অতএব, এক দিকে, সঞ্চয়নের গতিপথে গঠিত অতিরিক্ত মূলধন তার আয়তনের অনুপাতে আরে, আরো অল্পসংখ্যক শ্রমিককে আকর্ষণ করে। অন্য দিকে, গঠন-বিন্যাসে পরিবর্তন-সহ পর্যায়ক্রমিক ভাবে পুনরুৎপাদিত পুরানো মূলধন তার পূর্ব-নিযু ও শ্রমিকদের আরো আরো অধিক সংখ্যায় প্রতিসারণ করে।
————
১. [৪র্থ সংস্করণে জার্মান টীকা: শিল্পের কোন বিশেষ শাখায় অন্তত পক্ষে সব কয়টি বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানকে কার্যত একচেটিয়া সুবিধাভোগী একটি অতিকায় যৌথমূলধনী কোম্পানীতে ঐক্যবদ্ধ করে সর্ব-সাম্প্রতিক ইংরেজ ও মার্কিন “ট্রাস্টগুলি ইতিমধ্যেই এই লক্ষ্যসাধনে সচেষ্ট হয়েছে।-এফ, এঙ্গেলস। ]
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ ॥ একটি আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার, বা সংরক্ষিত শিল্পকর্মীবাহিনীর ক্রম-বর্ধিষ্ণু উৎপাদন।
আমরা দেখেছি, মূলধনের সঞ্চয়ন, যদিও তা শুরুতে প্রতিভাত হয় কেবল তার পরিমাণগত সম্প্রসারণ বলে, তবু তা সংঘটিত হয় তার গঠনবিন্যাসে ক্রমবর্ধমান গুণমান গত পরিবর্তনের প্রভাবে, তার অস্থির উপাদানের বিনিময়ে স্থির উপাদানের নিরন্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্তির প্রভাবে।[১]
উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট ধনতান্ত্রিক পদ্ধতি, শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতার তদনুযায়ী বিকাশ এবং মূলধনের আঙ্গিক গঠনে তজ্জনিত পরিবর্তন কেবল সঞ্চয়নের অগ্রগতির সঙ্গেই, বা সামাজিক সম্পদের সংবৃদ্ধির সঙ্গেই সঙ্গতি রক্ষা করে না। সেগুলি বিকশিত হয় ঢের বেশি দ্রুততর হারে, কেননা কেবল সঞ্চয়ন, তথা সামাজিক মূলধনের অপেক্ষিক স’ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চলে ব্যক্তিগত মূলধনসমূহের কেন্দ্রীভবন, যা দিয়ে গঠিত হয় মোট মূলধনটি; এবং কেননা অতিরিক্ত মূলধনের প্রযুক্তিগত গঠনে পরিবর্তনের সঙ্গে হাতে হাত দিয়ে চলে প্রারম্ভিক মূলধনের প্রযুক্তিগঠনে অনুরূপ পরিবর্তন। সুতরাং সঞ্চয়নের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অস্থির মূলধনের সঙ্গে স্থির মূলধনের অনুপাত পরিবর্তিত হয়। যদি তা গোড়ায় থাকে ১: ১, তা হলে তা পরপর পরিণত হয় ২: ১, ৩: ১, ৪: ১, ৫: ১, ৭: ১ ইত্যাদিতে, যাতে করে, মূলধন যখন বৃদ্ধি পায়, তখন তার মোট মূল্যের অর্ধেকের পরিবতে, কেবল ১/৩, ১/৪, ১/৫, ১/৬, ১/৮ ইত্যাদি রূপান্তরিত হয় শ্রমশক্তিতে, এবং অন্য দিকে ২/৩, ৩/৪, ৪/৫, ৫/৬, ৭/৮ রূপান্তরিত হয় উৎপাদনের উপায়ে। যেহেতু শ্রমের চাহিদা মূলধনের সমগ্র পরিমাণের দ্বারা নির্ধারিত হয়না, নির্ধারিত হয় কেবল তার অস্থির অংশটির দ্বার, সেই হেতু সেই চাহিদা মোট মূলধন বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে, সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পাবার পরিবতে, আগে যা ধরে নেওয়া হয়েছিল, ক্রমবর্ধমান হারে হ্রাস পায়। মোট মূলধনের আয়তন বাড়ার সঙ্গে, এই চাহিদা সেই আয়তনের অনুপাতে আপেক্ষিক ভাবে কমে যায়-এবং কমে যায় ত্বরান্বিত হারে। মোট মূলধনের বৃদ্ধি ঘটলে তার অস্থির অংশেরও বা তার মধ্যে বিধৃত শ্রমেরও বৃদ্ধি ঘটে—কিন্তু সেই বৃদ্ধি ঘটে নিরন্তর হ্রাসমান হারে। মধ্যবর্তী বিরতিগুলি, যখন সঞ্চন কাজ করে একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত ভিত্তির উপরে উৎপাদনের সরল সম্প্রসারণ হিসাবে—সেই বিরতিল হয় সংক্ষেপিত। এটা কেবল এই নয় যে, মোট মূলধনের ত্বরান্বিত সঞ্চয়ন-নিরন্তর ক্রমবর্ধমান হারে ত্বরান্বিত সঞ্চয়ন–আবশ্যক হয় অতিরিক্ত সংখ্যক শ্রমিকদের নিয়োগের জন্য কিংবা, এমন কি, পুরানো মূলধনের নিরন্তর রূপান্ত-সাধনের প্রয়োজনে উপস্থিত কর্মরত শ্রমিকদেরকে কাজে বহাল রাখার জন্য। এই শ্রম-বর্ধমান সঞ্চয়ন ও কেন্দ্রীভবনই আবার পরিণত হয় মূলধনের গঠন-বিন্যাসে নতুন নোতুন পরিবর্তনের, মূলধনের স্থির অংশের তুলনায় অস্থির অংশের আরো ত্বরান্বিত হ্রস্বতা-প্রাপ্তির উৎস স্বরূপ। মূলধনের অস্থির অংশের এই ত্বরান্বিত আপেক্ষিক হ্রাস-প্রাপ্তি, যা ঘটে থাকে মোট মূলধনের ত্বরান্বিত বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সঙ্গে এবং ঘটে থাকে এই বৃদ্ধি প্রাপ্তির চেয়ে একটি অনাপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার ক্রমবর্ধিষ্ণু উৎপাদন ৩৬১ দ্রুততর গতিতে, তা অন্য মেরুতে ধারণ করে একটি বিপরীত রূপ-শ্রমজীবী জন সংখ্যার বাহ্যতঃ একটি অনাপেক্ষিক বৃদ্ধিপ্রাপ্তির রূপ, এমন একটি বৃদ্ধি যা সব সময়েই ঘটে অস্থির মূলধনের বা, কর্ম-নিযুক্তির উপায়সমূহের বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুততর গতিতে। কিন্তু বস্তুত পক্ষে, ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়ন নিজেই নিরন্তর উৎপাদন করে তার নিজের শক্তি ও মাত্রার প্রত্যক্ষ অনুপাতে-একটি আপেক্ষিক ভাবে অপ্রয়োজনীয় শ্রমিক জনসংখ্যা, অর্থাৎ, মূলধনের আত্মপ্রসারণের গড় প্রয়োজন সাধনের জন্য যে-জনসংখ্যা আবশ্যক, তার চেয়ে বিপুলতর জনসংখ্যা, অতএব, একটি উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা।
সামাজিক মূলধনকে তার সমগ্রতায় বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, তার সঞ্চয়নের গতিশীলতা এখন ঘটায় সময়ক্রমিক পরিবর্তন—বা তাকে প্রভাবিত করে সমগ্র ভাবে, এখন ছড়িয়ে দেয় একই সময়ে তার বিবিধ পর্যায় উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপরে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরল কেন্দ্রীভবনের ফুল হিসাবে মূলধনের গঠনে পরিবর্তন ঘটে তার অনাপেক্ষিক আয়তনে কোন বৃদ্ধি ব্যতিরেকেই; কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূলধনের অপেক্ষিক বৃদ্ধি সংযুক্ত থাকে তার অস্থির উপাদানের অনুপেক্ষিক বা, তার মধ্যে বিধৃত শ্রম শওির, হ্রাসের সঙ্গে; আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূলধন তার নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত ভিত্তির উপরে কিছুকালের জন্য বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সেই বৃদ্ধির অনুপাতে শ্রমশক্তিকে আকর্ষণ করতে থাকে, যখন অন্যান্য সময়ে তা আঙ্গিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, এবং তার অস্থির উপাদানটির হ্রাস সাধন করে; সমস্ত ক্ষেত্রেই মূলধনের অস্থির অংশটির বৃদ্ধি এবং, স্বভাবতই, তার দ্বারা কর্ম-নিযুক্ত শ্রমিক-সংখ্যার বৃদ্ধি সব সময়েই সংযুক্ত থাকে প্রচণ্ড উঠতি-পড় তি ও উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যার স্বল্পস্থায়ী উৎপাদনের সঙ্গে—তা সে কর্মনিযুক্ত শ্রমিকদের প্রতিসারণের অধিকতর প্রকট রূপই ধারণ করুক, কিংবা বিভিন্ন গতানুগতিক পদ্ধতির মাধ্যমে অতিরিক্ত শ্রমিক-জনসংখ্যার কর্মসংস্থানের অল্পতর প্রকট রূপই ধারণ করুক; এই রূপটি অপেক্ষাকৃত কষ্টসাধ্য, তবে অবাস্তব নয়।[২]
