প্রথম পরিচ্ছেদ– মূলধনের গঠন অপরিবর্তিত থেকে, সঞ্চয়নের সহগামী শ্রমশক্তির জন্য বর্ধিত চাহিদা
এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব শ্রমিক শ্রেণীর ভাগ্যের উপরে মূলধনের বিকাশ ও বৃদ্ধির প্রভাব। এই আলোচনায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মূলধনের গঠন এবং সঞ্চয়নের প্রক্রিয়ায় যেসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই গঠন অতিক্রান্ত হয়, সেই পরিবর্তনসমূহ।
মূলধনের গঠনকে বুঝতে হবে দ্বিবিধ অর্থে। মূল্যের দিক থেকে, তা নির্ধারিত হয় যে-অনুপাতে তা বিভক্ত হয় স্থির মূলধন বা উৎপাদন-উপায়সমূহের মূল্য এবং অস্থির মূলধন বা শ্রমশক্তির মূল্য তথা মোট মজুরির মধ্যে, সেই অনুপাতের দ্বারা। বস্তুগত দিক থেকে তা যখন কাজ করে উৎপাদন-প্রক্রিয়ায়, সমস্ত মূলধন তখন বিভক্ত থাকে উৎপাদনের উপায়ে এবং জীবন্ত শ্রমশক্তিতে। এই পরবর্তী গঠনটি নির্ধারিত হয় এক দিকে নিয়োজিত উৎপাদন-উপায়সমূহের পরিমাণ এবং, অন্য দিকে সেগুলির নিয়োজনের জন্য আবশ্যক শ্রমের পরিমাণের মধ্যেকার সম্পর্কের দ্বারা। প্রথমটিকে আমি অভিহিত কৰি মূল্যগত গঠন’ বলে, এবং দ্বিতীয়টিকে প্রযুক্তিগত গঠন’ বলে। দুটির মধ্যে আছে একটি গোপন আন্তঃসম্পর্ক। এই সম্পর্কটি প্রকাশ করতে আমি মূলধনের মূল্যগত গঠনকে যেহেতু তা নির্ধারিত হয় তার প্রযুক্তিগত গঠনের দ্বারা এবং প্রতিবিম্বিত করে প্রযুক্তিগত গঠনের বিবিধ পরিবর্তন, সেই হেতু তাকে আমি অভিহিত করি মূলধনের ‘আঙ্গিক গঠন’ বলে। যখনি আমি আর কোনো বর্ণনা ছাড়া মূলধনের গঠনের কথা উল্লেখ করব, তখনি ধরে নিতে হবে যে, আমি তার আঙ্গিক গঠনের কথাই বলছি।
একটি বিশেষ শিল্প-শাখায় বিনিয়োজিত অনেক আলাদা আলাদা মূলধনের পরস্পর থেকে ভিন্ন ভিন্ন গঠন থাকে। তাদের ভিন্ন ভিন্ন গঠনের গড় থেকে পাওয়া যায় সেই শিল্প-শাখায় বিনিয়োজিত মোট মূলধনের গঠন। সর্বশেষে, উৎপাদনের সমস্ত শাখার গড়গুলির গড় থেকে আবার পাওয়া যায় একটি দেশের মোট সামাজিক মূলধনের গঠন এবং, শেষ পর্যন্ত, একমাত্র এই বিষয়টি নিয়েই আমাদের নিম্নলিখিত অনুসন্ধান।
মূলধনের বৃদ্ধি মানে তার অস্থির উপাদানেরও অর্থাৎ শ্রমশণিতে বিনিয়োজিত অংশটিরও বৃদ্ধি। অতিরিক্ত মূলধনে রূপান্তরিত উদ্বৃত্ত-মূল্যের একটি অংশকে অবশ্যই সব সময়ে অস্থির মূলধনে কিংবা অতিরিক্ত শ্রম-ভাণ্ডারে পুনঃরূপান্তরিত হতে হবে। আমরা যদি ধরে নিই যে, বাকি সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে, মূলধনের গঠনও অপরিবর্তিত থাকে (যার মানে এই যে, উৎপাদনের উপায়-উপকরণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণকে গতিশীল করার জন্য সব সময়ে একই পরিমাণ শ্রমশক্তি ঘাবশ্যক হয়, তা হলে, মূলধনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রম ও শ্রমিকদের জন্য অত্যাবশ্যক সামগ্রী-ভাণ্ডারের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে এবং মূলধন তত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়। যেহেতু মূলধন বাৎসরিক একটি উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন করে, যার একটা অংশ বাৎসরিক প্রারম্ভিক মূলধনের সঙ্গে সংযোজিত হয়; যেহেতু আগে থেকে কর্মরত মূলধনের বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এই সংযোজিত অংশ নিজেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়; সর্বশেষে, যেহেতু, নোতুন নোতুন অভাবের উদ্ভব হবার দরুন নতুন নোতুন বাজার, কিংবা মূলধন বিনিয়োগের নোতুন নোতুন ক্ষেত্র খুলে যাবার মত ঐশ্বর্য সংগ্রহের নোতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবার দরুন, মূলধনে ও আয়ে উদ্বৃত্ত-মূল্যের বিভাজনে কেবলমাত্র একটি পরিবর্তন ঘটিয়েই, সঞ্চয়নের আয়তনকে অকস্মাৎ বৃদ্ধি করা যায়, সেই হেতু মূলধন সঞ্চয়ের প্রয়োজনগুলি শ্রমশক্তির বা শ্রম সংখ্যার বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে; শ্রমিকের চাহিদা শ্রমিকের সরবরাহ ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং, স্বভাবতই, মজুরি বেড়ে যেতে পারে। বস্তুতঃ পক্ষে, উপরে যে অবস্থাগুলি ধরে নেওয়া হয়েছে সেগুলি যদি চলতে থাকে, তা হলে ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত তাই দাঁড়াবে। কারণ যেহেতু প্রতি বছরই তার আগেকার বছর থেকে বেশি সংখ্যক শ্রমিক নিযুক্ত হয়, সেই হেতু, আগে হোক পরে হোক, এমন একটা সময় আসবে, যখন সঞ্চয়নের প্রয়োজন শ্রমের চলতি সরবরাহকে ছাড়িয়ে যাবে এবং তার ফলে মজুরি বৃদ্ধি পাবে। এই ব্যাপার ইংল্যাণ্ডে গোটা পঞ্চদশ শতক এবং অষ্টাদশ শতকের প্রথম অর্ধাংশ জুড়ে একটা বিলাপ শোনা যেত। যে মোটামুটি অনুকূল অবস্থায় মজুরিশ্রমিক-শ্রেণী নিজের ভরণপোষণ ও সংখ্যাবর্ধন করে, তা কোনক্রমেই ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের মৌল চরিত্রে পরিবর্তন ঘটায় না। যেমন সরল পুনরুৎপাদন নিরন্তর স্বয়ং মূলধন-সম্পর্কটিকেই, অর্থাৎ একদিকে ধনিক এবং অন্যদিকে মজুরি-শ্রমিকের মধ্যকার সম্পর্কটিকেই, পুনরুৎপাদিত করে, তেমন ক্রমবর্ধমান হারে পুনরুৎপাদনও অর্থাৎ সঞ্চয়নও, ক্রমবর্ধমান হারে মূলধন-সম্পর্কটিকে পুনরুৎপাদিত করে—এই প্রান্তে বিপুল সংখ্যক বা বৃহত্তর, ধনিক অন্য প্রান্তে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক। একটি বিশেষ পরিমাণ শ্রম শক্তির পুনরুৎপাদন, যা অবশ্যই নিজেকে মূলধনের সঙ্গে সংবদ্ধ করবে ঐ মূলধনটিরই আত্ম-প্রসারণের জন্য, যা মূলধন থেকে মুক্তি পেতে পারে না এবং মূলধনের কাছে যার ক্রীতদাসত্ব প্রচ্ছন্ন থাকে, যাদের কাছে সে আত্ম-বিক্রয় করে, কেবল সেই ব্যক্তিগত ধনিকদের বিভিন্নতার দ্বারা, শ্রমশক্তির এই পুনরুৎপাদন আসলে কিন্তু স্বয়ং মূলধনেরই পুনরুৎপাদনের একটি অত্যাবশ্যক উপাদান রচনা করে। অতএব, মূলধনের সঞ্চয়ন মানেই হল সর্বহারা-শ্রেণীর (প্রোলেটারিয়েট’-এর) আয়তন বৃদ্ধি।[১]
