৭. “যাই হোক, কর্মী এবং শ্রমিক উভয়েরই নিয়োগের ক্ষেত্রে সীমা সেই একই তাদের পরিশ্রমের ফল থেকে নিয়োগকর্তার একটা মুনাফা অর্জনের সম্ভাব্যতা। যদি মজুরির হার এমন হয় যাতে মনিবের লাভ মূলধনের গড় মুনাফার চেয়ে কমে যায়, তা হলে সে নিয়োগ করা বন্ধ করে দেবে, কিংবা কেবল এই শর্তে নিয়োগ করবে যে তারা মজুরি-হ্রাসে রাজি থাকবে।” (জন ওয়েড, “হিস্টরি অব দি মিডল অ্যাণ্ড ওয়ার্কিং ক্লাসেস’, ইত্যাদি, তৃতীয় সংস্করণ, লণ্ডন, ১৮৩৫, পৃঃ ২৪১)।
৮. কার্ল মার্কস, এ কন্টিবিউশন টু পলিটিক্যাল ইকনমি পৃঃ ১৬৬ (”zur Kritik der Politischen Oekonomie.”)
৯. “আমরা যদি এখন আমাদের প্রথম অনুসন্ধানটির দিকে ফিরে তাকাই, যেখানে দেখানো হয়েছিল যে স্বয়ং মূলধনই হল মনুষ্য-শ্রমের ফল” এটা সম্পূর্ণ অবোধ্য বলে মনে হয় যে মানুষ তার নিজেরই সৃষ্টির, তথা মূলধনের, আধিপত্যের অধীনস্থ হতে পারে, তার কাছে বশ্যতা মানতে পারে; এবং যেহেতু বাস্তবে এটা একটা তর্কাতীত ঘটনা, সেহেতু প্রশ্ন ওঠে : কিভাবে শ্রমিক মূলধনের স্রষ্টা হিসাবে তার মালিকের অবস্থান থেকে তার গোলামের অবস্থানে অধঃপাতিত হল?” (Von Thunen, “Der isolierte Staat”, Part ii, Section ii Rostock, 1863 pp. 5,6 ) 061 থুনেন-এর গুণ যে তিনি প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করেছেন। তাঁর উত্তরটা কিন্তু একেবারেই বালখিল্যসুলভ।
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ–সঞ্চয়ন ও তার সহগামী সংকেন্দ্রীভবনের অগ্রগতির সঙ্গে যুগপৎ মূলধনের অস্থির অংশের আপেক্ষিক হ্রাসপ্রাপ্তি।
অর্থবিকদের নিজেদেরই মত অনুসারে, সামাজিক সম্পদের বাস্তব পরিমাণ বা কর্মরত মূলধনের আয়তন মজুরি বৃদ্ধি ঘটায় না, কিন্তু কেবল সঞ্চয়নের নিরন্তর অগ্রগতি এবং সেই অগ্রগতির দ্রুততার হারই তা ঘটিয়ে থাকে। (অ্যাডাম স্মিথ, প্রথম খণ্ড, অষ্টম পরিচ্ছেদ)। এই পর্যন্ত আমরা কেবল এই প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ পর্যায় সম্বন্ধেই আলোচনা করেছিযে-পর্যায়টিতে মূলধনের বৃদ্ধি ঘটে মূলধনের একটি প্রযুক্তিগত গঠন অপরিবর্তিত থাকার অবস্থায়। কিন্তু প্রক্রিয়াটি উক্ত পর্যায়কে ছাড়িয়ে যায়।
ধনতান্ত্রিক ব্যবহারের সাধারণ ভিত্তিটি যদি একবার প্রতিষ্ঠা পায়, তা হলে সঞ্চয়নের প্রক্রিয়ায় এমন একটা সময় আসে যখন সামাজিক শ্রমের উৎপাদনশীলতার বিকাশই হয়ে ওঠে সঞ্চয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী অনুপ্রেরক। অ্যাডাম স্মিথ বলেন, “সেই একই কারণটি, শ্রমে মজুরি বাড়ায়, ‘স্টক’ বৃদ্ধি করে, তাই আবার শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অল্প পরিমাণ শ্রমকে দিয়ে অধিক পরিমাণ কাজ উৎপাদনের পক্ষে সহায়তা করে।”
ভূমির উর্বরতার মত প্রাকৃতিক অবস্থাবলী এবং স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন উৎপাদন কারীদের কুশলতা ছাড়াও (উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণের তুলনায় যা প্রকাশ পায়। বরং তার গুণগত উৎকৃষ্টতায়, একটি নির্দিষ্ট সমাজে শ্রমের উৎপাদনশীলতার মাত্রা অভিব্যক্ত হয় উৎপাদন-উপায়সমূহের সেই আপেক্ষিক পরিমাণে, যে-পরিমাণটিকে একজন শ্রমিক একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, একই মাত্রায় শ্রমশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রূপান্তরিত করে উৎপন্ন দ্রব্যে। যে-পরিমাণ উৎপাদন-উপায়সমূহকে সে এই ভাবে, রূপান্তরিত করে, তা তার শ্রমের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ঐ উৎপাদন-উপায়গুলি দ্বৈত ভূমিকা গ্রহণ করে। কতকগুলি উপায়ের বৃদ্ধিপ্রাপ্তি হল
শ্রমের বর্ধিষ্ণু উৎপাদনশীলতার ফল এবং বাকিগুলির বৃদ্ধিপ্রাপ্তি হল তার অন্যতম শর্ত। দৃষ্টান্ত ম্যানুফ্যাকচারে শ্রম-বিভাগের সঙ্গে এবং মেশিনারি ব্যবহারের সঙ্গে, একই সময়ের মধ্যে অধিকতর পরিমাণ কাঁচামাল সংসাধিত হয় এবং সেই কারণে বৃহত্তর পরিমাণ কাঁচামাল ও সহায়ক সামগ্ৰী শ্ৰম-প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। এটা হল শ্রমের বর্ধিষ্ণু উৎপাদনশীলতার ফল। অন্য দিকে, মেশিনারি, ভারবাহী পশু, খনিজ সার, ড্রেন-পাইপ ইত্যাদির সমষ্টি হল শ্রমের বর্ধিষ্ণু উৎপাদনশীলতার একটি শর্ত। বাড়ি-ঘর, ফানেস, পরিবহন ইত্যাদিতে সংকেন্দ্রীভূত মূলধনও এই একই শ্রেণীতে পড়ে। কিন্তু শর্তই হোক আর ফলই হোক, উৎপাদন-উপায়সমূহের সঙ্গে সংবদ্ধ শ্রমের তুলনায়, সেই উপায়সমূহের ক্রমবর্ধমান আয়তনই হচ্ছে শ্রমের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন শীলতার অন্যতম অভিব্যক্তি। সুতরাং শ্রমের উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি আত্মপ্রকাশ করে, তা যে পরিমাণ উৎপাদন-উপায়কে গতিশীল করে, তার অনুপাতে শ্রমের পরিমাণে হ্রাসপ্রাপ্তির মধ্যে কিংবা বিষয়গত উৎপাদনের তুলনায় বিষয়ীগত উপাদানে হ্রাসপ্রাপ্তির মধ্যে।
মূলধনের প্রযুক্তিগত গঠনে এই পরিবর্তন, যে শ্রমশক্তি উৎপাদনের উপায়সমূহের সমষ্টিকে জীবন্ত করে তোলে তার তুলনায় সেই উপায়-সমষ্টি, তা আবার প্রতিফলিত হয় তার মূল্যগঠনে-তার অস্থির উপাদানের বিনিময়ে তার স্থির উপাদানটির বৃদ্ধি সাধন করে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক, শুরুতে একটি মূলধনের শতকরা ৫০ ভাগ বিনিয়োগ করা হল উংপাদন-উপায়ের বাবদে এবং বাকি ৫০ ভাগ শ্রমশক্তির বাবদে; পরবর্তী কালে, শ্রমের উৎপাদনশীলতার বিকাশের সঙ্গে উৎপাদন-উপায় বাবদে বিনিয়োজিত হল শতকরা ৮০ ভাগ এবং শ্রমশক্তি বাদে ২০ ভাগ; এবং এই ভাবেই চলতে থাকল। অস্থির মূলধনের অনুপাতে স্থির মূলধনের ক্রম-বর্ধিত হারে বৃদ্ধি প্রাপ্তির এই নিয়মটি পণ্যদ্রব্যাদির দামের তুলনামূলক বিশ্লেষণের দ্বারা প্রতি পদক্ষেপে প্রমাণিত হয় ( যা আগেই দেখানো হয়েছে তা আমরা বিভিন্ন অর্থ নৈতিক যুগের মধ্যেই তুলনা করি কিংবা একটি যুগে বিভিন্ন দেশের মধ্যেই তুলনা করি না কেন। দামের দুটি উপাদানের মধ্যে একটি উপাদান কেবল উৎপাদন-উপায়সমূহের মূল্যের, তথা পৰিভুক্ত মূলধনের স্থির অংশটির মূল্যের, প্রতিনিধিত্ব করে এবং অন্যটি শ্রমের মজুরি প্রদান করে ( মূলধনের অস্থির অংশ); সঞ্চয়নের অগ্রগতির সঙ্গে প্রথম উপাদানের আপেক্ষিক আয়তনটি যেখানে প্রত্যক্ষ অনুপাতে সম্পর্কিত, অপর উপাদানটির আপেক্ষিক আয়তনটি সেখানে বিপরীত অনুপাতে সম্পর্কিত।
