ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ও সঞ্চয়নের বিকাশের সঙ্গে সম-অনুপাতে বিকশিত হয় কেন্দ্রীভবনের দুটি সবচেয়ে শক্তিশালী অনুপ্রেরক-প্রতিযোগিতা ও ঋণ-ব্যবস্থা (ক্রেডিট)। একই সময়ে সঞ্চয়নের অগ্রগতি কেন্দ্রীভবনের প্রতি প্রবণতাসম্পন্ন সামগ্রীকে অর্থাৎ ব্যক্তিগত মূলধন সমূহকে বৃদ্ধি করে, যখন ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের সম্প্রসারণ এক দিকে সৃষ্টি করে সামাজিক অভাব এবং অন্য দিকে সৃষ্টি করে সেই সব বিরাট বিরাট শিল্পোদ্যোগের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উপায়, যে শিল্পোদ্যোগগুলির কর্মসম্পাদনের জন্য আবশ্যক হয় মূলধনের পূর্বতন কেন্দ্রীভবন। সুতরাং আজ আকর্ষণের শক্তি, ব্যক্তিগত মূলধনগুলিকে এক জায়গায় টেনে আনার শক্তি এবং কেন্দ্রীভবনের প্রবণতা যে-কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। কিন্তু কেন্দ্রীভবনের অভিমুখে গতিশীলতার আপেক্ষিক প্রসার ও প্রবলতা যদি কিছু মাত্রায় নির্ধারিত হয় ধনতান্ত্রিক সম্পদের আয়তন এবং ইতিমধ্যে অধিগত অর্থ নৈতিক ব্যবস্থার উৎকর্ষের দ্বারা, তা হলে কেন্দ্রীভবনে অগ্রগতি কোনক্রমেই সামাজিক মূলধনের একটি সদর্থক সংবৃদ্ধির উপরে নির্ভর করে না। এবং এটাই হয় কেন্দ্রীভবন এবং সংকেন্দ্রীভবনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য; সংকেন্দ্রীভবন হল সম্প্রসারিত আয়তনে পুনরুৎপাদনেরই নামান্তর মাত্র। সম্মুখে উপস্থিত মূলধনগুলি বণ্টনে কেবলমাত্র পরিবর্তন থেকেই, সামাজিক মূলধনের গঠনকারী অংশসমূহের পরিমাণগত সন্নিবেশে নিছক রদবদল থেকেই কেন্দ্রীভবনের উদ্ভব ঘটতে পারে। এখানে একটি মাত্র হাতে মূলধন বিরাট বিরাট সমষ্টিতে পুঞ্জীভূত হতে পারে, কেননা ওখানে তা স্থানচ্যুত হয়েছে অনেক অনেক হাত থেকে। যে কোন নির্দিষ্ট শিল্প-শাখায়, কেন্দ্রীভবন তার চরম মাত্রায় পৌছাবে, যদি তাতে বিনিয়োজিত সমস্ত ব্যক্তিগত মূলধনগুলি একটিমাত্র মূলধনে পর্যবসিত হয়।[১] একটি নির্দিষ্ট সমাজে এই মাত্রাটিতে উপনীত হওয়া যায় কেবল তখনি, যখন সমগ্র সামাজিক মূলধন একীভূত হয় একজনমাত্ৰ ধনিকের হাত কিংবা একটিমাত্র ধনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের হাতে।।
শিল্প-ধনিকদের তাদের কর্মপরিধি বিগর সাধনে সক্ষম করে, কেন্দ্রীভবন সঞ্চয়নের কাজটিকে সম্পূর্ণ করে। কর্ম-পরিধির এই বিস্তার-সাধন সঞ্চয়নের বা কেন্দ্রীভবনের পরিণতি হোক বা না হোক, কেন্দ্রীভবন বলপূর্বক অধিকার বিস্তারের প্রচণ্ড প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্পাদিত হোক-সে ক্ষেত্রে কয়েকটি মূলধন অন্যান্য মূলধনের পক্ষে এমন আকর্ষণের অধি-কেন্দ্র হয়ে ওঠে যে, তারা বাকি মূলধনগুলি নিজ নিজ সংহতিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সেই খণ্ড খণ্ড অংশগুলিকে নিজেদের মধ্যে আকর্ষণ করে নেয়কি-বা ইতিমধ্যে গঠিত বা গঠন-প্রক্রিয়ায় নিরত কতকগুলি মূলধনের একত্রী ভবন যৌথ মূলধনী প্রতিষ্টান সংগঠনের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্পাদিত হোক— অথ নৈতিক ফলশ্রুতি কিন্তু হয় একই প্রকার। সবত্রই শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহের বর্ধিত আয়তন হল-সামাজিক ভাবে সংযোজিত ও বিজ্ঞানসম্মত ভাবে সুবিন্যস্ত বিবিধ উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় বহুসংখ্যক শিল্প-সংস্থার যৌথ কাজের আরো ব্যাপক সংগঠনের জন্য, তাদের বস্তুগত সঞ্চলন শক্তিসমূহের আরো ব্যাপক বিকাশ সাধনের জন্য ভাষান্তরে, চিরাচরিত প্রথা-পদ্ধতিতে পরিচালিত বিচ্ছিন্ন উৎপাদন-প্রক্রিয়াগুলির ক্রমবর্ধমান হারে রূপান্তর সাধনের জন্য-সূচনা-বিন্দু।
কিন্তু সঞ্চয়ন, বৃত্তাকায় (সার্কুলার’) রূপ থেকে ঘূর্ণাকার (‘স্পাইরাল’) রূপে অতিক্রমণের কালে পুনরুৎপাদনের দ্বারা মূলধনের ‘মিক বর্ধন, স্পষ্টতই কেন্দ্রীভবনের তুলনায় খুবই মন্তর প্রক্রিয়া; কেন্দ্রীভবনকে যা করতে হয়, তা হল কেবল সামাজিক মূলধনের গঠনকারী অংশসমূহের পরিমাণগত সন্নিবেশসমূহের পরিবর্তন সাধন। পৃথিবীতে অাজও রেলপথ হত না, যদি তাকে প্রতীক্ষা করতে হত কবে কয়েকটি ব্যক্তিগত মূলধন একটি রেলপথ নির্মাণের পক্ষে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপনীত হবে, সেই দিনটির জয়। কেন্দ্রীভবন কিন্তু যৌথমূলধনী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এক নিমেষেই তা করে ফেলল। এবং কেন্দ্রীভবন যখন এইভাবে সঞ্চয়নের ফলাফলকে ঘনীভূত ও ত্বরান্বিত করে, তা আবার সেই সঙ্গে মূলধনের যুক্তিগত গঠন-বিন্যাসে সেই সব বিপ্লবকে ও সারিত ও ত্বরান্বিত করে, যেগুলি তার অস্থির অংশের বিনিময়ে স্থির অংশের বৃদ্ধি সাধন করে এবং এই ভাবে শ্রমের অপেক্ষিক চাহিদার হ্রাস সাধন করে।
কেন্দ্রীভবনের কল্যাণে রাতারাতি একীভূত তাল তাল মূলধন অন্যান্য মূলধনের মতই পুনরুৎপাদন ও পরিবর্ধন করে, কিন্তু তা করে আরো ক্ষিপ্র বেগে এবং এই ভাবে পরিণত হয় সামাজিক সঞ্চয়নের ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী অনুপ্রেরকে। সুতরাং, আজকের দিনে যখন আমরা সামাজিক সঞ্চয়নের কথা বলি, তখন আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তার মধ্যে ধরে নিই কেন্দ্রীভবনের ফুলগুলিকেও।
সঞ্চয়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গঠিত অতিরিক্ত মূলধনসমূহ। চতুর্দশ অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য) কাজ করে বিশেষ ভাবে নোতুন নোতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কার এবং সাধারণ ভাবে শিল্পোন্নয়নের সুযোগ গ্রহণের উপায় হিসাবে। কিন্তু যথাসময়ে পুরানো মূলধনও আপাদমস্তক পুননবীকরণের মুহূর্তটিতে পৌছে যায়, যখন তা তার জীর্ণ চর্ম পরিহার করে অন্যান্যের মত নোতুন জন্ম পরিগ্রহ করে সুসংস্কৃত প্রযুক্তিগত আকারে-যে-আকারে শ্রমের একটি ক্ষুদ্রতর পরিমাণই সক্ষম হবে মেশিনারি কাচা মালের একটি বৃহত্তর পরিমাণকে ক্রিয়াশীল করে তুলতে। এই পুননবীকরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্ৰমণশীল মূলধনসমূহ কেন্দ্রীভবনের কল্যাণে যত উচ্চতর মাত্রায় একত্রে পুঞ্জীভূত হবে, ততই শ্রমের চাহিদায় এক অনাপেক্ষিক হ্রাস প্রাপির পরিমাণ বৃহত্তর হবে।
