এক দিকে, শ্রমিক শ্রেণীর সর্বাপেক্ষা পরিশ্রমী স্তরগুলির ক্ষুধার যন্ত্রণা এবং অন্য দিকে, বিত্তবানদের অপরিমেয় পরিভোগ, শালীন ও অশালীন পরিভোগ, যার ভিত্তি হচ্ছে ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়ন—এই দুযের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান, তা নিজেকে প্রকাশ করে কেবল তখনি, যখন অর্থনৈতিক নিয়মগুলি আমাদের জানা হয়ে যায়। “গরিবদের আবাসন”-এর ব্যাপারটা অন্য রকম। প্রত্যেক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক দেখতে পান যে, উৎপাদনের উপায়সমূহ যত বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, তদনুযায়ী ততই একটি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে শ্রমিকেরা পীকৃত হয়; সুতরাং, ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়ন যত বেশি দ্রুত হয়, শ্রমিকদের বাসস্থানগুলিও হয় তত বেশি শোচনীয়। শহর-“উন্নয়ন”-এর সঙ্গে সঙ্গে চলে বাজে ভাবে তৈরি করা ‘কোয়াটার্স’-গুলি ভেঙে দিয়ে ব্যাংক, গুদাম ইত্যাদির জন্য প্রাসাদ নির্মাণ, ব্যবসায়িক পণ্য-পরিবহন, বিলাসবহুল শকট চলাচল এবং ট্রামগাড়ি প্রবর্তনের জন্য রাস্তাঘাটের প্রশস্তকরণ ইত্যাদি আর তার ফলে শ্রমিকেরা বিতাড়িত হয় আরো খারাপ, আরো ঘিঞ্জি সব আস্তানায়। অপর পক্ষে, প্রত্যেকেই এটা জানেন যে, বাসস্থানের দুষ্প্রাপ্যতা এবং তার উৎকৃষ্টতা বিপরীত অনুপাতে চলে এবং বাড়ি ঘরের ফটকাবাজরা এই দুঃখের খনিগুলিকে এমনকি পটোসির খনিগুলির চেয়েও আরো বেশি মুনাফায় বা আরো কম খরচে শোষণ করে। ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের এবং, স্বভাবতই, সাধারণ ভাবে ধনতান্ত্রিক সম্পত্তি সম্পর্ক-সমূহের স্ব-বিরোধী চরিত্র[২১] এক্ষেত্রে এত প্রকট যে, এমনকি এই বিষয়-সম্বন্ধে ইংল্যাণ্ডের সরকারি রিপোর্টগুলি পর্যন্ত নিজেদের রীতি নীতি ভেঙ্গে সম্পত্তি ও তার অধিকার”-এর উপরে আক্রমণে প্রবৃত্ত হয়েছে। শিল্পের বিকাশ-লাভের সঙ্গে সঙ্গে, মূলধনের সঞ্চয়নের সঙ্গে সঙ্গে, শহর-“উন্নয়নের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে, এই পাপটি এমন বিস্তার লাভ করল যে, সংক্রামক ব্যাধি-যা “মাননীয়তা কেও মান্য করে না তার নিছক ভয়ই ১৮৪৭ থেকে ১৮৬৪ সালের মধ্যে সংসদীয় স্বাস্থ্য-সংরক্ষণ সম্পর্কে অন্তত দশ দশটি আইনের জন্ম দিল; এবং লিভারপুল, গ্লাসগো-র মত কয়েকটি শহরের ভীত-সন্ত্রস্ত বুর্জোয়ারা তাদের পৌর সংস্থানগুলির মাধ্যমে বিবিধ আয়াসসাধ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করল। যাই হোক, ডাঃ সাইমন তার ১৮৬৫ সালের রিপোর্টে লিখলেন, “সাধারণ ভাবে বলা যায়, এই পাপ এখন ইংল্যাণ্ডে অনিয়ন্ত্রিত।” প্রিভি কাউন্সিলের নির্দেশ ১৮৬৪ সালে কৃষি-শ্রমিকদের আবাসনের অবস্থা সম্পর্কে এক তদন্ত হয়, ১৮৬৫ সালে হয় শহরের দরিদ্রতর শ্রেণীগুলির আবাসনের অবস্থা সম্পর্কে। ডাঃ জুলিয়ান হান্টারের প্রশংসনীয় কাজের ফলাফল জন-স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সপ্তম (১৮৬৫) এবং অষ্টম (১৮৬৬) রিপোর্ট দুটিতে পাওয়া যায়। কৃষি-শ্রমিকদের বিষয়ে আমি পরে আসব। শহরের বাসস্থানগুলি সম্পর্কে আমি ডাঃ সাইমনের একটি সাধারণ মন্তব্যকে ভূমিকা হিসাবে উদ্ধত করব। তিনি বলেন, “যদিও আমার সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি একান্ত ভাবেই দেহগত, তবু সাধারণ মানবিকতা দাবি করে যে এর অন্য দিকটিও উপেক্ষা করা উচিত হবে না। বেশি ভিড় করে থাকার প্রায় অবধারিত ফলই হল সমস্ত শ্লীলতার এমন অবলুপ্তি, দেহ ও দৈহিক কাজকর্মের এমন উচ্ছঙ্খলা, জৈব ও যৌন নগ্নতার এমন উলঙ্গ প্রকাশ যে তাকে মানবিক না বলে পাশবিক বলাই উচিত। ঐসব প্রভাবের অধীনে অবস্থান এমনি একটা অধঃপতন, যা যাদের উপরে সেইগুলি কাজ করকে থাকে, তাদের আরো আবো নীচে নামিয়ে দেয়। এর অভিশাপের ছায়ায় যে-শিশুরা জন্মায়, তাদের কাছে এটা হয় কলংকিত জীবন-যাপনে দীক্ষাস্বরূপ। এবং এই পরিস্থিতিতে যারা বাস করে, তারা কোনো কালে অন্য কোনো দিকে সভ্যতার পরিবেশের জন্য যার মর্মবস্তুই হল দৈহিক ও নৈতিক পরিচ্ছন্নতার জন্য আকাঙ্খ পোষণ করবে, এমন একটা আশা সর্বতোভাবেই দুরাশা।” [২২]
মানুষের পক্ষে একেবারে অনুপযুক্ত ঠাসাঠাসি বাসা-বসতির ব্যাপারে লণ্ডনের স্থান সবার আগে। ডাঃ হান্টার বলেন, “দুটি ব্যাপারে তার উপলব্ধি পরিষ্কার; প্রথমত, লণ্ডনে এমন ২০টি বিরাট কলোনি’ (‘বসতি’) আছে, যেগুলির প্রত্যেকটিতে থাকে ১০,০০০ করে মানুষ এবং যেগুলির শোচনীয় অবস্থা ইংল্যাণ্ডের অন্য যে-কোনো অঞ্চলে তাঁর দেখা দুরবস্থাকে ছাড়িয়ে যায় এবং যে-অবস্থার জন্য সম্পূর্ণ ভাবেই দায়ী এখানকার নিকৃষ্ট আবাসন-ব্যবস্থা; এবং দ্বিতীয়তঃ, এই কলোনি’-গুলির বাড়ি-ঘরগুলির ভিড়ে ভরা ও ভাঙ্গাচোর। অবস্থা ২০ বছর আগেকার অবস্থা থেকেও ঢের খারাপ।[২৩] একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, লণ্ডনের কোন কোন অংশে জীবন নারকীয়। [২৪]
অধিকন্তু, যে-অনুপাতে “উন্নয়ন” এবং তার সঙ্গে পুরনো রাস্তা ও বাড়ি-ভাঙ্গার কাজ অগ্রসর হয়, মহানগরে কল-কারখানা ও জন-প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং জমির খাজনা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়িভাড়াও বৃদ্ধি পায়, সেই অনুপাতে ছোট দোকানদার ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন অংশ এই জঘন্য অভিশাপের অধীনে আনীত হয়। ভাড়া এত বেড়ে গিয়েছে যে, খুবই নগণ্য সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ একটি ঘরের বেশি ভাড়া বহন করতে পারে।[২৫] লণ্ডনে এমন কোনো বাড়ি নেই, যা এক গাদা দালালের দ্বারা ভারাক্রান্ত নয়। যেহেতু লণ্ডনে জমির দাম তার বার্ষিক আয়ের তুলনায় সব সময়েই অনেক বেশি, সেই হেতু প্রত্যেক ক্রেতাই আবার জুরি-নির্দিষ্ট দামে (জুরির সদস্যদের দ্বারা নির্ধারিত স্বত্বান্তর-মূল্য অনুসারে ) তা থেকে অব্যাহতি পাবার, কিংবা কোন বিরাট প্রতিষ্ঠানের নিকটবর্তী অবস্থানের দরুন অস্বাভাবিক ভাবে বর্ধিত মূল্য হস্তগত করার, ফটকাবাজিতে লিপ্ত থাকে। এর ফলে সেখানে সব সময়েই লীজ-এর অন্তপর্ব” ক্রয়ের ব্যাপারে নিয়মিত একটা ব্যবসা চলে। “এই ব্যবসায়ে লিপ্ত ভদ্রলোকেরা, তাদের কাছ থেকে ন্যায্যতঃ যা আশা করা যায়, তাই করেন—ভাড়াটেদের যখন হাতে পান, তখন তাদের কাছ থেকে যত বেশি পারেন, আদায় করে নেন এবং তাদের উত্তরাগতদের জন্য যত কম পারেন, রেখে যান।”[২৬]
