শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতার বিকাশ উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় বিনিযুক্ত প্রারম্ভিক মূলধনের উপরেও প্রতিক্রিয়া ঘটায়। কর্মরত স্থির মূলধনের একটা অংশ গঠিত হয় মেশিনারি ইত্যাদি শ্রম-উপকরণ দিয়ে যেগুলি পৰিভুক্ত হয়ে যায় না, এবং সেই কারণে পুনরুৎ পাদিত কিংবা একই রকমের নোতুন মেশিনারি দিয়ে প্রতিস্থাপিতও হয় না—দীর্ঘ কালের ব্যবধান ছাড়া। কিন্তু প্রত্যেক বছরই ঐসব শ্রম-উপকরণের একটি অংশ ক্ষয় পায় বা তার উৎপাদনী কর্মক্ষমতার সীমায় পৌছে যায়। সুতরাং সেই বছরে তা উপনীত হয় তার কালক্রমিক পুনরুৎপাদনের, একই রকমের নতুন মেশিনারি দিয়ে প্রতিস্থাপনের, নির্দিষ্ট সময়ে। এই সব শ্রম-উপকরণ ক্ষয়প্রাপ্ত হবার কালে, যদি শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেড়ে গিয়ে থাকে ( এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অবিরত অগ্রগতির সঙ্গে তা ক্রমাগত বেড়ে যায়, তা হলে আরো নিপুণ এবং সেগুলির বর্ধিত নৈপুণ্যের বিচারে) আরো সন্তা মেশিন, টুল, অ্যাপারেটাস ইত্যাদি পুরানোগুলির বদলে স্থান গ্রহণ করে। আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে এমন সব শ্রম-উপকরণে নিরন্তর প্রত্যংশ উন্নয়ন ছাড়াও পুরানো মূলধন আরো উৎপাদনশীল রূপে পুনরুৎপাদিত হয়। স্থির মূলধনের অন্য অংশটি, কাঁচামাল ও সহায়ক সামগ্ৰীসমূহ এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নিরন্তর পুনরুৎপাদিত হয়; কৃষিকর্মের দ্বারা উৎপাদিত কাঁচামাল ও সহায়ক সামগ্রীগুলির বেশির ভাগটাই পুনরুৎপাদিত হয় বাৎসরিক। সুতরাং উৎপাদন পদ্ধতিতে প্রবর্তিত প্রতিটি উন্নয়ন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কাজ করে নোতুন ও আগে থেকেই কার্যরত মূলধনের উপরে। রসায়ন-বিজ্ঞানে প্রতিটি অগ্রগতি কেবল বিবিধ উপযোগী বস্তু এবং উপযোগী পদ্ধতির পূর্ব-পরিজ্ঞাত প্রয়োগসমূহের সংখ্যাই বহুগুণিত এবং এই ভাবে মূলধনের বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সঙ্গে তার বিনিয়োগ-ক্ষেত্রের বিস্তার সাধন করেনা। সেই সঙ্গে তা শেখায় কিভাবে উৎপাদন, ও পরিভোগ প্রক্রিয়াদ্বয়ের নিঃসারিত আবর্জনাকে পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়ার আবর্তনে পুনরায় নিক্ষেপ করা যায়, এবং এই ভাবে, তা মূলধনের কোনো প্রাকৃ-বিনিয়োগ ছাড়াই মূলধনের জন্য নোতুন সামগ্রী সৃষ্টি করে। কেবলমাত্র শ্রমশক্তির তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের বর্ধিত নিষ্কর্ষণের মত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা মূলধনকে দান করে এমন এক সম্প্রসারণ-ক্ষমতা যা কর্মক্ষেত্রে কর্মরত মূলধনের নির্দিষ্ট আয়তনের উপরে অনির্ভর। সেই সঙ্গে সেগুলি আবার প্রারম্ভিক মূলধনের উপরেও প্রতিক্রিয়া ঘটায়—যে মূলধন তার পুননবী-ভবনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন আকারে অতিক্রমণের পথে, তা, তার পুরানো আকার যখন পরিভুক্ত হচ্ছিল, সেই সময়ে সংঘটিত সামাজিক অগ্রগতিকে মুফতে আত্মকৃত করে নেয়। অবশ্য, উৎপাদন-ক্ষমতার এই বিকাশের সঙ্গে ঘটে কর্মরত মূলধনের আংশিক অপচয়। যতটা পর্যন্ত এই অপচয় প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে তীব্রভাবে অনুভূত করায়, ততটা পর্যন্ত বোঝাটা পড়ে শ্রমিকের কাধে কেননা এমিকের উপরেই শোষণের ভার আরো বাড়িয়ে ধনিক তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়।
নিজের বারা পরিভুক্ত উৎপাদন-উপকরণের মূল্য শ্রম তার উৎপন্ন দ্রব্যে সঞ্চারিত করে। অন্য দিকে, শ্রম যত উৎপাদনশীল হয়, ততই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের আরা গতি-সঞ্চারিত উৎপাদন-উপকরণের মূল্য ও পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। যদিও একই পরিমাণ শ্রম সব সময়েই তার উৎপন্নসামগ্রীতে যোজনা করে কেবল একই পরিমাণ নোতুন মূল্য, তবু শ্রম-উৎপন্ন সামগ্রীতে যে পুরাতন মূলধন-মূল্য সঞ্চারিত করে, তা শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে বৃদ্ধি পায়।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ, একজন ইংরেজ একজন চীনা সুতো-কাটুনি একই তীব্রতা সহকারে একই সংখ্যক ঘণ্টা কাজ করতে পারে; তা করলে, তারা দুজনে এক সপ্তাহে সমান সমান মূল্য সৃষ্টি করবে। কিন্তু এই সমতা সত্ত্বেও, ইংরেজ লোকটির সাপ্তাহিক উৎপাদনের মূল্য এবং চীনা লোকটির সাপ্তাহিক উৎপাদনের মূল্যের মধ্যে ঘটবে বিপুল পার্থক্য, কারণ যেখানে ইংরেজটি কাজ করে বিরাট এক অটোমেশন দিয়ে, সেখানে চীনাটির আছে কেবল একটি চরকা। যে সময়ে চীনা লোকটি কাটে এক পাউণ্ড তুলে, সেই সময়ের মধ্যে ইংরেজ লোকটি কাটে কয়েক শ পাউণ্ড। তত বহু শতগুণ এবং বৃহৎ পুরানো মূল্যসমূহের একটি অঙ্ক তার উৎপন্ন সামগ্রীর মূল্যকে স্ফীত করে যাতে করে নোতুন ও উপযোগপূর্ণ রূপে ঐ মূল্যগুলির পুনরাবির্ভাব ঘটে এবং এইভাবে মূলধন হিসাবে নোতুন করে কাজ করতে সক্ষম হয়। যে কথা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস আমাদের জানান, ১৭৮২ সালে ইংল্যাণ্ডে পূর্ববর্তী তিন বছরের গোটা উল-উৎপাদনটাই শ্রমিকের অভাবে অস্পৃষ্ট অবস্থায় পড়েছিল, এবং অবশ্যই ঐ একই ভাবে পড়ে থাকত যদি না নোতুন উদ্ভাবিত মেশিনারি তার সাহায্যে আসত এবং তাকে সুতোয় পরিণত করত।”[১২] যদিও মেশিনারির আকারে মূর্তায়িত শ্রম সরাসরি একটি মানুষকেও উজ্জীবিত করতে অক্ষম ছিল, তবু তা সফল হয়েছিল অপেক্ষাকৃত অল্পতর জীবন্ত শম যোজনা করে, এক ক্ষুদ্রতর সংখ্যক শ্রমিককে সেই উলকে উৎপাদনশীল ভাবে ব্যবহার ও তার মধ্যে নোতুন মূল্য সঞ্চার করতে, এবং কেবল তাই নয়, সেই সঙ্গে সুতো ইত্যাদির আকারে তার পুরানো মূল্যও সংরক্ষণ করল, সেই সঙ্গে তা উলের পুনরুৎপাদনে বৃদ্ধি ঘটাল এবং প্রেরণা সঞ্চার করল। জীবন্ত শ্রমের স্বাভাবিক ধর্মই এই যে, তা নতুন মূল্য সৃজনের সঙ্গে পুরানো মূল্যকেও সঞ্চারিত করে। উৎপাদনের উপায়-উপকরণের ফলপ্রসূতা, বিস্তার ও মূল্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সঙ্গে এবং কাজে কাজেই, তার বিকাশের সহগামী যে সঞ্চয়ন, তার সঙ্গে শ্রম চির-নোতুন রূপে সদা-বর্ধমান মূলধন-মূল্যকে সংরক্ষিত করে ও চিরন্তনতা দান করে।[১৩] শ্রমের এই স্বাভাবিক ক্ষমতা, যে-মূলধনের সঙ্গে তা সংবদ্ধ, সেই মূলধনের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর চেহারা ধারণ করে, ঠিক যেমন খনিকের সামাজিক শ্রমের উৎপাদনশীল শক্তিসমূহ মূলধনের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর চেহারা ধারণ করে, ঠিক যেমন ধনিকদের দ্বারা উত্তমের নিরন্তর আত্মীকরণ মূলধনের নিরন্তর আত্মসম্প্রসারণের চেহারা ধারণ করে।
