জন স্টুয়ার্ট মিল বলেন, “মজুরির কোনো উৎপাদন ক্ষমতা নেই; মজুরি হল একটি উৎপাদন ক্ষমতার দাম। পণ্যোৎপাদনের ক্ষেত্রে খোদ হাতিয়ারগুলির সঙ্গে হাতিয়ারগুলির দামের যে অবদান, শ্রমের সঙ্গে মজুরির অবদান তার চেয়ে বেশি নয়। যদি ক্রয় না করেই শ্রম পাওয়া যেত, তা হলে মজুরিকে বাদ দেওয়া যেত।[২] কিন্তু শ্রমিকেরা যদি বাতাস খেয়ে বাঁচতে পারত, তা হলে তো কোনো দাম দিয়েই তাদের কেনা যেত না। সুতরাং, তাদের জন্য ‘শূন্য-ব্যয়, গাণিতিক অর্থে, এমন একটি মাত্রা, যা কখনো পৌছানো যায় না, যদিও আমরা সব সময়েই বেশি বেশি করে তার কাছাকাছি যেতে পারি। মূলধনের নিরন্তর প্রবণতাই হল শ্রমের বাবদে এই ব্যয়কে সবলে এই শূন্যের দিকে ঠেলে নেওয়া। আঠারো শতকের একজন লেখক, যাকে আগেও কয়েকবার উদ্ধৃত করেছি, শিল্প ও বাণিজ্য প্রসঙ্গে প্রবন্ধ’-নামক গ্রন্থের রচয়িতা যখন বলেন যে, ইংল্যাণ্ডের ঐতিহাসিক ব্ৰতই হল ইংরেজ মজুরিকে ফরাসী ও ওলন্দাজ মজুরির মানে দাবিয়ে আনা, তখন তিনি কেবল ইংরেজ ধনতন্ত্রের গোপন আত্মাটিকেই প্রকাশ করে ফেলেন।[৩] অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে তিনি সরল মনে বলেন, “কিন্তু যদি আমাদের গরিবেরা” (শ্রমিকদের বোঝাবার জন্য পরিভাষা) “বিলাসে জীবন যাপন করতে চায় তাহলে, শ্রমকে অবশ্যই হতে হবে মহার্ঘ যখন বিবেচনা করা যায় কি কি বিলাস-দ্রব্য এই উংপাদনকারী জনসাধারণ পরিভোগ করে, যেমন, ব্রাণ্ডি, জিন, চা, চিনি, বিদেশী ফল, জোরালো বিয়ার, ছাপানো ছিট-কাপড়, নস্য, তামাক ইত্যাদি।”[৪] নর্দাম্পটনের এক মিল-মালিকের বই থেকে তিনি একটি উরূতি দিয়েছেন; আকাশের দিকে টেরা চোখে তাকিয়ে এই মিল মালিকটি দীর্ঘনিঃশাস ফেলে দুঃখ করেন, “ইংল্যাণ্ডের তুলনায় ফ্রান্সের মজুরি তিন ভাগের এক ভাগ সন্তা, কারণ সেখানকার গরিবেরা খাটে খুব বেশি কিন্তু খাওয়া-পরা বাবদে পায় খুব কম। তাদের প্রধান খাদ্য হল রুটি, ফুল, লতা-ডাটা ও শিকড়-বাকড় ও শুটকি মাছ; কারণ তার মাংস খায় কদাচিৎ এবং গমের দাম বেড়ে গেলে রুটি খায় খুবই সামান্য।”[৫] আমাদের প্রবন্ধকার আরো বলেন, “এই সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় যে, তারা পান করে শুধু জল বা স মদ, সুতরাং তাদের খরচ পড়ে নামমাত্র পয়সা। এখানে এই অবস্থা তৈরি করা খুবই কঠিন তবে অসম্ভব নয়, কেননা ফ্রান্স ও হল্যাণ্ডে, উভয় জায়গাতেই তা করা হয়েছে।[৬] কুড়ি বছর পরে এক মার্কিন হামবড়া, ব্যাবণ-পদে নিযুক্ত ইয়াংকি, বেঞ্জামিন টমসন ( ওরফে কাউন্ট রামফোর্ড ) একই মহানুভবতার পথ অনুসরণ করে ঈশ্বর ও মানুষের মনোরঞ্জন করেছিলেন। তার প্রবন্ধাবলী” হচ্ছে একটি রান্নার বই, যাতে দেওয়া হয়েছে শ্রমিকের প্রিয় দৈনন্দিন খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্ত হিসাবে ব্যবহার্য হরেক রকম বিকল্প ভোজ্য-সামগ্রীর বন্ধন-প্রণালী। এই বিস্ময়কর দার্শনিকের বিশেষভাবে সার্থক একটি ব্যবস্থাপত্র নিম্নরূপ : ৫ পাউণ্ড যবের গুড়ো, ৭.৫ পেন্স; ৫ রাউণ্ড ভারতীয় শস্য ৬.২৫ পেনি; ৩ পেনি পরিমাণ লাল হেরিং-শুটকি, ১ পেনি মুন, ১ পেনি ভিনিগার, ২ পেনি গোলমরিচ ও মিষ্টি লতা-ডাটা—সব মিলিয়ে মোট ৪.৭৫ পেনি দিয়ে প্রস্তুত করা যায় ৩৪ জন লোকের জন্য স্যুপ’; এবং যব ও ভাতৃতীয় শস্যের মাঝারি দাম ধরে নিলে এই স্যুপ’ মোগানো যায় ১/৪ পেনি দামে, প্রতি ২০ আউন্সের জন্য।”[৭] ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের ভেজাল বেড়ে যাবার ফলে টমসনের এই আদর্শ ব্যবস্থাপত্রটি বাহুল্যে পরিণত হল।[৮] ১৮ শতকের শেষে এবং ১৯ শতকের শুরুর দশ বছরে, ইংল্যাণ্ডের খাবার-মালিক ও জমিদারেরা সজোরে চালু করে দিল ষৎপয়োনাস্তি ন্যূনতম মজুরি; তারা কৃষি-শ্রমিককে দিতে লাগল মজুরির আকারে ন্যূনতমেরও কম এবং বাকিটা ধর্মীয় ত্ৰাণকার্যের আকারে। ইংরেজ ভাড়গুলো কেমন ভড়ামো করে তাদের মজুরি-হার নির্ধারণের “আইনগত কর্তব্য সাধন করত, তার একটা নমুনা: মিঃ বার্ক বলেন, নরফোক-এর ভূস্বামীরা তখন আহার করেছিলেন, যখন তারা মজুরির হার স্থির করেন, বার্কস-এর ভূস্বামীরা স্পষ্টতই মনে করেন, শ্রমিকদের এই রকম করা উচিত হয়নি, যখন তারা মজুরি-হার হির করেন স্পিনহামল্যাণ্ড-এ, ১৭৯৫। সেখানে তারা স্থির করেন যে একজন লোকের আয় (সাপ্তাহিক হওয়া উচিত ৩ শিলিং, যখন ৮ পাউণ্ড ১১ আউন্সের এক গ্যালন বা আধ-পেক রুটি বিক্রি হয় ১ শিলিংয়ে, এবং তা নিয়মিত বাড়া উচিত যে-পর্যন্ত না রুটির দাম হয় ১ শিলিং ৫ পেন্স; যখন তা এই অংকটাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন তা নিয়মিত কমা উচিত যে-পর্যন্ত না তা হয় ২ শিলিং, এবং তখন তার খাদ্য হওয়া উচিত ১/৫ ভাগ কম।”[৯] ১৮১৪ সালে লর্ডসভার তদন্ত কমিটির সামনে এ. বেনেট নামে জনৈক বৃহৎ কৃষক, প্রশাসক, গরিব-আইন’-সংরক্ষক এবং মজুরি নিয়ামককে প্রশ্ন করা হয় : “দৈনিক শ্রমের মূল্যের কোনো অংশ কি গরিব-কর থেকে শ্রমিকদের পুষিয়ে দেওয়া হয়েছে? উত্তর : হঁ্যা হয়েছে, প্রত্যেক পরিবারের সাপ্তাহিক আয় গ্যালন-রুটি (৮ পাউণ্ড ১১ আউন্স) এবং মাথাপিছু ৩ পেন্স করে পুষিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি পরিবারের প্রত্যেকের জীবন ধারণের জন্য সপ্তাহে এক গ্যালন-রুটি এবং জামা-কাপড়ের জন্য ৩ পেন্সই যথেষ্ট; এবং পল্লী যাজনিক যদি জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারেন, তা হলে ঐ ৩ পেন্স কেটে রাখা হয়। উইল্টশায়ার-এর গোটা পশ্চিমাংশ জুড়ে, এবং আমার বিশ্বাস গোটা দেশ জুড়েই, এইটাই রীতি।[১০] ঐ সময়ের এক বুর্জোয়া গ্রন্থকার চিৎকার করে বলেন, “তারা (জোত-মালিকরা। তাদের স্বদেশবাসীদের একটি প্রদ্ধেয় অংশকে আতুরাশ্রমে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে অধঃপাতিত করেছে। যখন সে নিজের লাভ বাড়িয়ে চলেছে, তখন সে শ্রমজীবী পোব যাতে কিছু না জমাতে পারে তার ব্যবস্থা করেছে।”[১১] উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃজনে শ্রমিকের আবশ্যিক পরিভোগ-ভাণ্ডার থেকে সরাসরি লুণ্ঠন কি ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তা তথাকথিত ঘরোয়া শিল্পই খুলে ধরেছে (পঞ্চদশ অধ্যায়, অষ্টম পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)। এই সম্পর্কে আরো তথ্য পরে দেওয়া হবে।
