শ্রম-দিবস” এবং “মেশিনারি” সংক্রান্ত অধ্যায়গুলিতে পাঠক দেখেছেন কোন্ কোন্ অবস্থায় ব্রিটেনের শ্রমিক-শ্রেণী সম্পত্তিবান শ্রেণীগুলির জন্য সম্পদ ও শক্তির উন্মাদনাকর সংবৃদ্ধি” ঘটিয়েছিল। সেখানে আমরা প্রধানতঃ ব্যাপৃত ছিলাম শ্রমিকের সামাজিক কর্ম-সম্পাদনের সঙ্গে। কিন্তু সঞ্চয়নের নিয়মটির পূর্ণ ব্যাখ্যার জন্য, কর্মশালার বাইরেও তার অবস্থার দিকে নজর দেয়া দরকার—খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যাপারে তার যে অবস্থা, তার দিকে। এই গ্রন্থের যা চৌহদ্দি, তা আমাদের বাধ্য করে প্রধানতঃ শিল্প-সর্বহারা শ্রেণীর ( ‘ইণ্ডাস্ট্রিয়াল প্রোলেটারিয়েট’ )-এর সবচেয়ে কম মজুরি-প্রাপ্ত অংশের এবং কৃষি শ্রমিকদের বিষয়ে মনোযোগ দিতে; শিল্প-সর্বহারা-শ্রেণীর সবচেয়ে কম মজুরি-প্রাপ্ত অংশ এবং কৃষি-শ্রমিকেরাই হল একত্রে শ্রমিক-শ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।
কিন্তু, প্রথমে, সরকারি দুঃস্থতা প্রসঙ্গে, কিংবা শ্রমিকশ্রেণীর যে অংশ তার অস্তিত্ব ধারণের শর্তটিকে (শ্রমশক্তি বিক্রয়ের শর্তটিকে হারিয়েছে, এবং কোন রকমে বেঁচে আছে সরকারি খয়রাতের উপরে, সেই অংশটি প্রসঙ্গে একটি কথা। ইংল্যাণ্ডে দুঃস্থের সরকারি তালিকায়[১৩] সংখ্যা ছিল ৮,৫১,৩৬৯ জন; ১৮৫৬ সালে ৮,৭৭,৭৬৭ জন; ১৮৬৫ সালে ৯,৭১,৪৩৩ জন। তুলা-দুর্ভিক্ষের দরুন এই সংখ্যা ১৮৬৩ ও ১৮৬৪ সালে যথাক্রমে ১৭,৭৯,৩৮২ ও ১৩,১৪,৯৭৮ জন। ১৮৬৬ সালের সংকট, যা সবচেয়ে প্রচণ্ড ভাবে আঘাত করেছিল লণ্ডনকে, তা স্কটল্যাণ্ড-রাজ্যের বেশি জনবহুল এই বিশ্ববাজারের কেন্দ্রটিতে ১৮৬৬ সালে দুঃস্থ-সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল ১৮৬৫ সালের তুলনায় ১৯৫ শতাংশ এবং সালের তুলনায় ২৪°৪ শতাংশ, এবং ১৯৬৬ সালের তুলনায় ১৯৬৭ সালের প্রথম কয় মাস আরো বৃহত্তর শতাংশ। দুঃস্থ তালিকার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ থেকে দুটি জিনিস লক্ষ্য করতে হবে। এক দিকে, দুঃস্থদের সংখ্যায় উপরে-নীচে ওঠা-নামা প্রতিফলিত করে শিল্প-চক্রের পর্যায়ক্রমিক উত্থান-পতন। অন্যদিকে, মূলধনের সঞ্চয়নের সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণী-সংগ্রাম এবং, সেই কারণে, শ্ৰমিক-শ্রেণী শ্রেণী-সচেতন যে-অনুপাতে বিকাশ লাভ করে, সেই অনুপাতে দুঃস্থতা সম্পর্কিত সরকারি পরিসংখ্যানও বেশি। বেশি করে বিভ্রান্তিকর হয়। দৃষ্টান্ত : দুঃস্থদের প্রতি আচরণে যে-বর্বরতা প্রদর্শন করা হয়, যার সম্পর্কে ব্রিটেনের পত্র-পত্রিকাগুলি (দি টাইমস, পল মল গেজেট) গত দুবছর তারস্বরে চীৎকার করেছে, তা প্রাচীন কালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৮৪৪ সালে এফ, এঙ্গেলস ঠিক একই রকম ভয়ঙ্কর ঘটনা, ঠিক একই রকম “রোমাঞ্চ-সাহিত্য” সুলভ সাময়িক মামুলি হৈ চৈ-এর উদাহরণ দিয়ে ছিলেন। কিন্তু গত দশ বছর লণ্ডনে অনশনজনিত মৃত্যুর ভয়াবহ বৃদ্ধি নিঃসংশয়ে প্রমাণ করে যে, যে-আতংকের মধ্যে শ্রমজীবী জনগণকে কর্মশালার গোলামি তথা দুর্দশার জন্য দণ্ড ভোগ করতে হয়, তা বেড়েই চলেছে।[১৪]
(খ) ব্রিটেনের শিল্প-শ্রমিক-শ্রেণীর অতি নিম্ন মজুরি-প্রান্ত বিভিন্ন স্তর
১৮৬২ সালের তুলা-দুর্ভিক্ষের কালে প্রিভি কাউন্সিল ডাঃ স্মিথকে দায়িত্ব দিয়েছিল ল্যাংকাশায়ার ও চেশায়ারের দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের পুষ্টির অবস্থাদি সম্বন্ধে তদন্ত করতে। পূর্ববতী অনেক বছরের পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, “অনশনজনিত আধি-ব্যাধি নিবারণের জন্য একজন সাধারণ নারীর দৈনিক আহারে ১৮০ গ্রেন নাইট্রোজেনসহ অন্ততঃ ৩,৯০০ গ্রেন কার্বন থাকা দরকার। একজন সাধারণ পুরুষের ২০০ গ্রেন নাইট্রোজেনসহ অন্তত ৪,৩০০ গ্রেন কার্বন; নারীদের জন্য ২ পাউণ্ড ভাল গমের রুটিতে যে-পরিমাণ পুষ্টিকর উপাদান থাকে ততটা পুরুষদের জন্য আরো ২ ভাগ; বয়স্ক নারী ও পুরুষের জন্য সাপ্তাহিক গড় অন্ততঃ পক্ষে ২৮,৬০০ গ্রেন কার্বন এবং ১,৩৩০ গ্রেন নাইট্রোজেন। পুষ্টিকর খাদ্যের যে-শোচনীয় পরিমাণ তুলা-শ্রমিকেরা অভাবের চাপে খেতে বাধ্য হচ্ছিল, ডাঃ স্মিথের হিসাব আশ্চর্যজনক ভাবে তার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। ১৮৬২ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিমাণ ছিল সপ্তাহে ২৯,২১১ গ্রেন কার্বন এবং ১,২৯৫ গ্রেন নাইট্রোজেন।
১৮৬৩ সালে প্রিভি কাউন্সিল ইংল্যাণ্ডের শ্রমিক-শ্রেণীর সবচেয়ে অপুষ্টি-পীড়িত অংশের দুর্দশা সম্পর্কে একটি তদন্তের আদেশ দেয়। প্রিভি কাউন্সিলের মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ সাইমন এই কাজের জন্য মনোনীত করেন উক্ত ডাঃ স্মিথকে। তার তদন্তের পরিধিভুক্ত ছিল একদিকে কৃষি-শ্রমিকেরা এবং, অন্য দিকে রেশম-বয়নকারী, সূচী-কর্মে নিযুক্ত মহিলারা, দস্তানা-প্রস্তুতকারীরা মোজা-বয়নকারীরা ও পাদুকা প্রস্তুতকারীরা। তদন্তকার্য পরিচালনায় নিয়ম করে দেওয়া হয়েছিল যে, প্রত্যেকটি বর্গে সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান পরিবারগুলিকে এবং তুলনামূলক ভাবে যারা সর্বাপেক্ষা ভাল অবস্থায় আছে, তাদের অবস্থাই তদন্ত করা হবে।
সাধারণ ভাবে দেখা গিয়েছিল, অন্দরে কাজ করে এমন শ্রমিকদের যে-সব শ্রেণীকে পরীক্ষা করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কেবল একটি শ্রেণীর ক্ষেত্রেই নাইট্রোজেনের গড় সরবরাহ ন্যূনতম পর্যাপ্ততার নির্ধারিত মাত্রা যৎসামান্য অতিক্রম করেছে এবং আরেকটি শ্রেণীর ক্ষেত্রে সেই মাত্রা প্রায় উপনীত হওয়া গিয়েছে [ এখানে পর্যাপ্ত মানে হল অনশন-জনিত আধি ব্যাধি নিবারণের পক্ষে পর্যাপ্ত ]; এবং দুটি শ্রেণীর ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে গিয়েছে। একটিতে বিরাট ঘাটতি-নাইট্রোজেন ও কার্বন, উভয়েরই। তা ছাড়া, কৃষি-জনসংখ্যার সমীক্ষাভুক্ত পরিবারগুলির ক্ষেত্রে দেখা গেল, তাদের মধ্য এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি পায় কার্বনযুক্ত খাদ্যের নির্ধারিত মাত্রার কম, এক তৃতীয়াংশেরও বেশি পায় নাইট্রোজেনযুক্ত খাদ্যের নির্ধারিত মাত্রার কম এবং তিনটি কাউন্টিতে (বার্কশায়ার, অক্সফোর্ডশায়ার এবং সমারসেটশায়ার-এ) নইেট্রোজেন খাদ্যের অপ্রতুলতাই হল স্থানীয় আহার্যের গড় বৈশিষ্ট্য।[১৫] কৃষি-শ্রমিকদের মধ্যে, যুক্তরাজ্যের সর্বাপেক্ষা বিত্তশালী অংশ যে ইংল্যাণ্ড, সেই ইংল্যাণ্ডেবই কৃষি-শ্রমিকেরা হল সবচেয়ে স্বল্পভুক্ত।[১৬] কৃষি-শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্যের এই অনটনের দুর্ভোগ প্রধানতঃ সহ্য করতে হয় নারী ও শিশুদের, কেননা যাতে সে কাজ করতে পারে, তার জন্য পুরুষ মানুষকে অবশ্যই খেতে হবে।” এ থেকেও আরো বেশি অভাব-অনটন বিধ্বস্ত করে দিচ্ছিল শহরের শ্রমিকদের। তারা এত স্বল্পভুক্ত যে নিশ্চিত ভাবেই তাদের মধ্যে রয়েছে কঠোর ও ক্ষতিকর কচ্ছ-সাধনের অনেক দৃষ্টান্ত।[১৭] (এই সবই তো ধনিকে কৃচ্ছসাধন। অর্থাৎ তার “হাতগুলি”-কে কেবল সজীব রাখার জন্য নিছক প্রাণধারণের যে-নূ্যনতম উপকরণসমূহ পরম প্রয়োজন, সেগুলি জন্য তদুপযোগী ব্যয়-সংস্থান থেকে “আত্ম সংবরণ”)।
