চিরায়ত অৰ্থত এই ঘটনাটিকে এমন সর্বাঙ্গীণ ভাবে ধরতে পেরেছিল যে, অ্যাডাম স্মিথ, রিকার্ডো প্রমুখ অর্থতাত্ত্বিকেরা, যে-কথা আমরা আগেই বলেছি, উদ্ভ-উৎপন্ন সামগ্রীর সমগ্র মূলধনীকৃত অংশটিকেও উৎপাদনশীল শ্রমিকের পরিভোগর সঙ্গে, কিংবা অতিরিক্ত শ্ৰমিকসংখ্যায় তার রূপান্তরণের সঙ্গে ভুল ভাবে একাকার করে ফেলেছিলেন। সেই ১৯৬ সালেই জনা বেলার্স বলেন, কারো যদি ১,০০০ একর জমি এবং তত হাজার পাউণ্ড টাকা থাকে এবং তত হাজার গবাদি পশু থাকে, কিন্তু কোনো শ্রমিক না থাকে, তা হলে সেই ধনী ব্যক্তিটি শ্রমিক না হয়ে আর কি হবে? এবং যেহেতু শ্রমিকেরাই লোকদের ধনী করে, সেই হেত শ্রমিকের সংখ্যা যত বেশি হবে, ধনীর সংখ্যাও তত বাড়বে গরদের শ্রমই হল ধনকদের ধনের খনি।”[২] অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে বার্ণা দ্য দেভিল-ও একই রকম কথা বলেছিলেন, “যেখানে সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চয়ীকৃত, সেখানে গরিব-ছাড় বাস করার তুলনায় টাকা-ছাড বাস করা সহজতর। কেননা, কাজ করবে কে? যেহেতু গরিবদের অনশন থেকে বাঁচাতে হবে, সেহেতু সঞ্চয় করার মত তারা কিছু পাবে না। যদি এখানে সেখানে সবচেয়ে নীচ শ্রেণীর কোন কেউ অসাধারণ পরিশ্রমের জোরে এবং আধপেটা খেয়ে, সে যে-অবস্থার মধ্যে বড় হয়েছে, সেই অবস্থা থেকে উপরে উঠে আসতে পারে, তা হলে তাকে কারো বাধা দেওয়া হবে না; বরং সমাজে প্রত্যেকটি লোকের পক্ষে, প্রত্যেকটি পরিবারের পক্ষে মিতাহারী হওয়াটাই হল সবচেয়ে বিচক্ষণ পন্থা; কিন্তু সমস্ত ধনী জাতিগুলিরই স্বার্থ এই যে, গরিবদের বিপুলতম অংশ যেন প্রায় কোন সময়েই অলস হয়ে পড়ে না থাকে, এবং যা তারা পায় তাই তারা অনবরত খরচ করে দেয়। যারা তাদের দৈনিক শ্রমের সাহায্যে জীবিকা অর্জন করে, অভাবের তাড়না ছাড়া যাদের কাজে প্রবৃত্ত করার মত আর কিছু নেই, তাদের অভিসম্পাত না করে, তাদের অভাবের উপশমে সাহায্য করাই সুবিবেচনার কাজ; না করাটা হবে নির্বুদ্ধিতা, একমাত্র যে-জিনিসটি শ্রমিককে পরিশ্রমী করে তুলতে পারে, তা হল এমন-পরিমাণ টাকা, যা খুব কমও নয়, আবার খুব বেশিও নয়, কেননা প্রথম ক্ষেত্রে, তার মেজাজ অনুযায়ী সে হয়ে পড়বে নিরুম বা বেপরোয়া, এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সে হয়ে উঠবে উদ্ধত বা আলস্য-পরায়ণ : যা বলা হয়েছে, তা থেকে এটা পরিষ্কার যে, একটা মুক্তজাতিতে-যেখানে ক্রীতদাস-প্রথা অবৈধ, সেখানে—শ্রমশীল গরিব জনসংখ্যার বাহুল্যই হল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পদ। কেননা, তারা কেবল নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর লালনাগারই নয়, তাদের ছাড়া কোনো ভোগ-বিলাসই সম্ভব নয়, এবং কোন দেশের কোনো উৎপন্ন সামগ্রীই হতে পারে না মূল্যবান। “সমাজকে (অর্থাৎ অ-শ্রমিক জনসংখ্যাকে সুখী করার জন্য এবং সবচেয়ে হীন অবস্থার মধ্যেও সাধারণের জীবনকে সুসহ করার জন্য, এটা জরুরি যে তাদের বেশির ভাগই হয় অজ্ঞ ও দরিদ্র; জ্ঞান আমাদের অভাব-বোধের বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য সাধন করে এবং মানুষের লিগা যত কম থাকে তত সহজে তা মেটানো সম্ভব হয়।”[৩] মদেভিল একজন সৎ ও পরিচ্ছন্ন-মস্তিষ্ক ব্যক্তি; কিন্তু তিনি যেটা দেখতে পাননি, সেটা এই যে, সঞ্চয়নের যান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি নিজেই যেমন মূলধনের বৃদ্ধি ঘটায়, তেমন আবার “শ্রমশীল গরিব জনসংখ্যার”-ও বৃদ্ধি ঘটায়—অর্থাৎ বৃদ্ধি ঘটায় তাদের সংখ্যার, যারা তাদের শ্রম শক্তিকে পরিণত করে ক্রমবর্ধিষ্ণু মূলধনের আত্ম-প্রসারণের একটি ক্রমবর্ধমান শক্তিতে, এবং তা করার পরেও, ধনিকের ব্যক্তিরূপে রূপায়িত তাদের নিজেদেরই উৎপন্ন ফলের উপরে, নিজেদের নির্ভরতার সম্পর্ককে বাধ্য হয় চিরস্থায়ী করতে। এই নির্ভরতার সম্পর্ক প্রসঙ্গে, স্যার এফ. এম. ইডেন তার “গরিবদের অবস্থা, ইংল্যাণ্ডে শ্রমজীবী শ্রেণীসমূহের ইতিবৃত্ত” নামক গ্রন্থে বলেন, “আমাদের মৃত্তিকার প্রাকৃতিক ফসল নিশ্চয়ই আমাদের জীবনধারণের পক্ষে যথেষ্ট নয়; পূর্ববর্তী কিছু শ্রমের অবদান ছাড়া আমরা না পারি আমাদের পরিধেয় ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে, না পারি খাদ্যদ্রব্যের সংস্থান করতে। সমাজের অন্ততঃ একটি অংশকে কাজ করতে হবে অবিশ্রান্ত ভাবে।…… অন্যান্যরাও আছে, যারা খাটুনিও খাটেনা, সুতোও কাটে না, অথচ নিয়ন্ত্রণ করে শিল্পোৎপন্ন সামগ্রীসম্ভারকে, যারা অব্যাহতি ভোগ করে কেবলমাত্র সভ্যতা ও শৃংখলার প্রাসাদে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহের তারা বিশেষ জাতীয় সৃষ্টি[৪], যে-সংস্থাগুলি স্বীকার করে নিয়েছে যে, শ্রম না করেও অন্যান্য নানা উপায়ে ব্যক্তি পারে সম্পত্তি অর্জন করতে। স্বতন্ত্র ঐশ্বর্যের অধিকারী ব্যক্তিরা : কোনক্রমেই তাদের উন্নততর ক্ষমতার বলে। উন্নততর সুযোগ-সুবিধার অধিকার ভোগ করে না, তারা তা ভোগ করে প্রায় সমগ্র ভাবেই অপরের পরিশ্রমের ফলে। সমাজের শ্রমজীবী অংশ থেকে ঐশ্বর্যবান ব্যক্তিদের যা বিশিষ্টতা দান করে, তা জমি কিংবা টাকার উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ নয়, তা হল শ্রমের উপরে নিয়ন্ত্রণ। (ইডেনের অনুমোদিত) এই পরিকল্পনা, তাদের জন্য যারা কাজ করে, তাদের উপরে সম্পত্তিবান লোকদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ প্রভাব ও প্রতিপত্তি অর্পণ করবে এবং, সেই সঙ্গে, তা শ্রমিকদের এক নিতান্ত হীন ও দাস-সুলভ অবস্থায় অধঃপাতিত না করে, তাদের স্থাপন করবে এমন এক সহজ ও উদার নির্ভরতার অবস্থানে, যাকে মানব-প্রকৃতি সম্পর্কে ও মানব ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত সমস্ত মানুষই শ্রমিকদের নিজেদের আরামের জন্য আবশ্যক বলে স্বীকার করবেন।[৫] প্রসঙ্গত উল্লেখ যোগ্য যে, স্যার এফ. এম. ইডেন-ই হচ্ছেন অষ্টাদশ শতকে অ্যাডাম স্মিথের একমাত্র শিষ্য যিনি কিঞ্চিৎ গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রচনা করেন।[৬]
