ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের নিয়মটি, যেটি রয়েছে “জনসংখ্যার প্রাকৃতিক নিয়ম” বলে উপস্থাপিত দাবিটির মূলে, সেটি পর্যবসিত হয় কেবল এই বক্তব্যটিতে মূলধনে রূপান্তরিত মজুরি-বঞ্চিত শ্রম এবং এই অতিরিক্ত মূলধনকে গতিশীল করার জন্য। প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মজুরি-প্রদত্ত শ্রম—এই দুয়ের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক ছাড়া মূলধনের সঞ্চয়ন এবং মজুরির হার—এই দুটির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক অন্য কিছু নয়। সুতরাং তা কোনক্রমেই পরস্পর-নিরপেক্ষ দুটি আয়তনের মধ্যে সম্পর্ক নয় : একদিকে, মূলধনের আয়তন, অন্যদিকে শ্রমজীবী জনসংখ্যার আয়তন; এবং মূলতঃ তা একই শ্রমজীবী জনসংখ্যার মজুরি-বঞ্চিত এবং মজুরি-প্রদত্ত শ্রমের মধ্যেকার সম্পর্ক। যদি শ্রমিক শ্রেণী কর্তৃক সরবরাহকৃত এবং ধনিক শ্রেণী কর্তৃক সঞ্চয়-কৃত মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের পরিমাণ এত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি লাভ করে যে, তাকে মূলধনে রূপান্তরিত করতে অতিরিক্ত পরিমাণ মজুরি-প্রদত্ত শ্রমের আবশ্যক হয়, তাহলে, মজুরি বৃদ্ধি পায় এব, বাকি সমস্ত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, মজুরি-বঞ্চিত শ্রম আনুপাতিক ভাবে হ্রাস পায়। কিন্তু -মুহর্তে এই হ্রাসপ্রাপ্তি সেই বিন্দুতে উপনীত হয়, যে-বিন্দুতে যে উদ্বত্ত-শ্রম মূলধনকে পুষ্ট করে তা আর স্বাভাবিক পরিমাণে সরবরাহ হয় না, সেই মুহূর্তে শুরু হয় একটি প্রতিক্রিয়া : আয়ের মূলধনীকৃত অংশ হতে থাকে অল্পতর, সঞ্চয়ন পড়ে থাকে পিছনে এবং মজুরি-বৃদ্ধির গতি-প্রবণতা হয় প্রতিরগ্ধ। সুতরাং মজুরি বৃদ্ধি সেই মাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা কেবল মূলধনের ভিত্তিকেই অটুট রাখে না, সেই সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান হারে পুনরুৎপাদনকেই নিরাপদ রাখে। ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের নিয়মটি, যাকে অর্থতাত্ত্বিকেরা রূপান্তরিত করেছে তথাকথিত একটি প্রাকৃতিক নিয়মে, তা আসলে যা বলে তা কেবল এই যে, সঞ্চয়নের প্রকৃতিই এমন যে, তা শ্রম-শোষণের মাত্রায় প্রতিটি হ্রাস-প্রাপ্তি এবং শ্রমের দামে প্রতিটি বৃদ্ধিপ্রাপ্তি যা ধনতান্ত্রিক সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান আয়তনে ক্রমাগত পুনরুৎপাদনের পথে বিপদ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে নাকচ করে দেয়। যে ব্যবস্থায় বস্তুগত সম্পদের অস্তিত্ব শ্রমিকের বিকাশ সাধনের প্রয়োজন পূরণের জন্য নয়, বরং উটো, শ্রমিকের আস্তত্বই হল উপস্থিত মূল্যসম্ভারের আত্ম-প্রসারণের প্রয়োজন পূরণের জন্য, সেই ব্যবস্থায় অন্য কিছু হতে পারে না। যেমন, ধর্মের ক্ষেত্রে মানুষ তার নিজেরই মস্তিষ্কজাত ধ্যান-ধারণার দ্বারা শাসিত হয়, ঠিক তেমনি ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থায় সে শাসিত হয় তার নিজের হাতে তৈরি দ্রব্যসামগ্রীর দ্বারা।[৯]
————
১. কার্লমার্কস: “A egalite d’oppression des masses, plus un pis a de pouletaires et plus il est riche.” (Colins, “L’Economie Politiqu Source des Revolutions et des Utopies pretendues Socia. listes. Pari১, 1857, t. 1, p. 331.) আমাদের প্রালেতারিয়ান (সর্বহারা’। অর্থনৈতিক দিক থেকে মজুরি-শ্রমিক ছাড়া আর কেউ নয়, যে মূলধন উৎপাদনও বৃদ্ধি করে এবং যে-মুহূর্তে, পেজুয়র যার নাম দিয়েছেন ‘মশিয়ে ক্যাপিট্যাল ( ‘মাননীয় মূলধন’ ), তার আত্মসম্প্রসারণের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হয়ে পড়ে, সেই মুহর্তে যাকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। আদিম অরণ্যের কৃশকায় সর্বহারা হল রশ্চারের একটি সুন্দর কল্পনা। আদিম বনচারী হল আদিম বনের মালিক, এবং ওরাংওটাং-এর মত স্বাধীনতা নিয়ে সে বনকে ব্যবহার করে তার সম্পত্তি হিসাবে। সুতরাং, সে মোটেই সর্বহারা নয়। যদি ঘটনাটা এমন হত যে সে আদিম বনকে শোষণ করছে না, বরং বনই তাকে শোষণ করছে, কেবল তখনি সে ‘সর্বহারা হত। তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে বলা যায় যে, এমন একজন লোক যে কেবল তুলনায় আধুনিক সর্বহারার চেয়ে ভাল হবে, তাই নয়, ‘সিফিলিস’ (উপদংশ) ও ‘ফুল।’ (গণ্ডমালা) ব্যাধিগ্রস্ত উচ্চতর শ্রেণীগুলির চেয়েও ভালই হবে।
২. জন বেলার্স : ‘প্রপোজান্স ফর রেইজিং এ কলেজ অব ইণ্ডাষ্ট্র অব অল ইউজফুল ট্রেড অ্যাণ্ড হাজব্যাণ্ডী, লণ্ডন, ১৬৯৬, পৃঃ ২।
৩. বার্নাদ দ্য মাদেভিল : ‘মৌমাছির উপাখ্যান’, পঞ্চম সংস্করণ, লণ্ডন ১৭২৮। মন্তব্য: পৃঃ ২১২, ২১৩, ৩২৮। “পরিমিত জীবনযাত্রা এবং নিরন্তর কর্মব্যস্ততাই হল গরিবদের পক্ষে যুক্তিসিদ্ধ সুখের” ( যার দ্বারা তিনি সম্ভবত বোঝতে চান দীর্ঘ কর্ম দিবস এবং জীবনধারণের সামান্য উপকরণ) এবং রাষ্ট্রের ঐশ্বর্য ও শক্তির (অর্থাৎ জমিদার, ধনিক এবং তাদের রাজনৈতিক মাতব্বর ও আড়কাঠিদের সরাসরি পথ। (অ্যান এসে অন ট্রেড অ্যান্ড কমার্স’, লণ্ডন, ১৭৭৩, পৃঃ ৫৪)।
৪. ইডেন-এর জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল, তা হলে রাষ্ট্রীয় সংস্থানগুলি’ কার সৃষ্টি? আইন সম্পর্কে এই মোহের দরুন, তিনি আইনকে উৎপাদনের বাস্তব সম্পর্ক সমূহের ফল বলে গণ্য না করে, উলটো বাস্তব সম্পর্কসমূহকেই আইনের ফল বলে গণ্য করেন। মতাস্কুর বিভ্রমমূলক ‘আইনের মর্মবস্তু’-কে লিগুয়েৎ এক কথায় ‘আইনের মর্মবস্তু তথা সম্পত্তি-সম্পর্ক’ বলে উড়িয়ে দেন। Esprit des lois” with one word : “L’esprit des lois, c’est la propriete.”
