বিশুদ্ধ শহরবাসী শ্রমজীবী জনগণের উল্লিখিত বর্গগুলির পুষ্টিকর খাদ্য-গ্রহণের পরিস্থিতি নিম্ন-প্রদত্ত সারণী থেকে পাওয়া যায়; ডাঃ স্মিথ যে-ন্যনতম পুষ্টিকর খাদ্য পরিমাণের কথা বলেছেন, এবং সর্বাধিক দুর্দশার সময়ে তুলা-কল-কর্মীদের যে খাদ্য ভাতা দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে এটা তুলনীয়।
ছবি। পেজ ৩৯০
সমীক্ষাভুক্ত শিল্প-শ্রমিক বর্গগুলির অর্ধেক বা ৬৫/১২৫ ভাগের ক্ষেত্রে কোন ‘বিয়ার ছিল না, ২৮ শতাংশের ক্ষেত্রে ছিল না কোনো দুধ। পরিবারগুলিতে তরলজাতীয় পুষ্টিকর পদার্থের সাপ্তাহিক গড় সূচী-কর্মে নিযুক্ত মহিলাদের ক্ষেত্রে ৭ আউন্স থেকে মোজা তৈরির কাজে নিযুক্ত কর্মীদের ২৪.৭৫ আউন্স পর্যন্ত কম-বেশি হয়। যার দুধ পেত না, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই হল লণ্ডনের সূচী-কর্মী মহিলারা। রুটির পরিমাণ কম-বেশি হয় সূচী-কর্মী মহিলাদের বেলায় ৭.৭৫ পাউণ্ড থেকে জুতো-প্রস্তুতকারীদের বেলায় ১১.৫ পাউণ্ড পর্যন্ত, বয়স্ক লোকদের মাথাপিছু সাপ্তাহিক গড় দাড়ায় ৯.৯ পাউণ্ড। চিনি ( ঝোলা গুড়, ইত্যাদি) দস্তানা-প্রস্তুতকারকদের জন্য সপ্তাহে ৪ আউন্স থেকে মোজা প্রস্তুতকারকদের জন্যে ১১ আউন্স পর্যন্ত কম-বেশি হয়; সকল বর্গের বয়স্ক শ্রমিকদের জন্য মোট সাপ্তাহিক গড় মাথাপিছু পরিমাণ ৮ আউন্স। বয়স্কদের জন্য মাখনের (চর্বি ইত্যাদির মাথাপিছু সাপ্তাহিক গড় ৫ আউন্স। মাংসের (শূকর ইত্যাদির ) সাপ্তাহিক গড়ে পার্থক্য হত রেশম-বয়নকারীদের ক্ষেত্রে ৭.২৫ আউন্স থেকে দস্তানা-প্রস্তুতকারকদের জন্য ১৮.২৫ আউন্স; বিভিন্ন বর্গের জন্য মোট গড় ১৩.৬ আউন্স। বয়স্ক লোক-পিছু খাদ্যের জন্য সাপ্তাহিক ব্যয়ের গড় পরিমাণ এই রকম : রেশম-বয়নকারী ২ শি. ২২ পে, সূচী-কর্মী মহিলা শি. ৭ পে, দস্তানা-প্রস্তুতকারক ২ শি. ৯.৫ পে, জুতা-প্রস্তুতকারক ২ শি. ৭.৭৫ পে, মোজা-প্রস্তুতকারক ২ শি. ৬.২৫ পে। ম্যাকৃফিডের রেশম-বয়নকারীদের ক্ষেত্রে এই গড় মাত্র ১ শি ৮.৫ পে। সবচেয়ে খারাপ দশা ছিল সূচী-কর্মী মহিলা, রেশম-বয়নকারী এবং দস্তানা-প্রস্তুতকারীদের।[১৯] এই সব তথ্য প্রসঙ্গে ভাঃ সাইমন তার সাধারণ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদন’-এ লিখেছেন, “ব্যাধির কারণ বা তার বৃদ্ধির কারণ যে ত্রুটিযুক্ত খাদ্য, তা যে-কেউ যিনি গরিব আইনের তালিকাভুক্ত ডাক্তারদের চিকিৎসা সম্পর্কে কিংবা হাসপাতালগুলির অন্দরেরও বাইরের রোগীদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত, তিনিই তা সমর্থন করবেন। ….. তবু এই প্রসঙ্গে, আমার মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পটভূমিকা সংযোজন করতে হবে। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, খাদ্য সম্পর্কে কৃচ্ছতা মানুষ বিষম ক্ষোভের সঙ্গে সহ করে, এবং সাধারণ নিয়ম এই যে, খাদ্য সম্পর্কে বিষম কৃচ্ছতা মানুষ ভোগ করে কেবল অন্যান্য বিষয়ে কৃচ্ছতা ভোগের পরেই। খাদ্যের স্বল্পতা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা হিসাবে দেখা দেবার অনেক আগেই, জীবন ও অনশনের মধ্যস্থলে অবস্থানকারী নাইট্রোজেন ও কার্বনের গ্রেনগুলি গুনে দেখার প্রয়োজন শরীর-বিদ্যাবিদের মাথায় দেখা দেবার অনেক আগেই, নিশ্চয়ই পরিবারটি সব রকমের বৈষয়িক সচ্ছলতা থেকে সম্পূর্ণ রিক্ত হয়ে গিয়েছেন; কাপড়-চোপড় ও জ্বালানি নিশ্চয়ই খাবারের তুলনায় আরো বিরল হয়ে পড়েছে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চয়ই অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়েছে, থাকবার জায়গা নিশ্চয়ই এতটা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে যে ঠাসাঠাসি করে থাকার ফলে রোগের প্রাদুর্ভাব বা প্রকোপ ঘটেছে; সংসারের দৈনন্দিন ব্যবহারের বাসন-কোসন ও আসবাব-পত্র সম্ভবত আর অবশিষ্ট নাই—এমনকি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষার ব্যয়ও হয়ে পড়েছে সাধ্যাতীত বা কষ্টসাধ্য, এবং যদি তা রক্ষার জন্য আত্ম মর্যাদাকর কোনো প্রচেষ্টা করা হয়, তা হলে এমন প্রত্যেকটি প্রচেষ্টার সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে ক্ষুধার যন্ত্রণা। বাড়ি হবে সেখানেই, যেখানে আশ্রয় পাওয়া যায় সবচেয়ে সস্তায় -এমন সব পল্লীতে যেখানে স্বাস্থ্য-বিভাগের তদারকির পরিচয় মেলে সবচেয়ে কম, নর্দমা ইত্যাদির ব্যবস্থা সবচেয়ে কম, মেথরের কাজ সবচেয়ে কম, আবর্জনা-সাফাই সবচেয়ে কম, জল সরবরাহ সবচেয়ে কম বা সবচেয়ে খারাপ এবং, যদি শহরাঞ্চলে হয়, তা হলে আলো-হাওয়াও সবচেয়ে কম। যেখানে অভাব এই মাত্রায় উপনীত যে খাদ্যের পর্যন্ত অভাব ঘটেছে, সেখানে দারিদ্র্য প্রায় অবধারিত ভাবেই এই সব বিপদে আক্রান্ত। এবং যখন সেগুলির মোট যোগফল জীবনের বিরুদ্ধে ভয়ংকর আকার ধারণ করে, তখন কেবল খাদ্যের স্বল্পতা পর্যবসিত হয় একটি গুরুতর ব্যাপারে।……এই পরিস্থিতি ভাবতেও কষ্ট হয়, যখন মনে করা যায় যে, এই দারিদ্র্য যা তারা ভোগ করে, তা তাদের আলস্যজনিত যথাপ্রাপ্য দারিদ্র্য নয়। সমস্ত ক্ষেত্রেই এই দারিদ্র্য হল অমরত জন সংখ্যার দারিদ্র্য। বস্তুত পক্ষে, কর্মশালার অন্দরকর্মীরা যে-কাজের বিনিময়ে তাদের সামান্য খাদ্যের খয়রাত পায়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যধিক মাত্রায় দীর্ঘায়িত করা হয়। তবু এটা সুস্পষ্ট যে, কেবল সীমাবদ্ধ অর্থেই এই কাজকে স্বয়ম্ভর বলে গণ্য করা যায়। এবং এই নামমাত্র স্বয়ম্ভরতা এক অতি বৃহৎ আয়তনে কেবল দুস্থতায় উপনীত হবার পথ-পরিক্রমা মাও হতে পারে কখনো তা হ্রস্ব, কখনো দীর্ঘ। [২০]
