যখনি ধনতান্ত্রিক উৎপাদন কৃষিকর্মের দখল নেয়, এবং যে-মাত্রায় তা এটা করে সেই অনুপাতে, তখনি শ্রমের চাহিদা দারুণ ভাবে পড়ে যায়। অন্যদিকে, কৃষিতে বিনিয়োজিত মূলধনের সঞ্চয়নের অগ্রগতি ঘটে, কিন্তু অ-কৃষিক্ষেত্রে যেমন এই প্রতিসারণ অধিকতর আকর্ষণের দ্বারা পরিপূরিত হয়, এখানে তা হয় না। সুতরাং, কৃষিগত জনসংখ্যার একটা অংশ সব সময়েই শহুরে বা কারখানা-শ্রমিকে রূপান্তরিত হবার মুখে থাকে এবং এই রূপান্তরণের অনুকূল অবস্থার জন্য অপেক্ষা করে। (কারখানা কথাটি এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে সমস্ত অ-কৃষিগত শিল্পসমূহ বোঝতে।)[৩] অতএব, আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার এই উৎসটি সব সময়েই থাকে ভাসমান। তবে শহরমুখী এই নিরন্তর প্রবাহের পূর্বশর্ত হল খোদ গ্রামাঞ্চলে একটি উত্ত-জনসংখ্যার নিরন্তর প্রচ্ছন্ন অস্তিত্ব, যার আয়তন কেবল তখনি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন তার প্রবাহের পথগুলি অসাধারণ বিস্তার লাভ করে। সুতরাং কৃষি-শ্রমিকদের মজুরি পর্যবসিত করা হয় ন্যূনতম পরিমাণে এবং তাদের একটি পা সব সময়েই থাকে দুঃস্থতার পঙ্কে।
আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার তৃতীয় বর্গটি, নিশ্চল বৰ্গটি, সক্রিয় শ্রম-বাহিনীরই একটি অংশ কিন্তু তার কর্ম-নিয়োগ ঘটে চরম অনিয়মিত ভাবে। সুতরাং এই অংশটি মূলধনকে যোগায় ব্যবহার্য শ্রমশক্তির এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। এর জীবনধারণের অবস্থা শ্ৰমিক-শ্রেণীর গড়পড়ত। জীবনধারণের অবস্থার অনেক নীচে নেমে যায়; এর ফলে তা সঙ্গে সঙ্গেই ধনতান্ত্রিক শোষণের বিশেষ বিশেষ শাখার প্রশস্ত ভিত্তিতে পরিণত হয়। কাজের সময় সবচেয়ে বেশি, মজুরি সবচেয়ে কম-এই হল এর বিশেষত্ব। এর প্রধান রূপটিকে আমরা জানতে শিখেছি লাল কালিতে লেখা “ঘরোয়া শিল্প”—এই শিরোনামায়। এ নিরন্তর এর কর্মী সংগ্রহ করে আধুনিক শিল্প ও কৃষির বাড়তি বাহিনীগুলি থেকে, বিশেষ করে সেই সব ক্ষয়িষ্ণু শিল্পশাখা থেকে, যেখানে হস্তশিল্প স্থান ছেড়ে দিচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারকে, ম্যানুফ্যাকচার স্থান ছেড়ে দিচ্ছে মেশিনারিকে। সঞ্চয়নের প্রসার ও প্রবলতার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার সৃষ্টি যেমন এগিয়ে যায়, এর প্রসারও তেমন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু অন্যান্য উপাদানের তুলনায়। শ্ৰমিক-শ্রেণীর বুদ্ধিসাধনে অনুপাতিক ভাবে বৃহত্তর অংশ গ্রহণ করায়, এটি একই সময়ে গঠন করে সেই শ্রেণীর একটি আত্ম পুনরুৎপাদনশীল ও আত্ম-বিস্তাৱশীল উপাদান। বস্তুতঃপক্ষে, কেবল জন্ম ও মৃত্যুর সংখ্যাই নয়, পরন্তু পরিবারগুলির অনাপেক্ষিক আকারও মজুরির উচ্চতার এবং, সেই কারণেই, শ্রমিকদের বিভিন্ন বর্গ যে-পরিমাণ প্রাণ-ধারণের উপকরণাদি পৰিভোগ করে, সেই পরিমাণের সঙ্গে বিপরীত ভাবে সম্পর্কিত। ধনতান্ত্রিক সমাজের এই নিয়মটি কেবল অসভ্য মানুষদের কাছেই নয়, সভ্যতাপ্রাপ্ত উপনিবেশবাসীদের কাছেও অদ্ভুত শোনাবে। এটা মনে করিয়ে দেয় জন্তু-জানোয়ারের সীমাহীন পুনরুৎপাদনের কথা, যেগুলি একক ভাবে দুর্বল এবং স্বভাবতই নিরন্তর শিকারের বলি।[৪]
আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার সবচেয়ে নিচুকার তলানি শেষ পর্যন্ত অবস্থান করে দুঃস্থতার চতুঃসীমায়। ভবঘুরে দুবৃত্ত ও বারনারীদের, এক কথায় বিপজ্জনক শ্রেণীগুলি”-কে বাদ দিলে, এই স্তরটি তিন ধরনের লোক নিয়ে গঠিত। প্রথমত, যারা কাজ করতে সক্ষম। প্রত্যেকটি সংকটেই যে দুঃস্থদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং প্রত্যেকটি পুনরুত্থানেই যে তাদের সংখ্যা হ্রাস পায়, সেটা দেখতে হলে ইংল্যাণ্ডে দুঃস্থতার পরিসংখ্যানের উপরে কেবল একবার ভাসাভাসা ভাবে চোখ বুলিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট। দ্বিতীয়তঃ, অনাথ ও দুঃস্থ শিশুর দল। এরা হল সংরক্ষিত শিল্প-কর্মীবাহিনীর সম্ভাব্য সদস্য এবং, বিপুল সমৃদ্ধির সময়ে, যেমন ১৮৬০ সালে, এরা দ্রুত বেগে ও বিরাট সংখ্যায় সংগৃহীত হয় সক্রিয় শ্রমিক-বাহিনীতে। তৃতীয়ত, যারা অধঃপতিত ও ‘অনাচারগ্রস্ত এবং যারা কাজ করতে অক্ষম-প্রধানতঃ তারা যারা শ্রম-বিভাজনের সঙ্গে অভিযোজনে অযোগ্য বলে প্রতিপন্ন; যেসব লোক শ্রমিকের স্বাভাবিক বয়ঃসীমা অতিক্রান্ত করেছে; যেসব লোক শিল্পব্যবস্থার বলি, বিপজ্জনক মেশিনারি, খনি, রাসায়নিক কারখানা ইত্যাদির বৃদ্ধির সঙ্গে যাদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে বিকলাঙ্গ, রোগগ্রস্ত, বিধবা ইত্যাদি। দুঃস্থতা হল সক্রিয় শ্রমিক-বাহিনীর হাসপাতাল আর সংরক্ষিত শ্রমিক-বাহিনীর জগদ্দল পাষাণ। এর উৎপাদন আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত জন সংখ্যার অন্তর্ভূক্ত, এর প্রয়োজন তাদেরও প্রয়োজন; উত্তজনসংখ্যা যেমন ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের, তথা ধনতান্ত্রিক সম্পদ-সৃষ্টির একটি অবস্থা, দুঃস্থতাও তেমন তাই। তা ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ‘faux frais-এ প্রবেশ করে; কিন্তু মূলধন জানে কেমন করে তাদের বৃহত্তম অংশকে নিজের কাঁধ থেকে শ্রমিক-শ্রেণী ও নিম্নতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কঁাধে ছুড়ে দিতে হয়।
সামাজিক সম্পদ, কর্মরত মূলধন, তার সংবৃদ্ধির মাত্রা ও শক্তি, এবং অতএব, শ্ৰমিক-শ্রেণীর ও তার শ্রমের উৎপাদনশীলতারও অনাপেক্ষিক পরিমাণ যত বৃদ্ধি পায়, শিল্পের সংরক্ষিত বাহিনীও তত বৃদ্ধি পায়। যে-কারণগুলি মূলধনের সম্প্রসারণমূলক ক্ষমতার বিকাশ ঘটায়, সেইগুলিই আবার তার অধীনস্থ শ্রম শক্তির বিকাশ ঘটায়। কিন্তু সক্রিয় শ্রমিক-বাহিনীর অনুপাতে এই সংরক্ষিত শ্রমিক বাহিনীর যত বৃহত্তর হবে, মোট উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার সমষ্টিও তত বৃহত্তর হবে, যাদের দুর্দশা, যাতনা এবং শ্রম বিপরীত অনুপাতে সম্পর্কিত। সর্বশেষে রুগ্ন-আতুর শ্রমিক শ্রেণীর, এবং এই সংরক্ষিত বাহিনীর, স্তরগুলি যত বিস্তার লাভ করে সরকারি দুঃস্থ-দাক্ষিণ্যও তত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের এটাই হল অনাপেক্ষিক সাধারণ নিয়ম। অন্যান্য সমস্ত নিয়মের মত এই নিয়মটিও তার ক্রম-প্রক্রিয়ায় নানা ঘটনার দ্বারা উপযোজিত হয়, যার বিশ্লেষণ এখানে আমাদের দরকার নেই।
