যাই হোক, মূলধনের স্থির অংশটির তুলনায় অস্থির অংশটির এই হ্রাসপ্রাপ্তি, কিংবা মূলধনের এই পরিবর্তিত মূল্য-গঠন তার বস্তুগত উপাদানগুলির গঠনে যে-পরিব ঘটে, কেবল তাই প্রকাশ করে। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, সুতাকলে বিনিয়োজিত মূলধন-মূল্য যদি আজ হয় ৭/৮ স্থির ও ১/৮ অস্থির, তা হলে আঠারো শতকের গোড়ার দিকে, তা ছিল ১/২ স্থির ও ১/২অস্থির; অন্য দিকে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতাকল শ্রম আজ যে-পরিমাণ কাঁচামাল, শ্রম-উপকরণ ইত্যাদিকে উৎপাদনশীল ভাবে পরিভোগ করে ত আঠারো দশকের গোড়ার দিককার তুলনায় বহু শত গুণ বেশি। এর সহজ কারণটি এই যে, শ্রমের ক্রমবর্ধমান উৎপাদনশীলতার সঙ্গে, কেবল যে তার দ্বারা পরিভুক্ত উংপাদন-উপায়গুলির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তাই নয়, সেই সঙ্গে সেগুলির পরিমাণের সঙ্গে তুলনায় সেগুলির মূল্যও হ্রাস পায়। সুতরাং সেগুলির মূল্য বৃদ্ধি পায় পেক্ষিক ভাবে, কিন্তু পরিমাণের সঙ্গে আনুপাতিক ভাবে নয়। অতএব, স্থির মূলধন এবং অস্থির মূলধনের মধ্যকার ব্যবধানে যে-বৃদ্ধি ঘটে, তা স্থির মূলধনে রূপান্তরিত উংপাদন-উপায়-সমূহের পরিমাণ এবং অস্থির মূলধনে পান্তরিত শ্রম শক্তির পরিমাণের মধ্যকার ব্যবধানের তুলনায় অনেক কম ‘ ববর্তী ব্যবধানটি পরবর্তীটির সঙ্গে বৃদ্ধি পায়, তবে অল্পতর মাত্রায়।
কিন্তু সঞ্চয়নের অগ্রগতি যদি মূলধনের অস্থির অংশের আপেক্ষিক আয়তনে হ্রাস ঘটায়, তা করতে গিয়ে, তা কোনমতেই তার অনুপেক্ষিক আয়তনে বৃদ্ধিপ্রাপ্তিকে বাতিল করে দেয় না। ধরা যাক, একটি মূলধন-মূল্যকে প্রথমে ভাগ করা হল ৫০ শতাংশ স্থির মূলধনে এবং ৫০ শতাংশ অস্থির মূলধনে; পরে ৮০ শতাংশ স্থির মূলধনে এবং ২০ শতাংশ অস্থির মূলধনে। যদি ইতিমধ্যে প্রারম্ভিক মূলধন, ধরা যাক, £ ৬, ০০০ বেড়ে দাঁড়ায় ১০,০০০, তা হলে, তার অস্থির অংশও বেড়ে যায়। সেট। ছিল £ ৩,০০০, এখন দাড়াল £ ৩,৬০০। কিন্তু, আগে যেখানে মূলধণের ২০ শতাংশ বৃদ্ধি শ্রমের চাহিদার ২০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটাবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল, এখন শ্রমের চাহিদার এই ২০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটাতে লাগে গোছাকার মূলধনের তিন গুণ।
চতুর্থ বিভাগে দেখানো হয়েছিল, কিভাবে সামাজিক শ্রমের ক’শের পূর্বশত হল হেদায়তনে সহযোগের অস্তিত্ব, কিভাবে এই পূর্বশরে গাছে ‘ভত্তিতে স গঠিত হয় শ্রমের বিভাজন ও স যোজ এবং বিরাট অয়নে সকে করণের ভিত্তিতে সংসাধিত হয় উৎপাদন-উপায়সমূহের ব্যয়স কোচণা; কিভবে শ্রমে সেই নব উপকরণ যেগুলি প্রকৃতিগত ভাবেই যেথ ব্যবহারের উপযোর্গী, যেন মেশিনারি-ব্যবস্থা, সেগুলির অধিব ঘটে; কি ভাবে বিপুল প্রাকৃতিক শক্তিসমূহকে কাজে লাগানো যায়; এবং কি ভাবে উৎপাদনের প্রঞিাকে বিজ্ঞানের একটি প্রয়োগবিদ্যাগত অনুশীলনে রূপান্তবিত করা যায়। উৎপাদনের উপায়সমূহ যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং, যেখানে কারিগর অন্যান্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র ভাবে পণ্য উৎপাদন করে। কিংবা, স্বতন্ত্র ভাবে শিল্প পরিচালনার মত সঙ্গতি নেই বলে, নিজের শ্রমশক্তিকে পণ্য হিসাবে বিক্রয় করে, সেখানে বৃহদায়তন সহযোগ নিজেকে বাস্তবায়িত করতে পারে কেবল ব্যক্তিগত মূলধন-সমূহের বর্ধিত পরিমাণে-রূপায়িত করতে পারে কেবল সেই অনুপাতে, যে অনুপাতে সামাজিক উৎপাদনের উপায়সমূহ এবং জীবনধারণের উপকরণ সমূহ ধনিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়। পণ্যোৎপাদনের ভিত্তি একমাত্র ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই বৃহদায়তন উৎপাদনকে ধারণ করতে পারে। সুতরাং ব্যক্তিগত পণ্যোৎপাদনকারীদের হাতে কিছু পরিমাণ মূলধনের সঞ্চয়ন যথাযথ ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির আবশ্যিক পূর্বশর্ত। অতএব, আমাদের ধরে নিতে হয়েছিল যে, এই সঞ্চয়ন সংঘটিত হয় হস্তশিল্প থেকে ধনতান্ত্রিক শিল্পে অতিক্রমণের কালে। একে বলা যেতে পারে আদিম সঞ্চয়ন, কেননা এটা যথাযথ ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ঐতিহাসিক পরিণতি নয়, ঐতিহাসিক ভিত্তি। স্বয়ং এই আদিম সঞ্চয়নের উৎপত্তি কিভাবে ঘটেছিল, তা আমাদের এখনি অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই। আপাতত এইটুকুই যথেষ্ট যে, এটাই হল সূচনা-বিন্দু। কিন্তু সামাজিক উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই ভিত্তির উপরে বিকশিত সমন্ত কয়টি পদ্ধতিই আবার একই সময়ে উদ্বৃত্ত-মূল্যের বা উদ্ব দ্রব্যের বর্ধিত উৎপাদনের পদ্ধতি, যা আবার সঞ্চয়নের সংগঠনী উপাদান। সুতরাং সেগুলি একই সঙ্গে মূলধন কর্তৃক মূলধনের উৎপাদন, অথবা তার স্বরান্বিত সঞ্চয়নের পদ্ধতি। উদ্বৃত্ত-মূল্যের ক্রমাগত মূলধনে পুনঃ-রূপান্তরণ এখন আত্মপ্রকাশ করে সেই মূলধনটির ক্রমবর্ধমান আয়তনের আকারে, যেটি প্রবেশ করে উৎপাদনের প্রক্রিয়াটির মধ্যে। এটাই আবার হয় উৎপাদনের সম্প্রসারিত আয়তনের সংশ্লিষ্ট শ্রমের উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধি-সাধনের এক উদ্বৃত্ত-মূল্যের ত্বরান্বিত উৎপাদনের ভিত্তি। অতএব, মূলধনের কিয়ৎ মাত্রায় সঞ্চয়ন যদি যথাযথ ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির একটি শর্ত হিসাবে দেখা দেয়, তা হলে এই দ্বিতীয়টি আবার বিপরীত ভাবে ঘটায় মূলধনের ত্বরান্বিত সঞ্চয়ন। সুতরাং, মূলধনের সঞ্চয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিকাশ লাভ করে যথাযথ ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি এবং ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির সঙ্গে বিকাশ লাভ করে মূলধনের সঞ্চয়ন। এই দুটি অর্থনৈতিক উপাদান, পরস্পর পরস্পরকে যে প্রেরণা সঞ্চার করে সেই প্রেরণার মিশ্র অনুপাতে, সংঘটিত করে মূলধনের গঠনে সেই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, যার ফলে স্থির অংশটির সঙ্গে তুলনায় অস্থির অংশটি ক্রমেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়।
