যে অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা শ্রমিকদের উপদেশ দেয় তাদের সংখ্যাকে মূলধনের প্রয়োজনের সঙ্গে সমন্বয় করিয়ে নেবার জন্য, তার মূঢ়তা এখন প্রকট। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ও সঞ্চয়নের প্রণালী নিজেই নিরন্তর এই সমন্বয় সাধন করে। এই সমন্বয়নের প্রথম কথাটি হল আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার বা শিল্পগত সংরক্ষিত কর্মী-বাহিনীর সৃষ্টি। আর তার শেষ কথাটি হল সক্রিয় শ্রম-বাহিনীর নিরন্তর প্রসারণশীল সুরসমূহের দুঃখ-দুর্দশা, এবং দুঃস্থতার জগদ্দল পাষাণ।
যে নিয়মের বলে, সামাজিক শ্রমের উৎপাদনশীলতার অগ্রগতির কল্যাণে, উৎপাদন-উপায়সমূহের নিরন্তর বর্ধমান পরিমাণকে মনুষ্য-শ্রমের ক্রমবর্ধিত হাৱে হ্রাসমান ব্যয়ের দ্বারা গতিশীল করা যায়, সেই নিয়মটি ধনতান্ত্রিক সমাজে—যেখানে শ্রমিক উৎপাদনের উপায়কে খাটায় না, উৎপাদনের উপায়ই শ্রমিক খাটায়—একটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, এবং এই ভাবে অভিব্যক্ত হয় : শ্রমের উৎপাদনশীলতা যত বৃদ্ধি পায়, কর্মে নিয়োগের উপায়গুলির উপরে শ্রমিকদের চাপও তত বৃদ্ধি পায়; সুতরাং তাদের অস্তিত্বের অবস্থা হয়ে ওঠে আরো অনিশ্চিত, অর্থাৎ আরেকজনের সম্পদ বাড়াবার জন্য, মূলধনের আত্মবিস্তারের জন্য তাদের নিজেদের শ্রমশক্তি বিক্রয়ের ব্যাপারটা হয়ে ওঠে আরো অনিশ্চিত। সুতরাং উৎপাদনের উপায়সমূহ ও শ্রমের উৎপাদনশীলতা, যে উৎপাদনশীল জনসংখ্যার তুলনায় দ্রুততর গতিতে বৃদ্ধি পায়, এই ঘটনা ধনতান্ত্রিক ভাবে নিজেকে প্রকাশ করে এই বিপরীত রূপে যে যে-অবস্থাবলীতে মূলধন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত শ্রমজীবী জনসংখ্যাকে তার নিজের আত্ম-প্রসারণের জন্য কাজে লাগাতে পারে, সেই অবস্থাবলীর বিকাশলাভের তুলনায় শ্রমজীবী জনসংখ্যা দ্রুততর গতিতে বৃদ্ধি পায়।
চতুর্থ বিভাগে, আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আমরা দেখেছিলাম : ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমের সামাজিক উৎপাদনশীলতা উন্নীত করার সব কটি পদ্ধতিই সংঘটিত হয় ব্যক্তিগত শ্রমিকের স্বার্থের বিনিময়ে; উৎপাদন উন্নয়নের সব কটি উপায়ই নিজেদেরকে রূপান্তরিত করে উৎপাদনকারীদের উপরে আধিপত্য বিস্তারের এবং তাদের শোষণ করার উপায়ে; তার শ্রমিককে বিকলাঙ্গ করে তাকে পর্যবসিত করে মানুষের একটি ভগ্নাংশে; তাকে অধঃপাতিত করে যন্ত্রের একটি উপাঙ্গে, তার কাজের সমস্ত আকর্ষণকে ধ্বংস করে দিয়ে কাজকে পরিণত করে ঘৃণ্য উবৃত্তিতে; যে-মাত্রায় শ্রম-প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানকে স্থান করে দেওয়া হয় একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসাবে, সেই মাত্রায় তারা শ্রমিককে বিচ্ছিন্ন করে তার বুদ্ধিবৃত্তিগত সম্ভাবনাগুলি থেকে; তারা তার কাজের অবস্থাবলীকে বিকৃত করে, শ্রম-প্রক্রিয়া চলাকালে তাকে বশীভূত করে এমন এক স্বৈরতন্ত্রের কাছে, যা তার নীচতার জন্য আরো জঘন্য; তারা তার জী-কালকে পরিণত করে নিছক কর্ম-কালে এবং তার স্ত্রী ও সন্তানকে টেনে নিয়ে যায় মূলধনরূপী জগন্নাথের রথের চাকার তলায়।[৫] কিন্তু উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের সব কটি পদ্ধতিই আবার একই সঙ্গে সঞ্চয়নেরও পদ্ধতি; এবং সঞ্চয়নেরও প্রত্যেকটি সম্প্রসারণই আবার পরিণত হয় ঐ পদ্ধতিগুলিরই বিকাশ-সাধনের উপায়। এ থেকে বেরিয়ে আসে যে, মূলধন যে-অনুপাতে সঞ্চয়িত হয়, শ্রমিকের ভাগ্য সেই অনুপাতে আরো খারাপ হয় তার মজুরি বেশিই হোক বা কমই হোক। সর্বশেষে, এই যে নিয়ম যা সব সময়ে আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যাকে, কিংবা শিল্পের সংরক্ষিত বাহিনীকে সঞ্চয়নের প্রসার ও প্রবলতার সঙ্গে সমতা-সঙ্গত করে, এই নিয়মটি ভাকানের গোঁজগুলি প্রমিথিউসকে যতটা দৃঢ়ভাবে পাথরের সঙ্গে এটে দিয়েছিল, তার চেয়েও দৃঢ়ভাবে শ্রমিককে মূলধনের সঙ্গে এটে দেয়। মূলধনের সঞ্চয়নের সঙ্গে সঙ্গে তা দুঃখ-দৈন্যের সঞ্চয়নও সংঘটিত করে। সুতরাং, এক মেরুতে সম্পদের সঞ্চয়নের সঙ্গে একই সময়ে বিপরীত মেরুতে, অর্থাৎ, যে-শ্রেণীটি মূলধনের আকারে নিজের উৎপন্ন সামগ্রী উৎপাদন করে, সেই শ্ৰেণীটির প্রান্তে, ঘটায় দুঃখ-দুর্দশার সঞ্চয়ন, উঞ্ছবৃত্তি, দাসত্ব, অজ্ঞতা, পাশবিকতা, মানসিক অধঃপতনের যণ।। রাষ্ট্ৰীয় অর্থতাকের ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের এই স্ববিরোধী চরিত্র নানা ভাবে বিবৃত করেছেন; যদিও তারা তাকে গুলিয়ে ফেলেছেন এমন সব ব্যাপারের সঙ্গে, যেগুলি নিশ্চয়ই কিছু পরিমাণে অনুরূপ, কিন্তু তা হলেও মূলত আলাদা, এবং প্রাকৃ-ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতিসমূহের অন্তর্গত।
আঠারো শতকের বিরাট অর্থনৈতিক লেখকদের অন্যতম, ভেনিসীয় সন্ন্যাসী অর্টেস ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের বিরোধিতাকে গণ করেন সামাজিক সম্পদের সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম হিসাবে। একটি জাতির অর্থনীতিতে সুবিধা ও অসুবিধাগুলি সবসময়ে পরস্পরের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে {©il bcne ed il male economico in una nazione sempre all, intessa misura”): pape GTCAI RIGU সম্পদের প্রাচুর্য সব সময়ে বাকি লোকদের হাতে সম্পদের অভাবের সমান হয় (la copia dei beni in alcuni sempre eguale alla mancanza di essi in altri): অল্পসংখ্যক লোকের হাতে বিপুল ঐশ্বর্য সব সময়ে বাকি অনেকের জন্য প্রাণ-ধারণের প্রাথমিক প্রয়োজনগুলির চরম অভাবের সঙ্গে যায়। কোন জাতির সম্পদ হয় তার জনসংখ্যার সঙ্গে আনুপাতিক এবং তার দুর্দশা হয় তার সম্পদের সঙ্গে আনুপাতিক। কিছু লোকের মধ্যে শ্রমশীলতা অন্যদের মধ্যে বাধ্যতামূলক অলসতা সৃষ্টি করে। দরিদ্র ও অলসেরা ধনী ও পরিশ্রমীদের আবশ্যিক পরিণতি।”[৬] অর্টেস এর প্রায় দশ বছর পরে সম্পূর্ণ পাশবিক ভাবে, ইংল্যাণ্ডের গীর্জার ভারপ্রাপ্ত যাজক টাউনসেণ্ড দারিদ্রের যাতনার মহিমা কীর্তন করেন সম্পদের আবশ্যিক শর্ত হিসাবে। “শ্রমের উপরে) আইনগত নিয়ন্ত্রণ অতিরিক্ত ঝামেলা, হিংসা ও গোলমাল সঙ্গে নিয়ে আসে, অন্য দিকে, ক্ষুধা কেবল শান্তিপূর্ণ, নিঃশব্দ, অবিরাম চাপই নয়, পরন্তু শ্রম ও মেহনতের সবচেয়ে স্বাভাবিক তাড়না হিসাবে তা উদ্ব,দ্ধ করে সবচেয়ে প্রবল কর্ম তৎপরতা।” সুতরাং, সব কিছুই নির্ভর করে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে ক্ষুধাকে চিরস্থায়ী করার উপরে, এবং টাউনসেণ্ড-এর মতে, জনসংখ্যার নীতি—যা বিশেষ করে, দরিদ্রদের মধ্যে সক্রিয় সেই নীতি তার জন্য যথোচিত সংস্থান রাখে। “মনে হয় এটা প্রকৃতিরই একটি নিয়ম যে, দরিদ্ররা হবে কিছু মাত্রায় অদূরদশী (এত অদূরদশী যে মুখে রুপোর চামচে ছাড়াই তার ভূমিষ্ঠ হয়। যাতে করে সব সময়েই এমন কিছু লোক পাওয়া যায় যারা সমাজের সবচেয়ে হীন, সবচেয়ে নীচ ও সবচেয়ে ইতর করবে। এর দ্বারা মানুষের সুখের ভাণ্ডার বর্ধিত হবে এবং যারা অধিকতর নম্র-স্বভাব তারা কেবল কর্ম যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতিই পাবে না: … পরন্তু বিনা বাধায় তাদের নিজ নিজ প্রবৃত্তি অনুসারে বৃত্তি অনুসরণের স্বাধীনতা পাবে।…..সুষমা ও সৌন্দর্য, সমন্বয় ও শৃংখলার যে ব্যবস্থা ঈশ্বর ও প্রকৃতি এই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন, গরিব আইন’ তা ধ্বংস করতে উন্মুখ হবে।”[৭] যা দুঃখ-দুর্দশাকে করে চিরন্তন, সেই অবধারিত ভবিতব্যের মধ্যে যদি ভেনেসীয় সন্ন্যাসীটি আবিষ্কার করে থাকেন খ্ৰীষ্টীয় করুণা, কৌমার্য, মঠ ও মন্দিরের আদি কারণ, তা হলে বৃত্তি-ভোগী প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক-সম্প্রদায় তার মধ্যে খুঁজে পান সেই সব আইনকে নিন্দা করার একটা অছিলা, যেসব আইনের বলে গরিবেরা পেয়েছিল শোচনীয় পরিমাণ সরকারি ত্রাণ-সাহায্যের অধিকার।
