এই পর্যন্ত সঞ্চয়নের যে-অবস্থাবলী ধরে নেওয়া হয়েছে, যেগুলি শ্রমিকদের পক্ষে সবচেয়ে অনুকূল, তাতে মূলধনের উপরে তাদের নির্ভরতা একটি সহনীয় আকার, বা ইডেন-এর ভাষায়, একটি “সহজ ও উদার আকার ধারণ করে। মূলধনের অগ্রগতির সঙ্গে অধিক নিবিড়তর না হয়ে, এই নির্ভরতার সম্পর্ক হয় অধিক ব্যাপকতর, অর্থাৎ, নিজের আয়তন ও প্রজাদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মূলধনের শোষণ ও শাসনের সীমানা আরো বিস্তার লাভ করে। তাদের নিজেদের উৎপন্ন সামগ্রীর একটি বৃহত্তর অংশ, সর্বদা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও নিরন্তর অতিরিক্ত মূলধনে রূপান্তরিত হয়ে, তাদের কাছেই ফিরে আসে পাওনা-পরিশোধের উপায়ের আকারে, যাতে করে তারা পারে তাদের ভোগর পরিধির প্রসার সাধন করতে, তাদের পোষাক-আশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদির পরিভোগ-ভাণ্ডারে কিছু সংযোজন করতে এবং তার পরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুরক্ষিত অর্থভাণ্ডার (রিজার্ভ মানিফাণ্ড’) গড়ে তুলতে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত ভাল খাওয়া, পরা ও ব্যবহার এবং অপেক্ষাকৃত বেশি ব্যক্তিগত সম্পত্তি যেমন ক্রীতদাসের শোষণের সামান্যই অবলুপ্তি ঘটাতে পারে, ঠিক তেমনি সেগুলি মজুরি-শ্রমিকের শোষণেরও সামান্যই অপনয়ন ঘটাতে পারে। মূলধনের সঞ্চয়নের ফলে শ্রমের দাম বৃদ্ধি পাবার মানে, বাস্তবিক পক্ষে, কেবল এই যে, শ্রমিক নিজের জন্য যে সোনার শিকল তৈরি করেছে, তার দৈর্ঘ্য ও ওজন-জনিত চাপের কিছুটা উপশম। এই বিষয়টি সম্পর্কে যেসব তর্কবিতর্ক চলেছে, তাতে প্রধান যে জিনিসটি সাধারণ ভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, সেটি হল ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের নিজস্ব পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্য (differentia specifica’)। শ্রমশক্তি আজ বিক্রয় হয় তার সেবা বা উৎপন্ন দ্রব্যের দ্বারা ক্রেতার ব্যক্তিগত অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে নয়। তার উদ্দেশ্য হল তার মূলধনের বৃদ্ধিসাধন, সে যতটা শ্রমের মূল্য দিয়েছে তার চেয়ে বেশি মূল্য ধারণ করে অর্থাৎ যার জন্য তার কিছু মূল্য দিতে হয়নি এমন কিছু শ্ৰম ধারণ করে—এমন পণ্য-সম্ভার উৎপাদন; অথচ যখন সে ঐ পণ্যসামঞ্জ বিক্রয় করে, তখন ঐ মূল্যকে সে নগদে রূপায়িত করে নেয়। এই উৎপাদন-পদ্ধতির সার্বভৌম নিয়ম হল উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন। শ্রমশক্তি যে-মাত্রায় উৎপাদনের উপায়-উপকরণকে তাদের মূলধনের ভূমিকায় সংরক্ষিত করে, তার নিজের মূল্যকে মূলধন হিসাবে পুনরুৎপাদিত করে এবং মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের আকারে অতিরিক্ত মূলধনের একটি উৎসের সংস্থান করে, সেই মাত্রায়ই তা বিক্রয়যোগ্য হয়।[৭] অতএব শ্রমশক্তি বিক্রয়ের শর্তাবলী শ্রমিকের পক্ষে, বেশি বা কম অনুকূল হোক, সেই শর্তাবলীর মধ্যে অন্তভূক্ত থাকে তার নিরন্তর পুনঃবিক্রয়ের এবং মূলধনের আকারে সমস্ত সম্পদের সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদনের আবশ্যিক। আমরা আগেই দেখেছি, স্বভাবগতভাবে মজুরি সর্বদাই সূচিত করে শ্রমিক কর্তৃক কিছু পরিমাণ মজুরি-বঞ্চিত শ্রম-সম্পদান। মোটের উপরে, শ্রমের দাম হ্রাস পাবার সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি ঘটনা-নির্বিশেষে, এই ধরনের বৃদ্ধিপ্রাপ্তি বড় জোর বোঝায় যে, মজুরকে যে-পরিমাণ মজুরি-বঞ্চিত শ্রম দিতে হবে, তা হ্রাস পেয়েছে। মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের এই হ্রাসপ্রাপ্তি কখনো এমন এক মাত্রায় পৌছাতে পারে না, যা গোটা ব্যবস্থাটাকেই বিপন্ন করে। মজুরির হার নিয়ে প্রচণ্ড সংঘ ছাড়া, (এবং অ্যাডাম স্মিথ আগেই দেখিয়েছেন, এই ধরনের সংঘর্ষে, গোটাগুটি ভাবে দেখলে মালিক সব সময়েই মালিক) মূলধনের সঞ্চয়নের ফল হিসাবে শ্রমের দামে কোন বৃদ্ধিপ্রাপ্তির ঘটনা সূচনা করে নিম্নলিখিত বিকল্পটি :
হয়, শ্রমের দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে, কারণ এই বৃদ্ধি সঞ্চয়নের অগ্রগতিকে ব্যাহত করে না। এ ব্যাপারে আশ্চর্যজনক কিছু নেই, কেননা, যে কথা অ্যাডাম স্মিথ বলেন, “এইগুলি (মুনাফাগুলি ) হ্রাস পাবার পরে, ‘স্টক কেবল বৃদ্ধি পেতেই পারে না, বৃদ্ধি পেতে পারে পূর্বের তুলনায় দ্রুততর হারে। বৃহৎ মুনাফা সহ ক্ষুদ্র স্টকের তুলনায় ক্ষুদ্র মুনাফা সহ বৃহৎ স্টক দ্রুততর হারে বৃদ্ধি পায়” (ঐ, পৃঃ ১৮)। এ ক্ষেত্রে এটা পরিষ্কার যে, মজুরি-বঞ্চিত শ্রম হ্রাস পেলে তা কোনক্রমেই মূলধনের রাজ্য-বিস্তারের পথে বাধা সৃষ্টি করে না। নয়তো, অন্য দিকে, শ্রমের দাম বৃদ্ধির ফলে সঞ্চয়ন শ্লথ হয়ে যায়, কারণ লাভের প্রেরণা ভোতা হয়ে যায়। সঞ্চয়নের হার হ্রাস পায়; কিন্তু তা হ্রাস পাবার সঙ্গে, সেই হ্রাসপ্রাপ্তির প্রাথমিক কারণটি, অর্থাৎ মূলধন এবং শোষণযোগ্য শ্রমের মধ্যেকার অনুপাত-বৈষম্যটি, অন্তর্হিত হয়ে যায়। যে প্রতিবন্ধকগুলিকে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-প্রক্রিয়ার যান্ত্রিক প্রণালীটি সাময়িক ভাবে সৃষ্টি করে, সেইগুলিকেই তা আবার অপসারিত করে। শ্রমের দাম আবার মূলধনের আত্মপ্রসারণের প্রয়োজন অনুযায়ী মানে হ্রাস পায়—তা সেই মান মজুরি বৃদ্ধির আগে যে স্বাভাবিক মান চালু ছিল, তা থেকে কমই হোক, বা তার সমানই হোক, বা তার থেকে বেশিই হোক। অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি : প্রথম ক্ষেত্রে, শ্রম শক্তিতে বা শ্রমজীবী জনসংখ্যায় অনাপেক্ষিক বা আনুপাতিক বৃদ্ধির হারে হ্রাস প্রাপ্তির ফলে মূলধনের বাহুল্য ঘটে না; বরং উল্টো, মূলধনের বাহুল্যের ফলেই শোষণযোগ্য শ্রমশক্তির অপ্রতুলতা ঘটে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে, শ্রমশক্তিতে বা শ্রম জীবী জনসংখ্যায় অনাপেক্ষিক বা আনুপাতিক বৃদ্ধির হারে বৃদ্ধিপ্রাপ্তির ফলে মূলধনের অপ্রতুলতা ঘটে না; বরং উল্টো, মূলধনের আপেক্ষিক হ্রাসপ্রাপ্তির ফলেই শোষণযোগ্য শ্রমশক্তি তথা তার দামের, বাহুল্য ঘটে। মূলধনের সঞ্চয়নের এই অনাপেক্ষিক গতি-ক্রিয়াসমূহই শোষণযোগ্য শ্রমশক্তির পরিমাণের আপেক্ষিক গতি-ক্রিয়া হিসাবে প্রতিফলিত হয়। গাণিতিক ভাবে প্রকাশ করলে ব্যাপারটা এইরকম দাড়ায়। সঞ্চয়নের হার সাপেক্ষ পরিবর্ত’ ( variable) নয়, অ-সাপেক্ষ পরিবর্ত’; মজুরির হার অ-সাপেক্ষ পরিবর্ত্য নয়, সাপেক্ষ পরিবর্ত্য। অতএব, শিল্প-চক্র যখন সংকটের পর্যায়ে; তখন পণদ্রব্যাদির দামে সাধারণ অধোগতি প্রকাশ পায় টাকার মূল্যে উর্ধ্বগতির আকারে; আবার সমৃদ্ধির পর্যায়ে পণ্যদ্রব্যাদির দামে সাধারণ উর্ধ্বগতি প্রকাশ পায় টাকার মূলে অধোগতির আকারে। এই থেকে তথাকথিত ‘কারেন্সি স্কুল’ ( ‘মুদ্রা-মতবাদী গোষ্ঠী এই সিদ্ধান্ত করেন যে, বেশি দামের সঙ্গে অত্যল্প*[* এম এস প্রথম ক্ষেত্রেই বলেন “স্বল্প” এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বলেন “অধিক”; যথাযথ ফরাসী অনুবাদ মত সংশোধনী সংযুক্ত হয়েছে-রুশ সংস্করণে ইনষ্টিটিউট অব মার্কসিজম-লেনিনিজম-প্রদত্ত টীকা। ] এবং ক. দামের সঙ্গে অত্যধিক টাকা সঞ্চলনে থাকে। ঘটনা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও সম্পূর্ণ ভুল ধারণার[৮] ক্ষেত্রে এদের সুযোগ্য জুড়ি হল সেই অর্থতাত্ত্বিকেরা, যারা সঞ্চয়নের উল্লিখিত ব্যাপারগুলিকে ব্যাখ্যা করেন এই বলে যে, মজুরি-শ্রমিকদের সংখ্যা এখন অতিরিক্ত কমে গিয়েছে এবং তখন অতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে।
