একটি অনাপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার ক্রমবর্ধিষ্ণু উৎপাদন ৩৬৫ মাত্ৰ-তাকেই তা গণ্য করে তার কারণ বলে। যেমন আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি একবার এক নির্দিষ্ট গতিপথে নিক্ষিপ্ত হয়ে সব সময়েই সেটির পুনরাবৃত্তি করে চলে, ঠিক তেমনি সামাজিক উৎপাদনও একবার সম্প্রসারণ ও সংকোচনের পর্যায়ক্রমিক গতিপথে নিক্ষিপ্ত হয়ে তার পুনরাবৃত্তি করে চলে। ফল আবার পরিণত হয় কারণে এবং সমগ্র প্রক্রিয়াটির—যা সর্বদাই তার নিজের অবস্থাবলী পুনরুৎপাদন করে—সেই প্রক্রিয়াটির পরিবর্তনশীল আপতিক ঘটনাগুলি পর্যায়ক্রমিকতার রূপ ধারণ করে। যখন এই পর্যায় ক্রমিকতা একবার সংহত হয়ে যায়, তখন এমনকি রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বও দেখতে পায় যে, একটি আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার উৎপাদন, অর্থাৎ মূলধনের আত্ম-প্রসারণের গড় প্রয়োজনসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে উত্ত, এমন একটি জনসংখ্যার উৎপাদন, আধুনিক শিল্পের একটি আবশ্যিক শত।
এইচ মেরিভেল, যিনি প্রথমে ছিলেন অক্সফোর্ডে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বের অধ্যাপক এবং পরে নিযুক্ত হন কলোনিয়াল অফিস’-এ ( ‘ঔপনিবেশিক কার্যালয়ে’) বলেন, “ধরুন, ধরুন যে, এই ধরনের কোন কোন সংকট উপলক্ষ্যে শত-সহস্র বাড়তি শ্রমিককে দেশান্তরে পাঠিয়ে নিষ্কৃতি পাবার প্রচেষ্টায় জাতিকে তৎপর হতে হত, তার ফলে তার পরিণতি কী হত? পরিণতি হত এই যে, শ্রমের চাহিদা ফিরে আসার শুরুতেই দেখা দিত ঘাটতি। পুনরুৎপাদন যত দ্রুতই হোক না কেন, বয়স্ক শ্রমিকের স্থান পূরণে সব সময়েই এক প্রজন্মের প্রয়োজন হয়। এখন, আমাদের কারখানা-মালিকদের মুনাফা নির্ভর করে সমৃদ্ধির এই মুহূর্তটির সদ্ব্যবহারের ক্ষমতার উপরে, যখন চাহিদা হয় তেজী; এবং এই ভাবে যখন তা মন্দা ছিল, সেই অন্তর্বর্তী কালের ক্ষতিটা পুষিয়ে দেয়। মেশিনারি ও দৈহিক শ্রমের উপরে তাদের কর্তৃত্ব থেকেই তাদের হাতে আসে এই ক্ষমতা। তাদের হাতের কাছে প্রস্তুত থাকতে হবে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মী, তাদের সামর্থ্য থাকতে হবে বাজারের অবস্থা অনুযায়ী তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করার বা হ্রাস করার, অন্যথা তারা পারবেন না প্রতিযোগিতার দৌড়ে তাদের প্রাধান্য বজায় রাখতে, যার উপরে গড়ে ওঠে জাতির সম্পদ।”[৪] এমনকি, ম্যালথাস পর্যন্ত জনবাহুল্যকে স্বীকার করেন আধুনিক শিল্পের আবশ্যিক প্রয়োজন হিসাবে, যদিও তার সংকীর্ণ ভঙ্গিতে তিনি তার ব্যাখ্যা দেন শ্রমজীবী জনসংখ্যার অনাপেক্ষিক অতি-বৃদ্ধি বলে, নির্দিষ্ট প্রয়োজনের তুলনায় আপেক্ষিক সংখ্যাধিক্য বলে নয়। শিল্প ও বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল কোন দেশের শ্রমজীবী শ্রেণীর মধ্যে বিবাহ সম্পর্কে “বাস্তববুদ্ধিজাত অভ্যাস-আচরণ যদি বেশি দূর পর্যন্ত অনুসৃত হয়, তা হলে তা সেই দেশের পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে। : জনসংখ্যার প্রকৃতিই এই রকম যে, একটি বিশেষ চাহিদা পূরণের প্রয়োজনে বাজারে শ্রমিকসংখ্যা বাড়ানো যায় না, যে পর্যন্ত ১৬ থেকে ১৮ বছর পার না হয়; এবং সঞ্চয়ের মাধ্যমে আয়ের মূলধনে রূপান্তর-পরিগ্রহ তার অনেক আগেই ঘটতে পারে; কোন দেশে জন সংখ্যা যে গতিতে বৃদ্ধি পায় তার থেকে টের দ্রুততর গতিতে বৃদ্ধি পেতে পারে শ্রমের ভরণ পোষণের জন্য অর্থ-ভাণ্ডারের পরিমাণ।”[৫] ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের পক্ষে একটি আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার নিরন্তর উৎপাদন যে একটি আবশ্যিক প্রয়োজন, সেটা প্রমাণ করার পরে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এক বয়স্কা আইবুড়ো মহিলার ভঙ্গিতে তার মনের মানুষের মুখে-ধনিকের মুখে—এই কথা কটি বসিয়ে দিল, যা বলা হল তাদের নিজেদেরই সৃষ্ট অতিরিক্ত মূলধনের দ্বারা পথে ছুড়ে-ফেলা শ্রমিকদের লক্ষ্য করে। “আমরা কারখানা-মালিকেরা তোমাদের জন্য যা করা যায়, তা সবই করছি; যে-মূলধন দিয়ে তোমাদের খাওয়া-পরা চলে, তা বাড়াচ্ছি; এখন তোমাদের দায়িত্ব খাওয়া-পরার যে-সংস্থান করা হচ্ছে, তার সঙ্গে তোমাদের সংখ্যাকে মানিয়ে নেওয়া।”[৬]
জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেকে যে-পরিমাণ ব্যবহারযোগ্য শ্রম পাওয়া যায়, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন কখনো সেই পরিমাণটি নিয়ে তৃপ্ত থাকতে পারে না। তার খুশিমত ব্যবহারের জন্য সে চায় এই সব স্বাভাবিক মাত্রা থেকে মুক্ত এক সংক্ষিত শিল্প কর্মীবাহিনী।
এই পর্যন্ত আমরা ধরে নিয়েছি যে, অস্থির মূলধনে বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটে নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যায় বৃদ্ধি বা হ্রাসের সঙ্গে সঠিক সঙ্গতি অনুসারে।
অস্থির মূলধন বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও কিন্তু মূলধনের কর্তৃত্বাধীন শ্রমিকদের সংখ্যা একই থাকতে পারে, এমনকি কমেও যেতে পারে। এটা ঘটে যখন ব্যক্তিগত শ্রমিক অধিকতর পরিমাণ শ্রম দেয় এবং স্বভাবতই, তার মজুরিও বৃদ্ধি পায়; এবং এটা ঘটে যদিও শ্রমের দাম একই থাকে বা এমনকি কমেও যায়–কমে যায় কেবল শ্রমের পরিমাণ যে-গতিতে বৃদ্ধি পায়, তার তুলনায় মন্থরতর গতিতে। এ ক্ষেত্রে অস্থির মূলধনের বৃদ্ধি এখানে অধিক পরিমাণ শ্রমের সূচক কিন্তু অধিকসংখ্যক শ্রমিকের সূচক নয়। খরচ যদি প্রায় সমানই পড়ে, তা হলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম বেশি সংখ্যক শ্রমিকের কাছ থেকে আদায় না করে বরং কম সংখ্যক শ্রমিকের কাছ থেকে আদায় করাই হল ধনিকের পরম স্বার্থ। প্রথম ক্ষেত্রে কর্ম-নিযুক্ত শ্রমের পরিমাণের অনুপাতে স্থির মূলধনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, এই বৃদ্ধি অনেক কম। উৎপাদনের আয়তন যত
