচারকে প্রশংসা করুন। রেলপথ, নোতুন নোতুন রাস্তা নির্মাণ, ইত্যাদি “উন্নয়ন”-কার্যের দ্বারা যখন জমির মালিক বাড়ির মালিক বা ব্যবসায়ী উৎখাত হয়, তখন সে কেবল পুরো ক্ষতিপূরণই পায়না। এই বাধ্যতামূলক ভোগ-সংবরণের দরুন সে মানবিক ও ঐশ্বরিক বিধানের বলে পাবে সেই ক্ষতিপূরণের উপরেও একটা অতিকায় মুনাফা। অন্য দিকে, শ্রমিক তার স্ত্রী ও সন্তান ও জিনিসপত্র সহ নিক্ষিপ্ত হয় রায় আর যদি সে বিপুল সংখ্যায় ভিড় করে শহরের সেই কোয়ার্টারগুলির দিকে, যেখানে কর্মচারীরা শালীনতা বজায় রাখার জন্য তৎপর থাকে, তা হলে স্বাস্থ্যবিধি সংরক্ষণের নামে অভিযুক্ত করা হয় !
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে লণ্ডন ছাড়া ইংল্যাণ্ডে আর এমন একটিও শহর ছিল না, যার জনসংখ্যা ১০,০০০-এর বেশি; কেবল পাঁচটি শহর ছিল, যাদের জনসংখ্যা ছিল ৫০,০০০-এর বেশি। এখন ৫০, ০০-এর বেশি জনসংখ্যার বাস, এমন শহরের সংখ্যা ২৮টি। এই পরিবর্তনের ফল কেবল এই নয় যে শহরবাসী লোকের শ্রেণী বিপুল ভাবে বৃদ্ধি পেল, উপরন্তু পুরনো ঘন-সংবদ্ধ ছোট ঘোট শহরগুলি পরিণত হল এমন সব কেন্দ্রে, যাদের সব দিকে ঘিরে গড়ে উঠল ইমারত, কোনো দিক খোলা রইল না হাওয়ার জন্য, এবং যেগুলি ধনীদের কাছে আর আরামপ্রদ না থাকায় তারা সেগুলিকে পরিত্যাগ করে সরে গেল মনোরম উপকণ্ঠে। এই সব ধনী ব্যক্তির পরে যারা এল, তারা বড় বড় বাড়িগুলিতে দখল পেল কামরা-পিছু একটি করে পরিবার হিসাবে […এবং দুজন বা তিনজন করে আবাসিকের স্থান-সংস্থান করল…]; এবং এইভাবে সৃষ্টি হল এমন একটি জনসমষ্টি, যাদের জন্য ঐ বাড়িগুলি তৈরিও হয়নি এবং যেগুলি তাদের জন্য আদৌ উপযুক্তও নয়, আর যেগুলিকে ঘিরে গড়ে উঠল এমন একটি পরিবেশ, বয়স্কদের পক্ষে যা চরিত্রহানিকর এবং শিশুদের পক্ষে যা সর্বনাশা।[৩০] মূলধন যত দ্রুত গতিতে একটি শিল্প-শহরে বা বানিজ্য শহরে সঞ্চয়ীকৃত হয়, শোষণ যোগ্য মানবিক সামগ্রীর স্রোত তত দ্রুত গতিতে প্রবাহিত হয়, শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক প্রস্তুত আস্তানাগুলি তত শোচনীয় হয়।
কয়লা ও লোহার ক্রমবর্ধমান উৎপাদনশীলতা-সমন্বিত একটি জিলার কেন্দ্রস্বরূপ নিউক্যাস-অনটাইন-এর স্থান আবাসন-ব্যবস্থার নারকীয়তার বিচারে লণ্ডনের ঠিক পরেই। একটি করে কামরায় বাস করে এমন লোকের সংখ্যা সেখানে ৩৪,০০০-এর কম নয়। সমাজের পক্ষে সাংঘাতিক বিপজ্জনক বলে গণ্য হওয়া সম্প্রতি নিউক্যাল ও গেটসহেড-এ বিপুল সংখ্যায় বাড়ি-ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, ১৮৬৫ সালে শহরটি এমন জনাকীর্ণ ছিল যা আর কখনো হয়নি। নিউক্যাসল্ ফিভার হসপিটাল’-এর ডাঃ এম্বেলটন বলেন, “এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে ‘টাইফাস’ অরের অব্যাহত প্রকোপ ও প্রসারের বিরাট কারণটি হল মানুষের অত্যধিক ভিড় এবং বাসস্থানের অপরিচ্ছন্নতা। যে-সব কামরায় শ্রমিকের বাস করে, অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলি রুদ্ধ ও ক্ষতিকর চত্বরে বা অঙ্গনে অবস্থিত এবং আলো, হাওয়া পরিসর ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে অপ্রতুলতা ও অস্বাস্থ্যকরতার আদর্শ এবং যে-কোনো সভ্য সমাজের পক্ষে কলংকস্বরূপ; লোকগুলি সম্পর্কে বলা যায়, দিনের শিফট-এর পিছে আসে রাতের শিফট আর রাতের শিফটের পিছে দিনের শিফট-এই ভাবে অবিচ্ছিন্ন ভাবে চলে বেশ কিছু কাল, বিছানাগুলো ঠাণ্ডা হবার পর্যন্ত সময় পায়না; গোটা বাড়ির জলের ব্যবস্থা খুবই খারাপ, পায়খানার ব্যবস্থা আরো খারাপ-ননাংরা, আলো বাতাসহীন, ন্যক্কারজনক।[৩১] এই ধরনের আস্তানার সপ্তাহ-পিছু ভাড়া হল ৮ পেন্স থেকে ৩ শিলিং পর্যন্ত। ডাঃ হান্টার বলেন, “নিউক্যাস-অন-টাইন শহরটিতে রয়েছে আমাদেরই দেশবাসী একটি চমৎকার উপজাতি-বাসা ও রাস্তার মত বাহ ঘটনাগুলি যাদের ডুবিয়ে রেখেছে প্রায় বর্বরতার অধঃপাতিত অবস্থায়।” [৩২]
