১৪. সিনিয়র ‘ভোগ-সংবরণের মজুরির জন্য পেটেন্ট নেবার অনেক আগেই ম্যাক কুলক ‘অতীত শ্রমের মজুরি’-র জন্য পেটেন্ট নিয়ে সেরেছেন।
.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ —তথাকথিত শ্রম-ভাণ্ডার।
এই তত্ত্ব-জিজ্ঞাসা প্রসঙ্গে আগেই দেখানো হয়েছে, মূলধন একটি নির্দিষ্ট আয়তন নয়, পরন্তু নোতুন উদ্বৃত্ত-মূল্যের আয়ে ও অতিরিক্ত মূলধন বিভাজনের সঙ্গে স্থিতি স্থাপক ও নিরন্তর পরিবর্তনশীল। আরো দেখা হয়েছে যে কর্মরত মূলধনের আয়তন নির্দিষ্ট থাকলেও, তার মধ্যে মূর্তয়িত শ্রমশক্তি, বিজ্ঞান ও ভূমি ( যার দ্বারা অর্থতত্ত্বের ক্ষেত্রে বুঝতে হবে মানুষ থেকে স্বতন্ত্র ভাবে প্রকৃতির দ্বারা প্রদত্ত শ্রমের যাবতীয় অবস্থাবলী) হল মূলধনের স্থিতিস্থাপক ক্ষমতাবলী, যারা তার জন্য খুলে দেয়, কয়েকটি নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে, তার নিজের আয়তন-নিরপেক্ষ একটি কর্মক্ষেত্র। এই তত্ত্বজিজ্ঞাসায় আমরা উপেক্ষা করেছি সঞ্চলন-প্রক্রিয়ার তাবৎ ফলাফল, যা একই পরিমাণে অত্যন্ত বিভিন্ন মাত্রার নৈপুণ্য উৎপাদন করতে পারে। এবং যখন আমরা আগে থেকে ধরে নিয়েছিলাম ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের দ্বারা আবোপিত মাত্ৰাসমূহ, অর্থাৎ ধরে নিয়েছিলাম নিছক স্বতঃস্ফুর্ত বিকাশের ফলে অত্যুদিত একটি রূপে সামাজিক উৎপাদনের একটি প্রক্রিয়া, তখন আমরা উপেক্ষা করেছিলাম উৎপাদনের উপায়সমূহ এবং উপস্থিত নিয়োগ-যোগ্য শ্রমশক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও প্রণালীবদ্ধ ভাবে সংঘটন করা সম্ভব এমন অধিকতর যুক্তিসিদ্ধ কোনো সংযোজন। চিরায়ত অর্থতত্ত্ব সব সময়েই ভালবাসত সামাজিক মূলধনকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নৈপুণ্য-সমন্বিত একটি নির্দিষ্ট আয়তন হিসাবে ধারণা করতে। কিন্তু এই ভুল ধারণাটিকে একটি আপ্ত বাক্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন চূড়ান্ত ফিলিস্তিন সেই জেরেমি বেন্থাম-উনিশ শতকের মামুলি বুর্জোয়া বুদ্ধিমত্তার সেই নীরস, পণ্ডিতম্মন্য, চর্মজি দৈববাণী।[১] কবিদের মধ্যে যেমন মার্টিন টুপার, দার্শনিকদের মধ্যে তেমন বেন্থাম। কেবল ইংল্যাণ্ডেই এমন দুটি সামগ্রীর উৎপাদন সম্ভব ছিল।[২] তাঁর এই আপ্তবাক্যটির আলোয় উৎপাদনের সবচেয়ে মামুলি ব্যাপারগুলি পর্যন্ত, যেমন তার আকস্মিক সম্প্রসারণ ও সংকোচন, এমনকি স্বয়ং সঞ্চয়নও হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ ভাবে অকল্পনীয়।[৩] এই আপ্তবাক্যটিকে বেন্থাম নিজে, ম্যালথাস, জেম্স মিল, ম্যাক্ কুলাক প্রভৃতি ব্যবহার করেছিলেন কৈফিয়ৎ হিসাবে ব্যবহারের জন্য এবং, বিশেষ করে, মূলধনের একটা অংশকে, অস্থির মূলধনকে, অথবা যে অংশ একটি নির্দিষ্ট আয়তন হিসাবে শ্রমশক্তিতে রূপান্তরণীয়, সেই অংশটিকে বোঝাবার জন্য। অস্থির মূলধনের বস্তুগত উপাদান অর্থাৎ শ্রমিকের জন্য যে পরিমাণ প্রাণধারণের উপকরণের তা প্রতিনিধিত্ব করে সেই পরিমাণ কিংবা যাকে বলা হয় “শ্রম-ভাণ্ডার, তাকে বানিয়ে বানিয়ে বর্ণনা করা হয়েছিল সামাজিক সম্পদের এমন একটি আলাদা অংশ হিসাবে, যা প্রকৃতির দ্বারা নির্ধারিত ও অপরিবীয়। সামাজিক মূলধনের যে-অংশ স্থির মূলধন হিসাবে কাজ করবে, তাকে গতিশীল করার জন্য, কিংবা তাকে উৎপাদনের উপায় হিসাবে বস্তুগত রূপে প্রকাশ করার জন্য, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জীবন্ত শ্রমের আবশ্যক হয়। প্রযুক্তিগত ভাবে এই পরিমাণটি নির্দিষ্ট। কিন্তু এই শ্রমশক্তির পরিমাণটিকে তরল করার জন্য কত সংখ্যক শ্রমিক লাগবে তা নির্দিষ্ট নয় (ব্যক্তিগত শ্রমশক্তিকে কি মাত্রায় শোষণ করা হবে, তার উপরে এই সংখ্যা নির্ভরশীল ), এই শ্রমশক্তির দামও নির্দিষ্ট নয়, কেবল তার ন্যূনতম সীমাটাই নির্দিষ্ট, সেটাও আবার অপরিবর্তনীয়। এই আপ্ত বাক্যটির মূলে যেসব ঘটনা রয়েছে, সেগুলি এই : এক দিকে অ-শ্রমিকের উপভোগের উপকরণ এবং উৎপাদনের উপকরণের মধ্যে সামাজিক সম্পদের বিলি-বণ্টনে শ্রমিকের হস্তক্ষেপের কোন অধিকার নেই।[৪] অন্য দিকে, কেবলমাত্র অনুকূল ও অতি বিরল ক্ষেত্রেই ধনবানদের “আয়”-এর বিনিময়ে শ্রমিক পারে তথাকথিত শ্রম-ভাণ্ডারটির বৃদ্ধি সাধন করতে।
শ্রম-ভাণ্ডারে ধনতান্ত্রিক সীমাবন্ধনকে তার প্রাকৃতিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা হিসাবে প্রদর্শনের প্রচেষ্টা থেকে কী ধরনের নির্বোধ পুনরুক্তির জন্ম হয় তার একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে অধ্যাপক ফসেট-এর কথা উদ্ধত করা যায়।[৫] তিনি বলেন, একটি দেশের আবর্তনশীল মূলধন হল তার মজুরি-ভাণ্ডার। সুতরাং, প্রত্যেক শ্রমিকের প্রাপ্ত গড় আর্থিক মজুরিকে যদি হিসাব করতে চাই তা হলে আমাদের কেবল এই মূলধনের পরিমাণটিকে শ্রমিকদের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলেই হবে।[৬] তার মানে দাড়ায় এই যে, আমরা প্রথমে প্রত্যেক শ্রমিককে সত্য-সত্যই যে-মজুরি দেওয়া হয়েছে, সেগুলিকে যোগ করব এবং তার পরে ঘোষণা করব, এই যে যোগফলটা পাওয়া গেল, সেটাই হল শ্রম-ভাণ্ডার”-এর মোট মূল্য—যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং আমাদের হাতে কৃপাভরে তুলে দিয়েছেন স্বয়ং ঈশ্বর ও প্রকৃতি। সর্বশেষে আমরা আবার সেই প্রাপ্ত যোগফলটিকে শ্রমিকদের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করব, যাতে করে প্রত্যেকের ভাগে গড়ে কত করে আসে। এটা অসাধারণ জ্ঞানের পরি চায়ক একটা প্রতারণা। একই নিঃশ্বাসে কিন্তু একথা বলতে মিঃ ফসেট-এর বাধেনা যে, “ইংল্যাণ্ডে যে-মোট পরিমাণ সম্পদ বাৎসরিক বাঁচানো হয়, তা দু-ভাগে বিভক্ত। একটা অংশ মূলধন হিসাবে নিয়োগ করা হয় আমাদের শিল্প-চালনার জন্য এবং বাকি অংশটা রপ্তানি করা হয় বিদেশে। . এই দেশে বাৎসরিক যে-সম্পদ বাঁচানো হয়, কেবল তার একটা অংশই–এবং সম্ভবত সেটা একটা বড় অংশ নয়—বিনিয়োজিত হয় আমাদের নিজেদের শিল্পে।”[৭]
