৫. ইডেন, ঐ, প্রথম খণ্ড, প্রথম অধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ, পৃঃ ১, ২ এবং পূর্বাভাষ পৃঃ ২০।
৬. পাঠক যদি ম্যালথাসের কথা তোলেন, যার এসে অন পপুলেশন’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৯৮ সালে, তা হলে আমি বলব যে এই পুস্তিকাটি তার প্রথম আকারে ডি ফো, স্যার জেমস স্টুয়ার্ট, টাউনসেণ্ড, ফ্র্যাংকলিন, ওয়ালেস প্রমুখের কাছ থেকে ইস্কুলের বালকের মত, ভাসা-ভাসা চৌর্যবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়; তাতে এমন একটা কথাও নেই যা তার নিজের মাথা থেকে বেরিয়েছে। এই পুস্তিকাটি যে বিপুল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে তা স্রেফ দলীয় স্বার্থের কারণে। ফরাসী বিপ্লব যুক্তরাজ্যে পেয়েছিল আবেগো দীপ্ত সমর্থকবৃন্দ; “জনসংখ্যার নীতিটি,” যা অষ্টাদশ শতকে আস্তে আস্তে বিকাশ লাভ করে এবং পরে এক প্রচণ্ড সামাজিক সংকটের মধ্যে ঢাক-ঢোল সহকারে প্রচারিত হয়, কঁদরসেত-এর শিক্ষার অভ্রান্ত প্রতিষেধক হিসাবে, তাকেই ইংরেজ অভিজাত-চক্র সোল্লাসে অভিনন্দিত করল মানবিক অগ্রগতির প্রতি সমস্ত আকাঙ্ক্ষার মহান ধ্বংসকর্তা বলে। নিজের সাফল্যে বিপুল বিস্ময়ে ম্যালথাস তার বইয়ে ঠাসতে লাগলেন ভাসাভাসা ভাবে জড় করা মালমশলা এবং নোতুন নোতুন সামগ্রী, যার কিছুই তার আবিষ্কৃত নয়, সবটাই আত্মীকৃত। আব লক্ষণীয় যে, যদিও ম্যালথাস ছিলেন ইংলিশ স্টেট চার্চ’ এর একজন যাজক, তিনি গ্রহণ করেছিলেন কৌমার্যব্রতের সন্ন্যাসীসুলভ সংকল্প প্রোটেস্ট্যান্ট কেজি ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ’ অজনের অন্যতম শর্ত : “Socios collegiorum maritos esse non permittimus, sed statim postquam quis uxorem duxerit socius collegii desinat esse.” (Fatma wa কেম্বিজ ইউনিভার্সিটি কমিশন,” পৃঃ ১৭২। এই ঘটনা অন্যান্য প্রোটেস্ট্যান্ট যাজকদের তুলনায় ম্যালথাসকে অনুকূল বিশিষ্টতা দান করে; বাকি প্রোটেস্ট্যান্টরা যাজকত্বের কৌমার্যব্রত ঝেড়ে ফেলে দিয়ে গ্রহণ করেছে ফলবান হও এবং বংশ বৃদ্ধি কর”—বাইবেল-ব্যবস্থিত এই ব্রতটিকে এমন এক মাত্রায় যে, একদিকে যখন তারা শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার করছে “জনসংখ্যার নীতি”, অন্যদিকে জনসংখ্যাবৃদ্ধিতে নিজেরা অবদান রাখছে সত্য সত্যই অস্বাভাবিক মাত্রায়। এটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে, মানুষের অর্থ নৈতিক পল, আদমের সেই আপেল, সেই সুতীব্র ক্ষুধা, “সেইসব নিয়ন্ত্রণ যা কামদেবতার শরগুলিকে ভোতা করে দেয়”-যে-ভাবে যাজক টাউনসেণ্ড পরিহাসভরে কথাটা রেখেছেন-এই সকু প্রশ্নটিকে ‘প্রোটেস্ট্যান্ট থিয়োলজি’র বিশেষ করে, প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ’-এর ‘রেভারেণ্ড মহোদয়েরা অতীতেও নিজস্ব একচেটিয়া ব্যাপার করে রেখেছিলেন, এখনো রেখেছেন। ভেনিসের ‘মংক’ ( সন্ন্যাসী অর্টেস, যিনি ছিলেন একজন মৌল ও বুদ্ধিমান লেখক, তিনি ছাড়া অধিকাংশ জনসংখ্যা-নীতিবিষয়ক শিক্ষকেরাই ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক। যেমন, কনার, “Theorie du systeme animal,” Leyde, 1767, যাতে আধুনিক জনসংখ্যাতত্ত্বের সব কিছু নিঃশেষে আলোচিত হয়েছে এবং যাতে কেনে এবং তাঁর শিষ্য, বড় মিরাববার মধ্যে প্রসঙ্গক্রমিক বিরোখ একই বিষয় সম্পর্কে বিবিধ ভা যুগিয়েছে, তারপরে যাজক ওয়ালেস, যাজক টাউনসেও, যাজক ম্যালথাস এবং তার শিষ্য যাজক টমাস চ্যামার্স এবং আরো একগাদা কলম-চালক। গোড়ার দিকে, রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্ব অধ্যয়ন করতেন হবস, লক, হিউম-এর মত দার্শনিকেরা, টমাস মোর, টেম্পল, সাল্লি, ডি উইট,নর্থল, ভ্যাণ্ডেরলিন্ট, ক্যান্টিন, ফ্যাংকলিন-এর মত ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রনীতিবিদেরা, এবং বিশেষ ভাবে বিশেষ সাফল্য সহকারে পেটি, কার্বন, ম্যাণ্ডেভিল, ক্যেনের মত চিকিৎসাবিদেরা। এমনকি ১৮ দশকের মাঝামাঝিও রেভারেণ্ড মিঃ টাকার, তার কালের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, কুবেরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে, এবং, সত্যি কথা বলতে কি, এই “জনসংখ্যা নীতির সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা বেজে উঠল প্রোটেস্ট্যান্ট যাজকদের মঞ্চে প্রবেশের। পেটি, যিনি জনসংখ্যাকে গণ্য করলে। সম্পদের উৎস হিসাবে এবং ছিলেন, অ্যাডাম স্মিথের মতই, যাজকদের শত্রু, বলেন যেন তিনি আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন তাদের তালগোল-পাকানো নাক গলানোর—“ধর্মের সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠা তখনি ঘটে, যখন পুরোহিতরা হন সর্বাপেক্ষা অনুতপ্ত, যেমন আগে বলা হত আইনের ক্ষেত্রে আইনের সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠা তখনি ঘটে, যখন আইনজীবীদের করণীয় কাজ থাকে সর্বাপেক্ষা ন্যূনতম।” তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট পুরোহিতদের উপদেশ দেন, যদি তারা চিরকালের জন্য অ্যাপস্টল পলকে অনুসরণ না করেন এবং কৌমার্যব্রত পালন করে অনুতাপ প্রকাশ না করেন তবে যেন তারা আজকের দিনে যাজক-পদগুলিতে যতসংখ্যক যাজক নিযুক্ত রয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক যাজকের জন্ম না দেন, অর্থাৎ আজ যদি ইংল্যান্ড ও ওয়েলস-এ বারো হাজার যাজক থাকেন, তা হলে তারা যেন ২৪,০০০ যাজকের জন্ম না দেন, কেননা তা হলে যে বারো হাজার জন কোনো পদ পাবে না তারা জীবিকা সন্ধানের চেষ্টা করবে, যা করতে গিয়ে তারা জনগণকে না বুঝিয়ে পারবে না যে এই বারো হাজার গলগ্রহ তাদের আত্মাকে বিষাক্ত করছে বা উপবাসী রাখছে এবং তাদের স্বর্গের পথে ভুল দিক নির্দেশ করছে।” (পেটি, এ ট্রিটিজ অব ট্যাক্সেস অ্যাণ্ড কন্টিবিউশন”, লণ্ডন ১৬৬৭, পৃঃ ৫৭ )। প্রোটেস্ট্যান্ট পুরোহিত-তন্ত্রের প্রতি অ্যাডাম স্মিথের কি মনোভাব ছিল, তা নিচের ব্যাপার থেকে বোঝা যায়। এ লেটার টু এ স্মিথ এল. এল. ডি. অন দি লাইফ, তেম অ্যাণ্ড ফিলজফি অব হিজ ফ্রেণ্ড, ডেভিড হিউম। বাই ওয়ান অব দি পিপল কলঙ্ক ক্রিশ্চিয়ানস” ৪র্থ সংস্করণ অক্সফোর্ড ১৭৮৪ (খ্রষ্টান নামে অভিহিত জনসংখ্যার মধ্যে একজনের দ্বারা অ্যাডাম স্মিথকে লিখিত একটি পত্র : ডেভিড হিউমের জীবন ও মৃত্যু প্রসঙ্গে) নামক লেখাটিতে নরুইচের বিশপ ডঃ হর্ণ অ্যাডাম স্মিথকে ভৎসনা করেন, কেননা মিঃ স্ট্রাহান-এর কাছে লেখা এক প্রকাশিত পত্রে তিনি তাঁর বন্ধু ডেভিড হিউমকে সুবাসিত করেছেন, কেননা তিনি বিশ্বকে বলেছেন কেমন করে হিউম তাঁর মৃত্যুশয্যায় লুসিয়ান এবং হুইস্টকে নিয়ে মজা করতেন, এমনকি হিউম সম্পর্কে তিনি একথা লেখার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন, তিনি যখন জীবিত ছিলেন তখনন এবং তিনি মারা যাবার পরে আমি তাকে সব সময়েই মান্য করেছি একজন পরিপূর্ণ প্রজ্ঞাবান ও ধর্মাত্মা ব্যক্তির আদর্শের সমীপবর্তী বলে।” বিশপ রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে প্রশ্ন করেন, “স্যার, যে-ব্যক্তি ধর্ম বলতে যা কিছু বোঝায়, তার সবকিছুর বিরুদ্ধেই পোষণ করেন অনারোগ্য বিরাগ, তার চরিত্র ও আচরণকে পরিপূর্ণ। প্রজ্ঞাবান ও ধর্মাত্মা’ বলে বর্ণনা করা কি আপনার পক্ষে শোভন হয়েছে? কিন্তু সত্য-প্রেমিকদের নিরুৎসাহ হবার কারণ নেই। নাস্তিকতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।’ (তর নৈতিক বোধের তত্ত্ব দিয়ে সমগ্র দেশে নাস্তিকতা প্রচারের অমার্জনীয় দুর্মতি’ অ্যাডাম স্মিথের হয়েছে। (পৃঃ ১৭) মোটের উপর, ডক্টর, আপনার বক্তব্যটা ভালই; কিন্তু আমার ধারণা, এবারে আপনি সফল হবেন না। ডেভিড হিউমের দৃষ্টান্ত দিয়ে আপনি আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করবেন যে, নাস্তিকতাই অবসাদগ্রস্ত আত্মাদের একমাত্র সঞ্জীবনী এবং মৃত্যুভয়ের যথার্থ প্রতিষেধক। আপনি ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারেন এবং লোহিত সাগরে নিক্ষিপ্ত সুকঠিন ফারাওকে ধন্যবাদ জানাতে পারেন। (ঐ, পৃঃ ২১, ২২)। অ্যাডাম স্মিথের একজন কলেজের বন্ধু, একজন সনাতনপন্থী ব্যক্তি, তাঁর মৃত্যুর পরে লেখেন, ‘হিউমের প্রতি তার সৎ-পাত্রে ন্যস্ত ভালবাসা তার খ্ৰীষ্টান হবার পথে বাধা দেয়। সৎ লোকদের তিনি পছন্দ করতেন এবং তাদের সঙ্গে যখন দেখা হত, তারা যাই বলতেন, তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি যদি সুযোগ্য সুকৌশলী হরক্স-এর বন্ধু হতেন, তিনি হয়তো বিশ্বাস করতেন যে, মেঘ না থাকলেও চাদ মাঝে মাঝে নির্মল আকাশে অদৃশ্য হয়ে যায়। রাজনৈতিক ধ্যানধারণার দিক থেকে তিনি ছিলেন ‘রিপ্লাবিকানিজম’-এর সমর্থক। (দি বী’, জেমস এণ্ডার্সন, ১৮ খণ্ড, তৃতীয় খণ্ডে, পৃঃ ১৬৬, ১৬৫, এডিনবরা, ১৭৯১-৯৩). যাজক টমাস চ্যামার্স সন্দেহ করেন, ঈশ্বরের আঙুর-বাগানে তাদের পূত-পবিত্র কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও অ্যাডাম স্মিথ হয়ত একমাত্র প্রোটেস্ট্যান্ট যাজকদের বোঝাবার জন্যই ‘অৎপাদক শ্রমিক অভিধাটি উদ্ভাবন করেছেন।
