কোন পণ্যমূল্যের সোনার মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি, সেটাই হল তার অর্থ-রূপ বা দাম, যেমন, ও পণ্য ক=ঔ অর্থপণ্য। ১ টিন লোহা = ২ আউন্স সোনার মতো একটি মাত্র সমীকরণই এখন সমাজ-সিদ্ধভাবে লোহার মূল্য প্রকাশের পক্ষে যথেষ্ট। যেহেতু সোনা নামক সমার্ঘ সামগ্রীটি এখন অর্থের চরিত্রসম্পন্ন, সেইহেতু এখন আর সমীকরণটিকে বাকি সমস্ত পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন মূল্য প্রকাশকারী বহুসংখ্যক সমীকরণের একটি অখণ্ড শৃংখলের মধ্যে একটি খণ্ড গ্রন্থি হিসেবে দেখাবার দরকার নেই। আপেক্ষিক মূল্যের সাধারণ রূপটি এখন তার সরল বা বিছিন্ন আপেক্ষিক মূল্যের আদি রূপ ফিরে পেয়েছে। অন্য দিকে, আপেক্ষিক মূল্যের সম্প্রসারিত প্ৰকাশটি—সংখ্যাহীন সমীকরণের শেষহীন প্রস্তটি এখন হয়ে উঠেছে অর্থ-পণ্যের আপেক্ষিক মূল্যের স্ববিশিষ্ট রূপ। এই প্রস্তটিও এখন সুনির্দিষ্ট এবং সত্যকার পণ্য-সমূহের বিভিন্ন দাম হিসেবে সমাজ দ্বারা স্বীকৃত। নানান। ধরনের পণ্যের মাধ্যমে প্রকাশিত অর্থ-মূল্যের আয়তন জানবার জন্য আমাদের এখন। একটি দামের তালিকার উপরে চোখ বোলানোই যথেষ্ট। কিন্তু অর্থের নিজের নিজের কোনো দাম নেই। এই দিক থেকে সে যদি অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে একই মর্যাদায় দাড়াতে চায়, তা হলে আমরা বাধিত হব তাকে তার নিজেরই সমার্থ সামগ্রী হিসেবে সমীকরণ করতে।
পণ্যসমূহের মূল্য-রূপের মতো, তাদের দাম বা অর্থ-রূপও হচ্ছে এমন একটি রূপ যা তাদের দৃশ্যমান দেহগত রূপ থেকে সুস্পষ্ট, সুতরাং, এটা হচ্ছে নিছক ভাবগত বা মনোগত রূপ। যদিও অদৃশ্য, লোহা, ছিট এবং শস্যের মূল্যের অস্তিত্ব এই সমস্ত সামগ্রীর মধ্যেই আছে : তাকে ভাবগত ভাবে দৃশ্যমান করে তোলা হয় সোনার সঙ্গে এগুলির সমতা বিধান করে বলা যেতে পারে, এটা এমন একটা সম্পর্ক যা কেবল তাদের মাথায়ই ছিল। অতএব তাদের দাম বাইরে বিজ্ঞাপিত করার আগে তাদের মালিককে অবশ্যই কাজ করতে হবে—হয় তার নিজের জিহ্বাটা তাদেরকে দিয়ে দিতে হবে আর নয়তো তাদের গায়ে একটা করে টিকিট সেঁটে দিতে হবে।[২] যেহেতু সোনার আকারে পণ্যমূল্যের প্রকাশ হচ্ছে নিছক একটি ভাবগত রূপ, সেই হেতু এই উদ্দেশ্যে আমরা ব্যবহার করতে পারি কাল্পনিক বা ভাবগত অর্থ। প্রত্যেক ব্যবসায়ী জানে যে যখন সে তার পণ্যসামগ্রীর মূল্যকে একটা দামের আকারে কিংবা কাল্পনিক অর্থের অঙ্কে প্রকাশ করেছে তখনো সে তার পণ্যসামগ্রীকে অর্থে রূপান্তরিত করা থেকে চের দূরে আছে; সে এ-ও জানে সোনার অঙ্কে লক্ষ লক্ষ পাউণ্ডের পণ্য সামগ্রীর মূল্য হিসাব করতে তার এক টুকরো সোনারও প্রয়োজন পড়েনা। সুতরাং অর্থ যখন মূল্যের পরিমাপ হিসেবে কাজ করে, তখন তাকে ব্যবহার করা হয় কেবল কাল্পনিক ভাবগত অর্থ হিসেবে। এই ঘটনা থেকে উদ্ভট উদ্ভট সব তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে।[৩] কিন্তু যদিও যে-অর্থ মূল্যের পরিমাপ হিসেবে কাজ করে, সে হচ্ছে ভাগবত অর্থ, ৩। হলেও কিন্তু দাম নির্ভর করে সেই বাচ্চা বস্তুটির উপরে যাকে বলা হয় অর্থ’। এক টন লোহায় যে-মূল্য তথা যে-পরিমাণ মনুষ্য-শ্ৰম বিধৃত থাকে, কল্পনায় তাকে প্রকাশ করা হয় সেই পরিমাণ অর্থ-পণ্যের দ্বারা যা ঠিক সেই লোহার সম-পরিমাণ শ্রমকে বিধৃত করে আছে। যেহেতু মূল্যের পরিমাপক হচ্ছে সোনা, রূপা বা তামা, সেহেতু উক্ত এক টন লোহার মূল্য অভিব্যক্তি লাভ করবে খুবই ভিন্ন ভিন্ন খণ্ডের মাধ্যমে অথবা ঐ ধাতুগুলির খুবই ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণের মাধ্যমে।
সুতরাং, যদি দুটি ভিন্ন ভিন্ন ধাতু, যেমন সোনা এবং রূপা, যুগপৎ মূল্যের পরিমাপক হয়, তা হলে সমস্ত পণ্যেরই থাকে দুটি করে দাম—একটি সোনার অঙ্কে অন্যটি রূপার অঙ্কে। যত দিন পর্যন্ত রূপার মূল্য আর সোনার মূল্যের অনুপাত ধরা যাক ১৫:১, অপরিবর্তিত থাকে ততদিন দুটো দামই অনায়াসে পাপাপাশি চলতে থাকে। তাদের মধ্যেকার অনুপাতে যখনি কোন পরিবর্তন ঘটে তখনি পণ্যের সোনার অঙ্কে দাম আর রূপার অঙ্কে দামের মধ্যেকার অনুপাতেও পরিবর্তন ঘটে এবং এতে এটাই প্রতিপন্ন হয় যে একটি মানের কার্যাবলী সম্পাদনের সঙ্গে মূল্যের দ্বৈতমান অসঙ্গতি পূর্ণ।[৪]
নির্দিষ্ট দামের পণ্যসমূহ নিজেদেরকে উপস্থিত করে নিম্নলিখিত রূপে :
ক পরিমাণ ক পণ্য = ও পরিমাণ সোনা;
খ পরিমাণ খ পণ্য = জ পরিমাণ সোনা;
গ পরিমাণ গ পণ্য = ঔ পরিমাণ সোনা। ইত্যাদি সেখানে
ক, খ এবং গ হল যথাক্রমে ক, খ এবং গ পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণসমূহ আর ও, জ এবং ও হল যথাক্রমে সোনার নির্দিষ্ট পরিমাণসমূহ। সুতরাং এই সমস্ত পণ্যের মূল্যসমূহ কল্পনায় বিভিন্ন পরিমাণের সোনায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। অতএব পণ্যসম্ভারের বিভ্রান্তি কর বিচিত্রতা থাকা সত্ত্বেও, তাদের মূল্যসমূহ কিন্তু পরিণত হয় একই অভিধার অন্তর্গত বিভিন্ন আয়তনে তথা সোনার অঙ্কে বিভিন্ন আয়তনে। তাদের এখন পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করা এবং পরিমাপ করা যায়। তখন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনাকে পরিমাপে একক হিসাবে ধরে নিয়ে তাদের তুলনা করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই একই পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভগ্নাংশে বিভক্ত হয়ে পরিমাপের মানে পরিণতি লাভ করে। অর্থে পরিণত হবার আগেই সোনা, রূপা এবং তামা তাদের বিভিন্ন ওজনের মান অনুসারে এমন বিভিন্ন মানের পরিমাপ ধারণ করে, যাতে করে একটি স্টার্লিং পাউণ্ড যখন একদিকে, একক হিসাবে উপযুক্ত সংখ্যক আউন্সে বিভক্ত হতে পারে, তখন অন্যদিকে, তা আবার উপযুক্ত সংখ্যক পাউণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিণত হতে পারে একটি হাতে ওয়েটে[৫]। এই কারণে সমস্ত ধাতব মুদ্রা ব্যবস্থাতেই দেখা যায় যে অর্থের বিভিন্ন মানের বা দামের বিভিন্ন মানের যেসব নামকরণ করা হয়েছিল, সে সব নামই নেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন ওজনের পূর্বাগত নামগুলি থেকে।
