৬. হারিয়েট মার্টিনো, এ ম্যাঞ্চেস্টার স্ট্রাইক। ১৮৩২, পৃঃ ১০১।
৭. এমনকি ১৮৬৩ সালের তুলে।-দুর্ভিক্ষের সময় আমরা ব্ল্যাকবানের কর্মরত তুলোকাটুনিদের একটি পুস্তিকায় দেখতে পাই উপরি-খাটুনির তীব্র নিন্দা, যা কারখানা-আইনের দরুন কেবল বয়স্ক পুরুষ শ্রমিকদেরকেই পীড়িত করত “এই মিলের বয়স্ক কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রত্যহ ১২ থেকে ১৩ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে, যখন এমন শত শত লোক রয়েছে, যারা তাদের পরিবারবর্গকে রক্ষা করার জন্য এবং অতিরিক্ত কাজের চাপে পিষ্ট শ্রমিক-ভাইদের অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য স্বেচ্ছায় আংশিক কাজ করতেও রাজি, তাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে কর্মহীনতা।” ঐ পুস্তিকায় আরো বলা হয়েছে, “আমরা জিজ্ঞাসা করতে চাই কিছু সংখ্যক কর্মীকে দিয়ে এই উপরি-খাটানোর রীতি কি প্রভু ও ভৃত্যের মধ্যে ভালো মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে? যাদের উপরে জোর করে আলস্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের মত, যাদের উপরি-খাটানা হচ্ছে, তারাও সমান ভাবে অন্যায়টা অনুভব করে। অঞ্চলে যা কাজ আছে, তা সকলের মধ্যে ন্যায্য ভাবে ভাগ করে দিলে প্রায় সকলের জন্যই আংশিক কাজের ব্যবস্থা হয়ে যায়। আমরা কেবল মালিকদের কাছে আবেদন করছি যা করা উচিত, তাই করার জন্য, কিছু লোককে উপরি-খাটুনি খাটিয়ে বাকিদের জন্য কাজের অভাব সৃষ্টি করে তাদের খয়রাতের উপরে নির্ভর করতে বাধ্য না করে অল্প ঘণ্টা কাজের রীতি চালু করবার জন্য, বিশেষ করে যে-পর্যন্ত না আমাদের সুদিনের উদয় হচ্ছে।”(“রিপোর্টস ফ্যাক্টরিজ, ৩১ অক্টোবর ১৮৬৩”,পৃঃ ৮)। “এসে অন ট্রেড অ্যান্ড কমার্স”-এর লেখক তার অভ্যস্ত অভ্রান্ত বুর্জোয়া প্রবৃত্তির সাহায্যে কর্ম-নিযুক্ত শ্রমিকদের উপরে আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার ফল উপলব্ধি করতে পারে। “এই রাজ্যে অলসতার আরেকটি কারণ হল যথেষ্ট সংখ্যক শ্রমিকের অভাব। যখনি উৎপন্ন দ্রব্যের অস্বাভাবিক চাহিদার দরুন শ্রম দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ে, শ্রমিকেরা তাদের নিজেদের পরিণাম বুঝতে পারে এবং তাদের মালিকদেরও অনুরূপ ভাবে তা বুঝতে বাধ্য করে—একটা গোটা দিন আলসেমি করে কাটিয়ে দেয়।” (“এসে ইত্যাদি, পৃঃ ২৭-২৮)। আসলে বেচারারা মজুরি-বৃদ্ধির পিছনে ছুটছিল।
৮. “ইকনমিস্ট”, জানুয়ারি ২১, ১৮৬০।
.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ– আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার বিভিন্ন রূপ। ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের সাধারণ নিয়ম।
আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যা থাকে সকল সম্ভাব্য রূপে। যে-সময় জুড়ে সে আংশিক ভাবে বা সম্পূর্ণ ভাবে বেকার থাকে, তখন প্রত্যেকটি মিকই এই সংখ্যার মধ্যে পড়ে। শিল্প-চক্রের পরিবর্তনশীল পর্যায় সমুহের সময়ক্রমিক পৌনঃপুনিক রূপগুলি এই জন সংখ্যার উপরে যে-ছাপ রেখে যায়, সেগুলিকে হিসাবে না ধরলেও এখন সংকটের সময়ে একটা তীক্ষ্ণ রূপ, তখন মন্থরতার সময়ে একটা একটানা রূপ এগুলিকে হিসাবে না ধরলেও—এর সব সময়েই তিনটি রূপ থাকে, ভাসমান, প্রচ্ছন্ন, নিশ্চল।
আধুনিক শিল্পের কেন্দ্রগুলিতে-ফ্যাক্টরি, ম্যানুফ্যাকচার, লোহা-কারখানা, খনি ইত্যাদিতে-শ্রমিকদের কখনো তাড়িয়ে দেওয়া হয়, কখনো আবার আরো বেশি সংখ্যায় টেনে নেওয়া হয়, যার ফলে নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা মোটের উপরে বৃদ্ধি পায় যদিও সেই বৃদ্ধিটা ঘটে উৎপাদনের আয়তনের তুলনায় নিরন্তর হ্রাসমান অনুপাতে। এখানে উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার রূপটি ভাসমান।
স্বয়ংক্রিয় ফ্যাক্টরিগুলিতে, যেমন সব বৃহদাকার কর্মশালাগুলিতে, যেখানে মেশিনারি একটি উপাদান হিসাবে প্রবেশ করে, কিংবা যেখানে কেবল আধুনিক শ্রম বিভাজনই কার্যকর করা হয়, বিপুলসংখ্যক বালককে সাবালক না হওয়া পর্যন্ত কাজে রাখা হয়। যখন তারা সাবালকত্বে পৌছে যায়, তখন তাদের মধ্যে কেবল একটি ছোট সংখ্যাই সেই শিল্প-শাখাগুলিতে কাজ পায়, আর বেশির ভাগই নিয়মিত ভাবে কর্মচ্যুত হয়। কর্মচ্যুত এই গরিষ্ঠ অংশ ভাসমান উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার একটি উপাদানে পরিণত হয়, শিল্পের এই শাখাগুলি যত বিস্তার লাভ করে, এদের সংখ্যাও তত বৃদ্ধি লাভ করে। তাদের মধ্যে একটা অংশ দেশান্তরে চলে যায়, বাস্তবিক পক্ষে, মূলধনের দেশান্তর-গমনকে অনুসরণ করেই। তার একটা ফল হয় এই যে, পুরুষ-জনসংখ্যার তুলনায় নারী-জনসংখ্যা বেড়ে যায়, যেমন ঘটেছে ইংল্যাণ্ডে। শ্রমিকদের স্বাভাবিক সংখ্যা বৃদ্ধি যে সঞ্চয়নের প্রয়োজন পূরণ করে না, এবং তবু সব সময়েই সেই প্রয়োজনের তুলনায় উদ্বৃত্ত থাকে, সেটা স্বয়ং মূলধনেরই গতি-প্রকৃতির মধ্যে নিহিত একটি স্ববিরোধ। তা চায় অধিকতর সংখ্যক তারুণ্যপূর্ণ শ্রমিক আর অল্পতর সংখ্যক বয়স্ক শ্রমিক। এই স্ববিরোধটি অন্য স্ববিরোধের তুলনায় বেশি জাজ্বল্যমান নয়, যে স্ববিরোধটি হল এই যে, যখন হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন, তখন নালিশ শোনা যায় যে, যথেষ্ট সংখ্যক শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ শ্রম-বিভাগ তাদের বেঁধে রাখে এক একটি বিশেষ শিল্প-শাখায়।[১]
তা ছাড়া, মূলধনের দ্বারা শ্রমশক্তির পরিভোগ এত দ্রুতগতিতে সম্পাদিত হয় যে, শ্রমিক তার জীবনের আধাআধি পথ যেতে না যেতেই নিজেকে প্রায় সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে ফেলে। সে তখন অন্তর্ভূক্ত হয় বাড়তি শ্রমিক-সংখ্যার একজন হিসাবে, কিংবা অবনমিত হয় নিম্নতর ধাপে। আধুনিক শিল্পের ঠিক এই শ্রমজীবী জনসংখ্যার মধ্যেই আমরা লক্ষ্য করি স্বল্পতম আয়ুষ্কাল। ম্যাঞ্চেস্টারের স্বাস্থ্য-বিভাগের মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ লী বলেন, “ম্যাঞ্চেস্টারের উচ্চতর মধ্য-শ্রেণীতে মৃত্যুর গড় বয়স ৩৮ বছর, যেখানে শ্রমিক-শ্রেণীতে মৃত্যুর গড় বয়স ১৭ বছর; লিভারপুলে এই গড় বয়স দুটি যথাক্রমে ৩৫ বছর এবং ১৫ বছর। এ থেকে দেখা যায় যে, বিত্তবান শ্রেণীগুলির জীবনকাল কম ভাগ্যবান নাগরিকদের জন্য বরাদ্দ জীবনকালের দ্বিগুণেরও বেশি।”[২] এই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে হলে, শ্রমজীবী শ্রেণীর (প্রোলেটারিয়েট’ এর) এই অংশের অনাপেক্ষিক বৃদ্ধি ঘটাতে হবে এমন অবস্থায় যা তাদের সংখ্যাকে স্ফীতকায় করবে যদিও ব্যক্তিগত উপাদানগুলি হয়ে যাবে দ্রুত কর্মজীর্ণ। এইজন্যই চাই শ্রমিক-প্রজন্মগুলির দ্রুত নবীকরণ। (এই নিয়মটি অবশ্য জনসমষ্টির অন্যান্য অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়)। এই সামাজিক প্রয়োজনটি সাধিত হয় অল্প বয়সে বিবাহের দ্বারা (যা আধুনিক শ্রমিকেরা যে-অবস্থার মধ্যে জীবন কাটায়, তার একটি আবশ্যিক পরিণতি), এবং, শিশুদের শোষণ তাদের উৎপাদনের উপরে যে পরিপ্রাপ্তি প্রদান করে, তার দ্বারা।
