যদিও শিল্পের সমস্ত শাখাতেই শ্রমের উপকরণসমূহ দিয়ে গঠিত মূলধনের স্থির অংশটি একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিকের পক্ষে (কাজটির আয়তনের দ্বারা যা নির্ধারিত হবে), তা হলেও নিযুক্ত শ্রমের পরিমাণ-বৃদ্ধির সঙ্গে তা সব সময়ে আবশ্যিক ভাবে একই অনুপাতে বৃদ্ধি পায় না। ধরা যাক, একটি কারখানায় ১০০ জন শ্রমিক দৈনিক প্রত্যেকে ৮ ঘণ্টা করে কাজ করে ৮০০ ঘণ্টা কাজ দেয়। যদি ধনিক এই অংককে আরো অর্ধেক বাড়াতে চায়, সে আরো ৫০ জন কর্মীকে নিযুক্ত করতে পারে, কিন্তু সেক্ষেত্রে তাকে আরো মূলধন আগাম দিতে হবে কেবল মজুরি বাবদেই নয়, শ্রমের উপকরণ বাদেও। অবশ্য সে ঐ ১০০ শ্রমিককে ৮ ঘণ্টার বদলে ১২ ঘণ্টা করেও কাজ করাতে পারে এবং তা করলে শ্রমের যে-উপকরণগুলি হাতে আছে তাতেই কাজ চলবে। এইগুলি কেবল তখন আরো দ্রুত বেগে পরিভুক্ত হবে। এই ভাবে মূলধনের স্থির অংশটিতে আনুষঙ্গিক বৃদ্ধি না ঘটিয়েও শ্রমশক্তির অধিকতর তৎপরতা-সঞ্জাত অতিরিক্ত শ্রম উদ্বৃত্ত-উৎপন্ন ও উদ্বৃত্ত-মূল্যের বৃদ্ধি ঘটাতে পারে ( যা হচ্ছে সঞ্চয়নের সামগ্রী)।
খনি ইত্যাদি নিষ্কর্ষণ-মূলক শিল্পগুলিতে কাচামাল অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের কোনো অংশ গঠন করে না। এক্ষেত্রে শ্রমের বিষয় পূর্ববর্তী শ্রমের ফল নয়, প্রকৃতির কাছ থেকে তা পাওয়া গিয়েছে মুফতে—যেমন ধাতু, খনিজ, কয়লা, কয়লা পাথর ইত্যাদি। এই ক্ষেত্রগুলিতে স্থির মূলধন গঠিত হয় প্রায় একান্ত ভাবেই শ্রমের উপকরণ সমূহের দ্বারা যা খুব ভালভাবেই ব্যাপৃত করতে পারে বর্ধিত-পরিমাণ শ্রম ( শ্রমিকদের দিন ও রাত্রির শিফটই চালু করে উঃ’। বাকি সব কিছু সমান থাকলে, উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ ও মূল্য ব্যয়িত শ্রমের প্রত্যক্ষ অনুপাতে বৃদ্ধি পাবে। যেমন উৎপাদনের প্রথম দিনটিতে, আদি উৎপন্ন-কাৱকরা—মানুষ এবং প্রকৃতি—মূলধনের বস্তুগত উপাদানের স্রষ্টারূপে পরিণত হয়ে, এখনও কাজ করে একসঙ্গে। শ্রমশক্তির স্থিতিস্থাপকতার কল্যাণে, সঞ্চয়নের পরিধি স্থির মূলধনের কোনো পূর্ববর্তী বৃদ্ধিসাধন ছাড়াই, বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে।
কৃষিকর্মে, কর্ষণভুক্ত জমির এলাকা বাড়ানো যায় না আরো বীজ ও সার আগাম না দিয়ে। কিন্তু একবার এই আগাম দিয়ে দিলে মৃত্তিকার নিজস্ব বিশুদ্ধ যান্ত্রিক প্রক্রিয়াই উৎপন্ন সামগ্রীর পরিমাণের উপর উৎপাদন করে আশ্চর্যজনক ফল। আগেকার মত একই সংখ্যক শ্রমিকের দ্বারা সম্পাদিত শ্রমের এক বৃত্তের পরিমাণ এই ভাবে, শ্রমের উপকরণে কোনো অগ্রিম ব্যতিরেকেই, উর্বরতার বৃদ্ধি সাধন করে। আরো একবার মানুষ ও প্রকৃতির প্রত্যক্ষ তৎপরতাই হয়ে ওঠে বিপুলতর সঞ্চয়নের অব্যবহিত উৎস–নোতুন মূলধনের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই।
সর্বশেষে, যাকে বলা হয় ম্যানুফ্যাকচারকারী শিল্প তাতে শ্রমের প্রত্যেকটি অতিরিক্ত ব্যয় ধরে নেয় তদনুযায়ী কাঁচামালের অতিরিক্ত ব্যয়, কিন্তু ধরে নেয় না। তদনুযায়ী শ্রম-উপকরণের আবশ্যিক অতিরিক্ত ব্যয়। এবং যেহেতু নিষ্কণমূলক শিল্প ও কৃষিকর্ম ম্যানুফ্যাকচারকারী শিল্পকে কাঁচামাল সরবরাহ করে, সেইহেতু অগ্রিম মূলধন ব্যতিরেকেই প্রথমোক্ত শিল্প ও কৃষিকার্য অতিরিক্ত উৎপন্ন সামগ্র সৃষ্টি করে, তাও দ্বিতীয়োক্ত শিল্পের অনুকূলে কাজ করে।
সাধারণ ফল : সম্পদের দুটি প্রাথমিক স্রষ্টাকেই, শ্রমশক্তি ও ভূমিকেই, নিজের সঙ্গে সংবদ্ধ করে মূলধন এমন এক সম্প্রসারণ-ক্ষমতা অর্জন করে, যা তাকে সক্ষম করে তার সঞ্চয়নের উপাদানগুলিকে বাহ্নত তার নিজেরই আয়তনের দ্বারা, কিংবা, ইতি পুর্বেই উৎপাদিত উৎপাদন উপায়সমূহের মূল্য ও পরিমাণের দ্বারা নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে প্রসারিত করতে-যে উৎপাদন-উপায়সমুহের মধ্যেই মূলধন ধারণ করে তার অস্তিত্ব।
সঞ্চয়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সামাজিক শ্রমের উৎপাদনশীলতা।
শ্রমের উৎপাদন-ক্ষমতার সঙ্গে বৃদ্ধি পায় উৎপন্ন-সামগ্রীর পরিমাণ, যার মধ্যে রূপ পরিগ্রহ করে একটি বিশেষ মূল্য তথা একটি নিদিষ্ট আয়তনের উদ্বৃত্ত-মূল্য। উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার একই থাকলে, এমন কি কমে গেলেও, যতক্ষণ শ্রমের উৎপাদন-ক্ষমতা যেগতিতে বাড়ে তার চেয়ে তা মন্থরতর ভাবে কমে, ততক্ষণ উদ্বৃত্ত-উৎপন্ন সামগ্রী বৃদ্ধি পায়। অতএব আয়ে ও এবং অতিরিক্ত মূলধনে এই উৎপন্ন-সামগ্রীর ভাগাভাগি একই থাকলে, সঞ্চয়নের ভাণ্ডারে কোনো হ্রাস ব্যতিরেকেই ধনিকের পরিভোগ বৃদ্ধি পেতে পারে। একদিকে যখন পণ্যদ্রব্যাদি সস্তা হয়ে যাবার দরুন ধনিক আগের মত সমান সংখ্যক এমন কি তার চেয়েও অধিক সংখ্যক, ভোগ্য সামগ্রী হাতে পায় অন্য দিকে, তখন পরিভোগ-ভাণ্ডারের বিনিময়ে সঞ্চয়ন ভাঙারের আপেক্ষিক আয়তন এমনকি বৃদ্ধিও পেতে পারে। কিন্তু যেমন আমরা দেখেছি শ্রমের ক্রমবর্ধমান উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক আরো আরো সস্তা হয় এবং সেই কারণে, উদ্ব মূল্যের হার বৃদ্ধি পায়, এমনকি যখন আসল মজুরি বাড়তে থাকে। আসল মজুরি কখনো শ্রমের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সমানুপাতে বাড়ে না। সুতরাং অস্থির মূলধনে একই মূল্য অধিকতর শ্রমশক্তিকে, অতএব শ্রমকে, গতিশীল করে। স্থির মূলধনে একই মূল্য অধিকতর উৎপাদন-উপায়ে অর্থাৎ অধিকতর শ্রম-উপকরণে শ্রম-বিষয়ে ও সহায়ক সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয়; সুতরাং তা ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্য উভয়েরই অধিকতর উপাদান সরবরাহ করে এবং সেই সঙ্গে আরো শ্রমকে কাজে লাগাবার সংস্থান করে। সুতরাং অতিরিক্ত মূলধনের মূল্য একই থাকলেও কিংবা এমনকি হ্রাস পেলেও পরিবর্তিত সঞ্চয়ন তখনো ঘটে। কেবল যে পুনরুৎপাদনের আয়তন বস্তুগত ভাবে বিস্তার লাভ করে তাই নয়, উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন অতিরিক্ত মূলধনের মূল্যের তুলনায় দ্রুততর গতিতে বৃদ্ধি পায়।
