শ্রমজীবী জনসংখ্যার আস্তে আস্তে বংশদ্বাস হয় এবং মূলধন আবার তাদের তুলনায় আপেক্ষিকভাবে অত্যধিক হয়ে পড়ে, অথবা অন্যরা ব্যাপারটিকে যেমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, পড়তি মজুরি এবং সেই সঙ্গে শ্রমের বাড়তি শোষণ আবার সঞ্চয়নকে ত্বরান্বিত করে, যখন, একই সময়ে অল্পতর মজুরি শ্রমিক-শ্রেণীর সংখ্যাবৃদ্ধিকে দমিয়ে রাখে। তারপরে, আবার একটি সময় আসে, যখন শ্রমের যোগান চাহিদার তুলনায় কম পড়ে এবং মজুরি বৃদ্ধি ঘটে, এবং এইভাবে চলতে থাকে। বিকশিত ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের পক্ষে এটা গতিশীলতার একটি সুন্দর পদ্ধতি! মজুরি বৃদ্ধির দরুন, কাজের জন্য সত্য সত্যই উপযুক্ত এমন জনসংখ্যার কোনো সদর্থক বৃদ্ধি ঘটার আগে, তেমন। সময় বারংবার অতিক্রান্ত হত যার মধ্যে শিল্প-অভিযান অবশ্যই সম্পূর্ণায়িত হত, যুদ্ধ যোঝ ও জয় করা হত।
১৮৪৯ থেকে ১৮৫৯ সালের মধ্যে ইংল্যাণ্ডের কৃষিপ্রধান জেলাগুলিতে, একটা মজুরি বৃদ্ধি ঘটেছিল; যদিও তার সঙ্গে ফসলের দামও কমেছিল, তবু এই মজুরি-বৃদ্ধি ছিল কার্যত নগণ্য। যেমন, উইল্টশায়ারে মজুরি বেড়েছিল ৭ শিলিং থেকে ৮ শিলিং-এ; ডর্সেটশায়ারে ৭ বা ৮ শিলিং থেকে ৯ শিলিং-এ ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা ছিল উদ্বৃত্ত-কৃষি জনসংখ্যার দলে দলে গ্রাম ত্যাগের এক অস্বাভাবিক হিড়িকের ফল যার কারণ ছিল যুদ্ধের চাহিদা, রেলপথ, কারখানা, খনি ইত্যাদির বিস্তার। মজুরি যত কম থাকে, যে-অনুপাতে এত নগণ্য একটা মজুরি-বৃদ্ধি নিজেকে প্রকাশ করে তা তত বেশি হয়। যদি সাপ্তাহিক মজুরি হয়, ধরা যাক, ২. শিলিং এবং তা বেড়ে হয় ২২ শিলিং, তার মানে দাড়ায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি, যা শুনতে বেশ ভাল লাগে। প্রত্যেক জায়গায় জোত-মালিকেরা সোচ্চারে বিলাপ করছে, এবং এই উপোস-করানো মজুরি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লণ্ডনের ইকনমিস্ট’ (অর্থতাত্ত্বিক) বেশ গুরুত্ব দিয়েই একে “একটি সার্বিক ও সুপ্রচুর অগ্রগতি”[৮] বলে প্রলাপ বকছে। এই চোখ-ধাঁধানো মজুরির ফল হিসাবে যে-পর্যন্ত না কৃষি-শ্রমিকেরা এমন ভাবে বেড়েছে ও বংশবৃদ্ধি করেছে যে, তাদের মজুরি আবার কমে গিয়েছে; তারা কি, অচল-মস্তিষ্ক অর্থত্তিকদের ব্যবস্থাপত্র অনুসরণ করে, সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল? তারা প্রবর্তন করেছিল আরো আরো মেশিনারি এবং শ্রমিকেরা এক মুহূর্তে পরিণত হয়েছিল অপ্রয়োজনীয় বাহুল্যে আর এমন কি জোত-মালিকেরা যা চেয়েছিল, খুশি মনে তাই পেয়েছিল। তখন সেখানে কৃষিতে আগের তুলনায় বেশি মূলধন”-এর বিনিয়োগ ঘটল এবং বেশি উৎপাদনশীল ভাবে। তার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমের চাহিদা কেবল আপেক্ষিক ভাবেই কমে গেল না, কমে গেল অনাপেক্ষিক ভাবেও।
উল্লিখিত অর্থ নৈতিক গল্পকথাটি, যে-নিয়মগুলি মজুরির হ্রাস বৃদ্ধিকে কিংবা, এক দিকে, শ্রমিক-শ্রেণী তথা মোট শ্রমশক্তি এবং অন্য দিকে মোট সামাজিক মূলধনের মধ্যেকার অনুপাতকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই নিয়মগুলির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছে সেই নিয়মগুলিকে, যেগুলি উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে শ্রমজীবী জনসংখ্যাকে বণ্টন। করে দেয়। ধরা যাক, যদি অনুকূল পরিস্থিতিতে, উৎপাদনের কোন বিশেষ ক্ষেত্রে সঞ্চয়ন বিশেষ ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে, এবং তাতে মুনাফা, গড় মুনাফার তুলনায় বেশি হবার দরুন, অতিরিক্ত শ্ৰম আকর্ষণ করে, তা হলে, অবশ্যই শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এবং মজুরিও বৃদ্ধি পায়। উচ্চতর মজুরি-শ্রমজীবী জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশকে অধিকতর সুবিধাভোগী ক্ষেত্রটিতে টেনে নেয়, যে-পর্যন্ত না সেই ক্ষেত্রটি শ্রমশক্তিতে পরিপ্লাবিত হয়ে যায়, এবং মজুরি আবার তার গড় মানে কিংবা, চাপ খুব বেশি হলে, তারও নিচুতে নেমে না যায়। তখন, সেই শিল্প-শাখাটিতে কেবল যে নোহন শ্রমিকের প্রবেশ বন্ধ হয়, তাই নয়, সেখান থেকে পুরনো শ্রমিকের প্রস্থানও শুরু হয়ে যায়। এখানে রাষ্ট্রীয় অর্থতাত্ত্বিক মনে করেন, তিনি শ্রমিক-সংখ্যার অনাপেক্ষিক বৃদ্ধি ও সেই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির, এবং শ্রমিক-সংখ্যার অনাপেক্ষিক হ্রাস ও সেই সঙ্গে মজুরি-হ্রাসের তাবৎ কারণ দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু আসলে তিনি যা দেখতে পাচ্ছেন, তা হল উংপাদনের একটি বিশেষ ক্ষেত্রে শ্রমবাজারের ওঠা-নামা—তিনি দেখতে পাচ্ছেন কেবল মূলধন-বিনিয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল প্রয়োজন অনুসারে শ্রমজীবী জনসংখ্যার বণ্টনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি।
নিশ্চলাবস্থা ও গড় সমৃদ্ধির সময়কালে শিল্পের সংরক্ষিত বাহিনী সক্রিয় বাহিনীকে দাবিয়ে রাখে; অতি-উৎপাদন ও দমকা বৃদ্ধির সময়ে, সে তার দাবি-দাওয়াকে সংযত রাখে। অতএব, আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্য, হচ্ছে সেই কেন্দ্রাবলম্ব, যার উপরে শ্রমের চাহিদা ও যোগানের নিয়মটি কাজ করে। তা এই নিয়মটির কার্যক্ষেত্রকে এমন মাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, যা শোষণকার্যের পক্ষে ও মূলধনের আধিপত্যের পক্ষে পরম সুবিধাজনক।
এই জায়গায় অর্থত্তিক দালালির মহান সাফল্যগুলির মধ্যে একটি সাফল্যের প্রতি ফিরে তাকানো উচিত। স্মাণ করা দরকার যে, যদি নোতুন মেশিনারির প্রবর্তন বা পুরানো মেশিনারির প্রসারণের মাধ্যমে, অস্থির মূলধনের একটি অংশ স্থির মূলধনে রূপান্তরিত হয়, তা হলে এই কর্মকাণ্ডটিকে—যা মূলধনকে “স্থিত করে এবং ঠিক সেই কাজের দ্বারাই শ্রমিকদের “মুক্তিদান করে”—সেই কর্মকাণ্ডটিকে অর্থতাত্ত্বিক দালালটি ব্যাখ্যা করেন ঠিক বিপরীত ভাবে; তিনি দাবি করেন যেন তা শ্রমিকদের জন্য মূলধনকে মুক্ত করে দিচ্ছে। কেবল এখনি কেউ বুঝতে পারবেন এই দালালদের ধৃষ্টতা ! যাকে মুক্ত করা হচ্ছে, তা কেবল মেশিনের দ্বারা তৎক্ষণাৎ বহিস্কৃত শ্রমিক সমষ্টি নয়, সেই সঙ্গে যারা ভবিষ্যতে তাদের স্থান গ্রহণের জন্য পরবর্তী প্রজন্মে বয়ঃপ্রাপ্ত হচ্ছে, তাদেরকেও; এমন কি পুরানো ভিত্তিতেই ব্যবসার মামুলি সম্প্রসারণের সঙ্গে যে-অতিরিক্ত বাহিনীর নিয়মিত ভাবে কর্ম-নিযুক্ত হবার কথা, তাদেরকেও। তারা এখন সকলেই “মুক্তি-প্রদত্ত”, এবং বিনিয়োগ-সন্ধানী মূলধনের প্রত্যেকটি টুকরো তাদের ব্যবহার করতে পারে। এই মূলধন তাদেরই আকর্ষণ করুক বা অন্যদের আকর্ষণ করুক, সাধারণ শ্রম-চাহিদার উপরে তার ফল হবে শূন্য-যদি মেশিন যত সংখ্যক শ্রমিককে বাজারে ছুড়ে দিয়েছিল, এই মূলধন তত সংখ্যক শ্রমিককে বাজার থেকে তুলে নিতে পারে। যদি তা তার চেয়ে অল্পতর সংখ্যক শ্রমিক নিযুক্ত করে, তাহলে, অনাবশ্যক শ্রমিক-সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। যদি তা তার চেয়ে বৃহত্তর সংখ্যক শ্রমিক নিযুক্ত করে, তা হলে মুক্তিপ্রদত্ত সংখ্যার অতিরিক্ত যত শ্রমিক নিযুক্ত হবে, কেবল তত পরিমাণেই শ্রমের সাধারণ চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং বিনিয়োগ সন্ধানী মূলধন অন্যথা শ্রমের জন্য সাধারণ চাহিদাকে যে-প্রেরণা সঞ্চার করত, তা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই মেশিনের দ্বারা কর্মচ্যুত শ্রমিক-সংখ্যার আয়তন অনুযায়ী নিরাকৃত হয়ে যায়। তার মানে এই যে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রণালী এমন ভাবে সব কিছুর ব্যবস্থাপনা করে যে, মূলধনের অপেক্ষিক বৃদ্ধির সঙ্গে শ্রমের চাহিদায় অনুরূপ কোনো বৃদ্ধি ঘটে না। এবং অতিক্রান্তির কালে যে-শ্রমিকেরা সংরক্ষিত বাহিনীতে নিক্ষিপ্ত হয়, সেই কর্মচ্যুত শ্রমিকদের দুর্দশা, দুর্ভোগ ও সম্ভাব্য মৃত্যুর এটাই নাকি ক্ষতিপূরণ -দালালেরা তাই বলেন। শ্রমের চাহিদা মূলধনের বৃদ্ধির সঙ্গে অভিন্ন নয়; শ্রমের সরবরাহ শ্ৰমিক-শ্রেণীর বৃদ্ধির সঙ্গে অভিন্ন নয়। এটা দুটি স্বতন্ত্র শক্তির পরস্পরের উপরে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার নয়। Les des sont pipes মূলধন একই সময়ে উভয় দিকে কাজ করে। যদি তার সঞ্চয়ন, একদিকে শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি করে, অন্য দিকে, তা তাদের “মুক্তিদান করে শ্রমিকদের যোগানেরও বৃদ্ধি সাধন করে; যখন একই সময়ে কর্মচ্যুত শ্রমিকদের চাপ কৰ্ম-নিযুক্ত শ্রমিকদের বাধ্য করে আরো বেশি করে শ্রম করতে এবং এই ভাবে, শ্রমের যোগানকে শ্রমিকদের যোগান থেকে কিছু মাত্রায় স্বতন্ত্র করে দিতে। শ্রমের যোগান ও চাহিদার নিয়মটির এই ভিত্তিতে কাজ করার ফলে মূলধনের স্বৈরতন্ত্র সম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। সুতরাং, যে-মুহূর্তে শ্রমিকেরা এই গোপন কথাটি জেনে যায় যে, কেমন করে এটা ঘটে যে, যে-মাত্রায় তারা আরো বেশি কাজ করে, অপরের জন্য আরো বেশী সম্পদ উৎপাদন করে, এবং তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ঠিক সেই মাত্রায় এমন কি মূলধনের আয়ু-প্রসারণের উপায় হিসাবেও তাদের কাজ তাদের পক্ষে আরো আরো অনিশ্চিত হয়ে ওঠে; যে-মুহূর্তে তারা আবিষ্কার করে যে, তাদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতার তীব্রতার মাত্রা পুরোপুরি নির্ভর করে আপেক্ষিক উদ্বও জনসংখ্যার চাপের উপরে, যে-মুহূর্তে তারা তাদের শ্ৰেণীর উপরে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের এই স্বভাবসিদ্ধ নিয়মটির সর্বনাশা ফলাফলকে ধ্বংস বা খর্ব করার জন্য ট্রেড-ইউনিয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মরত ও কর্মহীনদের মধ্যে একটি নিয়মিত সহযোগিতা সংগঠিত করতে সচেষ্ট হয়, সেই মুহূর্তে মূলধন ও তার স্তুতিকার ‘রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ব’ যোগান ও চাহিদার এই “শাশ্বত” ও “পবিত্র” নিয়মটিকে লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে চিৎকার শুরু করে। কর্মরত ও কর্মহীনদের যে-কোনো সম্মিলন এই নিয়মটির “সুসামঞ্জস্যপূর্ণ” কর্মধাকে ব্যাহত করে। কিন্তু অন্য দিকে, যে-মুহূর্তে (যেমন, উপনিবেশগুলিতে) প্রতিকূল ঘটনাবলী সংরক্ষিত শিল্প-কর্মী-বাহিনী সৃষ্টির পথে, এবং সেই সঙ্গে ধনিক শ্রেণীর উপরে শ্রমিক-শ্রেণীর চরম নির্ভশীলতার পথে প্রতিবন্ধকতা করে, সেই মুহূর্তে মূলধন ও তার চির-পুরাতন সাঞ্চো পাঞ্জা যোগান ও চাহিদার “পবিত্র” নিয়মটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তার অসুবিধাজনক কর্মধারাকে জোর-জবরদস্তি করে ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সাহায্যে প্রতিহত করতে সচেষ্ট হয়।
