মূলধনের বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে নিয়োজিত মূলধন এবং পরিভুক্ত মূলধনের মধ্যে পার্থক্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। অন্যভাবে বলা যায়, নিরন্তর-পুনরাবর্তিত উৎপাদন-প্রক্রিয়া গুলিতে দীর্ঘ বা অল্প কালের জন্য কাজ করে অথবা নির্দিষ্ট প্রয়োজন-সাধনের জন্য কাজে লাগে এবং সেই কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেরা কেবল একটু একটু করেই ক্ষয় পায় এবং সেই কারণে নিজেদের মূল্য কেবল টুকরো টুকরো ভাবেই হারায় আর কেবল টুকরো টুকরো ভাবেই সেই মুল্যকে উৎপন্ন সামগ্রীতে স্থানান্তরিত করে, এমন সমস্ত শ্রম-উপকরণের যেমন বাড়ি-ঘর যন্ত্রপাতি নর্দমার পাইপ, কর্ম-নিযুক্ত গবাদিপশু, প্রত্যেক ধরনের হাতিয়ার ইত্যাদির মূল্য ও বস্তুগত পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। উৎপন্ন দ্রব্যটিতে মূল্য সংযোজন না করে, এই সমস্ত শ্রম-উপকরণ যে-অনুপাতে উৎপন্ন-গঠক হিসাবে কাজ করে ঠিক সেই অনুপাতে, অর্থাৎ যে-অনুপাতে সেগুলি সমগ্রভাবে নিযুক্ত অথচ আংশিকভাবে পরিভুক্ত হয়, ঠিক সেই অনুপাতে সেগুলি জল, বাম্প, বাতাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি প্রাকৃতিক শক্তিগুলির মত মুফতে কাজ করে, এটা আমরা আগেই দেখেছি। জীবন্ত শ্রমের দ্বারা যখন অধিকৃত ও আত্ম-সমম্বিত হয়, তখন অতীত শ্রমের এই বিনামূল্য অবদান সঞ্চয়নের অগ্রসরমান পর্যায়গুলির সঙ্গে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।
যেহেতু অতীত শ্রম সর্বদাই মূলধনের ছদ্ম-আবরণে নিজেকে আবৃত রাখে, যেহেতু ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’, ইত্যাদির শ্রমের নিষ্ক্রিয় ভাগ অ-শ্রমিক ‘হ’,এর সক্রিয় ভাগের রূপ পরিগ্রহ করে, সেহেতু বুর্জোয়া ও রাষ্ট্রীয় অর্থতাত্ত্বিকরা মৃত ও গত শ্রমের অবদানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, স্কচ-মনীষী ম্যাক-কুলক-এর মতে যার পাওয়া উচিত সুদ, মুনাফা ইত্যাদির আকারে একটা বিশেষ পারিশ্রমিক।[১৪] উৎপাদনের উপায়-উপকরণের রূপের আড়ালে অতীত শ্রম জীবন্ত শ্রম-প্রক্রিয়াকে যে বলিষ্ঠ ও চির-বর্ধিষ্ণু সহায়তা দান করে তা এই কারণে অতীত শ্রমের সেই রূপটিতে আরোপিত হয়, যে-রূপটিতে তা, মজুরি-বঞ্চিত শ্রম হিসাবে, স্বয়ং শ্রমিক থেকেই বিচ্ছিন্নকৃত অর্থাৎ আরোপিত হয় তার ধনতান্ত্রিক রূপটিতে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের বাস্তব প্রতিনিধিরা এবং তাদের মতলববাজ তত্ত্ববাগীশরা উৎপাদনের উপায়সমূহকে সেগুলির অধুনা-পরিহিত ছদ্মবেশ থেকে আলাদা করে ভাবতে পারে না, যেমন গোলাম-মালিক গোলামকে ভাবতে পারে না গোলাম হিসাবে তার চরিত্র থেকে আলাদা করে ভাবতে।
শ্রমশক্তি শোষণের মাত্রা নির্দিষ্ট থাকলে, উৎপাদিত উদ্বৃত্ত মূল্যের পরিমাণ নির্ধারিত হয় যুগপৎ-শোষিত শ্রমিকদের সংখ্যা দিয়ে; এবং বিচ্ছিন্ন অনুপাতে হলেও, তা মূলধনের আয়তনের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে। সুতরাং উত্তরোত্তর সঞ্চয়নের দ্বারা মূলধন যত বৃদ্ধি পায়, পরিভোগ-ভাণ্ডার ও সঞ্চয়ন-ভাণ্ডারের মধ্যে বিভক্ত মূল্য তত বৃদ্ধি পায়। সুতরাং, তখন ধনিক আরো স্ফুর্তিবাজ জীবন যাপন করতে পারে এবং সেই সঙ্গে আরো “ভোগ-সংবরণ” প্রদর্শন করতে পারে। এবং সর্বশেষে, অগ্রিম প্রদত্ত মূলধনের পরিমাণের সঙ্গে উৎপাদনের আয়তন যত বিস্তার লাভ করে, ততই উৎপাদনের সমস্ত স্প্রিংগুলি অধিক স্থিতিস্থাপকতাসহ কাজ করে।
————
১. রিকার্ডো বলেন, “সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে মূলধনের সঞ্চয়ন কিংবা শ্রমের নিয়োগ” (অর্থাৎ শোষণ) ‘মোটামুটি দ্রুতগতি এবং সর্ব ক্ষেত্রেই তা নির্ভর করে শ্রমের উৎপাদনক্ষমতার উপরে। শ্রমের উৎপাদনক্ষমতা সাধারণত সেখানেই সর্বাধিক যেখানে থাকে উর্বর জমির প্রাচুর্য। যদি প্রথম বাক্যটিতে শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতার অর্থ হয় কোনো উৎপন্নের সেই একাংশের স্বল্পতা যা যায় তাদের কাছে যাদের দৈহিক শ্রম তাকে উৎপন্ন করেছে, তা হলে বাক্যটি প্রায় অভিন্ন, কেননা বাকি একাংশ হল সেই তহবিল যা থেকে মূলধন সঞ্চয়ীকৃত হতে পারে, যদি মালিক ইচ্ছা করে। কিন্তু যেখানে সবচেয়ে বেশি উর্বর জমি আছে, সেখানে এটা সাধারণতঃ ঘটেনা।” (“অবজার্ভেশনস অন সার্টেন ভাবল ডিসপিউটস, ইত্যাদি” ৭৪, ৭৫)।
২. জন স্টুয়ার্ট মিল, “এসেজ অন সাম আনসেটেল্ড কোশ্চেনস অব পলিটিক্যাল ইকনমি,” লণ্ডন, ১৮৪৪, পৃঃ ৯০।
৩. “অ্যান এসে অন ট্রেড অ্যাণ্ড কমার্স,”লণ্ডন, ১৭৭৩, পৃঃ ৪৪।” ১৮৬৬-র ডিসেম্বর এবং ১৭৬৭-র জানুয়ারিতে ‘টাইমস’ অনুরূপ ভাবে ইংরেজ খনিমালিকের কিছু কিছু মানসিক উচ্ছাস প্রকাশ করে, যাতে চিত্রিত করা হয় বেলজিয়ান খনি-শ্রমিকদের সৌভাগ্য, যারা তাদের “মনিবদের প্রয়োজনে বেঁচে থাকার জন্য যা একান্ত আবশ্যক, তার চেয়ে বেশি কিছু চায়নি এবং পায়নি। বেলজিয়ান শ্রমিকদের অনেক কষ্ট সহ্ন করতে হত কেবল ‘টাইমস পত্রিকায় তাদের “মডেল শ্রমিক হিসাবে স্থান পাবার জন্য ! তারপরে ১৮৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এল জবাব : মার্সিয়েন-এ বেলজিয়ান খনি-শ্রমিকদের ধর্মঘট, যা দমন করা হল গুলির মুখে।
৪. ঐ, পৃঃ ৪৪-৪৬।
৫. নর্দাম্পটনশায়ারের ম্যানুফ্যাকচারার একটি সাধু প্রতারণা করেন। যার হৃদয় এত পরিপূর্ণ, তার এইটুকু প্রতারণা ক্ষমা করা যায়। তিনি নামে ইংরেজ এবং ফরাসী কাৱখানা-শ্রমিকদের জীবন তুলনা করার কথা বলেন কিন্তু আসলে, একমাত্র উদ্ধৃত কথাগুলিতে দেখা যাবে, তিনি চিত্রিত করেছেন ফরাসী কৃষি-শ্রমিকদের জীবন এবং সেটা তিনি তার নিজের গোলমেলে ঢঙে স্বীকারও করেছেন।
