প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত মূলধনই হল উৎপাদন-উপায়সমূহের একটি বৃহত্তর বা ক্ষুদ্রতর কেন্দ্রীভবন, যার আধিপত্যে রয়েছে তদনুযায়ী বৃহত্তর বা ক্ষুদ্রতর শ্রমবাহিনী। প্রত্যেকটি সঞ্চয়নই কাজ করে নোতুন সঞ্চয়নের উপায় হিসাবে। মূলধন হিসাবে কাজ করে এমন সম্পদের পরিমাণ-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, সঞ্চয়ন ব্যক্তিগত ধনিকদের হাতে সেই সম্পদের কেন্দ্রীভবনের বৃদ্ধি ঘটায় এবং এই ভাবে বৃহদায়তনে উৎপাদনের এবং ধনতান্ত্রিক বিশেষ পদ্ধতিগুলির ভিত্তিটিকে প্রসারিত করে। বহুসংখ্যক ব্যক্তিগত মূলধনের সংবৃদ্ধির দ্বারা সামাজিক মূলধনের সংবৃদ্ধি সাধিত হয়। বাকি সব কিছু যদি অপরিবর্তিত থাকে, তা হলে ব্যক্তিগত মূলধনসমূহ, এবং তাদের সঙ্গে উৎপাদনের উপায়সমূহের কেন্দ্রীভবন, এমন অনুপাতে বৃদ্ধি পায় যে-অনুপাতে তারা মোট সামাজিক মূলধনের অঙ্গীভূত অংশ রচনা করে। একই সময়ে প্রারম্ভিক মূলধন সমূহের কিছু কিছু অংশ নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে নেয় এবং নোতুন নোতুন স্বতন্ত্র মূলধন হিসাবে কাজ করে। অন্যান্য কারণ ছাড়াও, ধনিক-পরিবারগুলির মধ্যে সম্পত্তি-বিভাজনও এই ব্যাপারে একটি বৃহৎ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। সুতরাং মূলধনের সংবৃদ্ধির সঙ্গে ধনিকদের সংখ্যাও অধিকতর বা অল্পতর মাত্রায় বৃদ্ধি লাভ করে। সঞ্চয়ন থেকে প্রত্যক্ষ ভাবে উদ্ভূত, কিংবা বরং, সঞ্চয়নের সঙ্গে অভিন্ন, এই জাতীয় কেন্দ্রীভবন দুটি বিশেষত্ব দ্বারা চিহ্নিত। প্রথমত, বাকি সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে, ব্যক্তিগত ধনিকদের হাতে সামাজিক উৎপাদন-উপায়সমূহের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন সামাজিক সম্পদের বৃদ্ধির মাত্রা দ্বারা সীমাবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের প্রত্যেকটি বিশেষ ক্ষেত্রে নিবাসিত সামাজিক মূলধনের অংশটি অনেক খনিকের মধ্যে বিভক্ত, যারা পরস্পর-প্রতিযোগ স্বতন্ত্র পণ্যোৎপাদনকারী হিসাবে পরস্পরের মুখোমুখি হয়। সুতরাং সঞ্চয়ন এবং তার সহগামী কেন্দ্রীভবন কেবল বিভিন্ন বিন্দুতেই বিক্ষিপ্ত নয়, উপরন্তু প্রত্যেকটি কর্মরত মূলধনই আবার ব্যাহত হয় নোতুন নোতুন মূলধন গঠন এবং পুরানো মূলধনগুলির উপ-বিভাজনের দ্বারা। সুতরাং, সঞ্চয়ন নিজেকে উপস্থিত করে, এক দিকে, উৎপাদনের উপায়সমূহের, এবং শ্রমের উপরে আধপত্যের, ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন হিসাবে; অন্য দিকে, বহু ব্যক্তিগত মূলধনের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্নভবন হিসাবে।
বহুসংখ্যক ব্যক্তিগত মূলধনে মোট সামাজিক মূলধনের এই বিভাজন কিংবা তার ভগ্নাংশগুলির পরস্পর থেকে বিকর্ষণ প্রতিহত হয় তাদের আকর্ষণের দ্বারা। এই সর্বশেষটি উৎপাদনের উপায়সমূহের এবং শ্রমের উপরে কর্তৃত্বের সেই সরল কেন্দ্রী ভবনটিকে বোঝয় না, যা সঞ্চলনের সঙ্গে অভিন্ন। এটা ইতিপূর্বেই গঠিত মূলধনগুলির কেন্দ্রীভবন, সেগুলির ব্যক্তিগত স্বতন্ত্রতার বিনাশ-সাধন, ধনিক কর্তৃক ধনিকের বে-দখলীকরণ, বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মূলধনের স্বল্পসংখ্যক বৃহৎ মূলধনে রূপান্তরণ। এই প্রক্রিয়াটি পূর্বতন প্রক্রিয়াটি থেকে এইখানে পৃথক যে, এ কেবল ধরে নেয় হস্ত-স্থিত ও কর্মরত এমন মূলধনেরই বণ্টনে পরিবর্তন : সুতরাং এর কর্মক্ষেত্র সামাজিক সম্পদের অনাপেক্ষিক সংবৃদ্ধির দ্বারা, সঞ্চয়নের অনাপেক্ষিক মাত্রার দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। এক জায়গায় একজনের হাতে মূলধন বেড়ে যায় বিপুল পরিমাণে, কেননা অন্য জায়গায়। বহুজন তা হারিয়েছে। এ হচ্ছে যথাযথ কেন্দ্রীভবন, যা সঞ্চয়ন ও সংকেন্দ্রীভবন থেকে বিশিষ্ট।
মূলধনসমূহের এই কেন্দ্রীভবনের, কিংবা মূলধন কর্তৃক মূলধনের আকর্ষণের, নিয়মাবলী বিশ্লেষণের অবকাশ এখানে নেই। কয়েকটি তথ্যের সংক্ষিপ্ত উল্লেখই যথেষ্ট হওয়া উচিত। প্রতিযোগিতার যুদ্ধ যোঝ হয় পণ্যদ্রব্যের দাম সস্তা করে। পণ্যদ্রব্যের দাম সস্তা করার ব্যাপারটি আবার নির্ভর করে, caeteris paribus, শ্রমের উৎপাদনশীলতার উপরে, এবং সেটা আবার নির্ভর করে উৎপাদনের আয়তনের উপরে। সুতরাং বড় বড় মূলধনের হাতে ছোট ঘোট মূলধন মার খায়। আরো মনে রাখা দরকার যে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যবসা-পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত মূলধনের ন্যূনতম পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং ছোট ঘোট মূলধনগুলি সেই সব উৎপাদন-ক্ষেত্রে ভিড় করে, যেগুলিতে আধুনিক শিল্প কেবল বিক্ষিপ্ত ভাবে বা অসম্পূর্ণ ভাবে অধিকার বিস্তার করেছে। এখানে প্রতিযোগিতা, বিরোধী মূলধনগুলির সংখ্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ অনুপাতে এবং সেগুলির আয়তনের সঙ্গে বিপরীত অনুপাতে, আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রতিযোগিতা সব সময়েই শেষ হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধনীর সর্বনাশে, যাদের মূলধন অংশত চলে যায় তাদের বিজেতাদের হাতে, অংশত অন্তর্হিত হয়ে যায়। এ ছাড়াও, ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ অভিনব শক্তির-ঋণ-ব্যবস্থার (ক্রেডিট-সিস্টেম’-এর )* [* এখানে ( “যা তার প্রথম দিককার পর্যায়গুলি” থেকে ৫৭৯ পৃষ্ঠায়“অনাপেক্ষিক হ্রাস-প্রাপ্তির পরিমাণ বৃহত্তর হবে পর্যন্ত) ইংরেজী পাঠ্যাংশটিকে চতুর্থ জার্মান সংস্করণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বদল করা হয়েছে।ইং সং সম্পাদক।]—আবির্ভাব ঘটে, যা তার প্রথম দিককার পর্যায়গুলিতে চোরের মত চুপিসাড়ে প্রবেশ করে সঞ্চয়নের একজন সামান্য সহকারী হিসাবে এবং ব্যক্তিগত বা সমিতিবদ্ধ ধনিকদের হাতে অদৃশ্য সূত্রের সাহায্যে টেনে এনে দেয় গোটা সমাজ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট বা বড় পরিমাণের অর্থ-সম্পদকে; কিন্তু প্রতিযোগিতার যুদ্ধে তা অচিরেই হয়ে ওঠে এক নোতুন ও সাংঘাতিক হাতিয়ার এবং শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হয় মূলধন কেন্দ্রীকরণের একটি বিশাল সামাজিক যন্ত্রে।
