এই ভাবে ইংরেজ শ্রমিকের কাছ থেকে বাৎসরিক যে পরিমাণ উদ্বৃত্ত-উৎপন্ন সামগ্রী অপচয় করা হয় তছরুপ করা হয়, কেননা তা আদায় করা হয় কোন প্রতিমূল্য না দিয়ে—তা মূলধন হিসাবে ব্যবহৃত হয় ইংল্যাণ্ডে নয়, বিদেশে। কিন্তু এই ভাবে রপ্তানিকৃত বাড়তি মূলধনের সঙ্গে ঈশ্বর এবং বেন্থাম কর্তৃক উদ্ভাবিত এই “শ্রম-ভাণ্ডার” এরও একটা অংশ বিদেশে রপ্তানি হয়ে যায়। [৮]
————
১. তুলনীয় : জেরেমি বেন্থাম, “থিয়োরি অব রিওয়াড অ্যাণ্ড পানিশমেন্ট, ফরাসী সংস্করণ, ১৮২৬।
২. বেন্থাম একটি বিশুদ্ধ ইংরেজি আবির্ভাব। একমাত্র আমাদের দার্শনিক ক্রিশ্চিয়ান উ ব্যতিরেকে কোনো দেশে কোনো কালে এমন ঘরে-তৈরি আটপৌরে জিনিস এমন আত্মগরিমা নিয়ে আস্ফালন করে বেড়ায় না। হেলভেটিয়াস এবং অন্যান্য ফরাসীরা আঠারো শতকে যে-কথা বলে গিয়েছেন সতেজ ভঙ্গিতে, কেবল সেই কথাই তিনি পুনরাবৃত্তি করেছেন নীরস ঢঙে। কুকুরের পক্ষে কি প্রয়োজনীয় তা জানতে হলে কুকুরের প্রকৃতি অনুধাবন আবশ্যক। এই প্রকৃতিটিকে কিন্তু উপযোগিতার নীতি থেকে নিষ্কর্ষিত করা যাবে না। এটা যদি মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা যায়, তা হলে বলতে হয় যে, যে-ব্যক্তি মানুষের সমস্ত ক্রিয়াকলাপ, গতিবিধি, সম্পর্ক ইত্যাদি উপযোগিতার নীতির সাহায্যে পর্যালোচনা করবেন, তার আগে অনুধাবন করতে হবে সাধারণ ভাবে মানব-প্রকৃতি এবং তার পরে প্রত্যেকটি ঐতিহাসিক যুগে তা যেমন ভাবে উপযোজিত হয়েছে, তেমন ভাবে। বেন্থাম সংক্ষেপেই পাট চুকিয়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে নির্জলা সারল্য সহকারে তিনি আধুনিক দোকানদারকে, বিশেষ করে, ইংরেজ দোকানদারকে গ্রহণ করেছেন স্বাভাবিক মানুষ হিসাবে। যা কিছু এই অদ্ভুত লোকটির কাছে এবং তার জগতের কাছে প্রয়োজনীয়, তাই পরম প্রয়োজনীয়। তারপরে, তিনি মানদণ্ডটি প্রয়োগ করেন অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে। দৃষ্টান্ত হিসাবে, খ্রীস্টধর্ম প্রয়োজনীয় কেননা তা ধর্মের নামে সেই একই সব দোষকে নিষেধ করে, যেগুলিকে ‘দণ্ড-বিধি (পেনাল কোড) আইনের নামে দণ্ডনীয় বলে ঘোষণা করে। শিল্পকলাগত সমালোচনা ক্ষতিকারক কেননা, তা মার্টিন টুপার-কে ভোগ করার ক্ষেত্রে গুণী লোকদের মনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এই ধরনের জঞ্জাল দিয়ে, এই বীরপুঙ্গবটি তার নীতি “inulla dies sine linea”-কে মাথায় নিয়ে, বইয়ের পরে বইয়ের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছেন। আমার যদি বন্ধু হাইনরিক হাইন-এর মত সাহস থাকত, তা হলে আমি মিঃ জেরেমিকে অভিহিত করতাম বুর্জোয়া নিবুদ্ধিতার অন্যতম প্রতিভা হিসাবে।
৩. রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিবিদদের একটা প্রবল ঝোঁক হল একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন এবং একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিককে অভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন উৎপাদনশীল উপকরণ হিসাবে …কিংবা অভিন্ন তীব্রতা সহকারে ক্রিয়াশীল হিসাবে গণ্য করার। যারা এই মত পোষণ করেন যে পণ্যসমূহই হল উৎপাদনের একমাত্র উপাদান : তার প্রমাণ করেন উৎপাদন কখনো পরিবর্ধিত করা যায় না, কেননা এই ধরনের পরিবর্ধনের অপরিহার্য শর্ত হল এই যে, খাদ্য, কাচামাল ও হাতিয়ার ইত্যাদি. আগেভাগে বৃদ্ধি করতে হবে; যার কার্যতঃ অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আগেভাগে একবার বৃদ্ধি না ঘটিয়ে কোনো বৃদ্ধি ঘটানো যায় না, তার মানে, যে-কোনো বৃদ্ধি সাধনই অসম্ভব।” (এস বেইলি : “মানি অ্যাণ্ড ভিসিচুডস, পৃঃ ৫৮ এবং ৭০)। বেইলি প্রধানতঃ সঞ্চলন-প্রক্রিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে গোঁড়ামিটার সমালোচনা করেছেন।
৪. জন স্টুয়ার্ট মিল তার “প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকনমি”-তে বলেন, “সত্য সত্যই ক্লান্তিকর, সত্যসত্যই বিরক্তিকর শ্রমই অন্যান্যদের চেয়ে ভাল মজুরি নাপেয়ে, উলটো সর্বত্রই পায় আরো খারাপ মজুরি। কাজটা যত অসহ, ততই এটা নিশ্চিত যে মজুরি হবে সবচেয়ে সামান্য। কাজের কঠোরতা ও উপার্জন যে-কোনো ন্যায়ভিত্তিক সমাজে যা হওয়া উচিত, তাই না হয়ে, অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ভাবে আনুপাতিক না হয়ে, সাধারণত হয় পরস্পরের সঙ্গে বিপরীত ভাবে আনুপাতিক।” ভুল বোঝাবুঝি এড়াবার জন্য, আমি বলতে চাই যে, জন স্টুয়ার্ট মিল-এর মত ব্যক্তিরা যদিও তাদের চিরাচরিত গোঁড়া বিশ্বাসগুলি এবং আধুনিক প্রবণতাগুলির মধ্যে স্ব-বিরোধের জন্য দুষণীয়, তা হলেও তাদের হাতুড়ে অর্থ নৈতিক দালালদের গড্ডালিকার সঙ্গে একই শ্রেণীভুক্ত করলে ভুল হবে।
৫. এইচ ফসেট, কেম্বব্রিজে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বের অধ্যাপক, “দি ইকনমিক পোজিশন অব দি ব্রিটিশ লেবারা,” লণ্ডন, ১৮৬৫, পৃ ১২০।
৬. আমি এখানে পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, “পরিবনীয় (অ-স্থির) ও স্থির মূলধন” অভিধা দুটি আমিই প্রথমে ব্যবহার করেছি। অ্যাডাম স্মিথের কাল থেকে অর্থতত্ত্ব কেবল সঞ্চয়নের প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত স্থির ও আবর্তনশীল মূলধনের মধ্যেকার আনুষ্ঠানিক পার্থক্যের সঙ্গে এই মর্মগত পার্থক্যকে গুলিয়ে ফেলেছে। এই বিষয়ে আরো আলোচনার জন্য তৃতীয় খণ্ড (বাং সং ), দ্বিতীয় বিভাগ দ্রষ্টব্য।
৭. ফসেট, ঐ, পৃঃ ১২২, ১২৩।
৮. বলা যেতে পারে যে কেবল মূলধনই নয়, সেই সঙ্গে শ্রমিকেরাও, দেশান্তর যাত্রীর আকারে, প্রতি বছর ইংল্যাণ্ড থেকে রফতানি হয়। মূল-পাঠে কিন্তু দেশান্তর যাত্রীদের-যাদের বেশির ভাগই শ্রমিক নয়—কোনো সম্পত্তির প্রশ্ন নেই। কৃষি মালিকদের পুত্ররাই তাদের সংখ্যাগুরু অংশ। বিদেশে বাৎসরিক রফতানিকৃত, সুদের বিনিময়ে বিনিয়োগযোগ্য মূলধন বাৎসরিক সঞ্চয়নের যত অনুপাত, তা বাৎসরিক দেশান্তর-যাত্রীরা বাৎসরিক জনসংখ্যা-বৃদ্ধির যত অনুপাত তার তুলনায় বৃহত্তর।
২৫. ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের সাধারণ নিয়ম
পঞ্চবিংশ অধ্যায় — ধনতান্ত্রিক সঞ্চয়নের সাধারণ নিয়ম
