সমাজের সবচেয়ে বিভিন্ন ধরনের অর্থ নৈতিক রূপসমূহে কেবল সরল পুনরুৎপাদনই ঘটেনা, সেই সঙ্গে, বিভিন্ন মাত্রায়, ক্রমবর্ধমান হারে পুনরুৎপাদনও ঘটে। ধাপে ধাপে আরো বেশি উৎপন্ন হয়, আরো বেশি পরিভুক্ত হয়, এবং স্বভাবতই আরো বেশি উৎপন্ন সামগ্রী উৎপাদনের উপায়-উপকরণে রূপান্তরিত করতে হয়। অবশ্য, এই প্রক্রিয়াটি নিজেকে মূলধনের একটি সঞ্চয়ন কিংবা ধনিকের একটি কর্মানুষ্ঠান হিসাবে উপস্থিত করেনা—যে-পর্যন্ত না শ্রমিকের উৎপাদনের উপায়-উপকরণ এবং সেই সঙ্গে তার উৎপন্ন সামগ্রী ও জীবনধারণের উপকরণসমূহ মূলধনের আকারে তার মুখোমুখি না হয়।[১৪] রিচার্ড জোন্স, কয়েক বছর আগে যার মৃত্যু হয়েছে এবং যিনি ম্যালথাসের পরে হেইলিবেরি কলেজে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বের চেয়ারে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের আলোয় এই বিষয়টি ভাল ভাবে আলোচনা করেছিলেন। যেহেতু হিন্দু জন সংখ্যার বিরাট সমষ্টি ছিল কৃষক, যারা নিজেদের জমি নিজেরাই চাষ করত, সেই হেতু তাদের উৎপন্ন দ্রব্য, তাদের শ্রম-উপকরণ ও জীবনধারণের সামগ্রী কখনো এমন একটি ভাণ্ডারের আকার ধারণ করে না, যে ভাণ্ডারটি আয় থেকে বাঁচিয়ে করা হয়েছে, যে ভাণ্ডারটি সেই কারণে অতিক্রান্ত হয়েছে পূর্বতন সঞ্চয়নের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।”[১৫] অপর পক্ষে, যেসব প্রদেশে প্রাচীন প্রণালীকে খুব সামান্যই ক্ষুন্ন করেছে, সেই প্রদেশগুলিতে অ-কৃষক শ্রমিকেরা কর্মে-নিযুক্ত হয় সেই সব প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিদের দ্বারা, যারা কৃষিগত উদ্বৃত্ত-উৎপন্নের একটা অংশ কর বা খাজনার আকারে প্রাপ্ত হয়। এই উৎপন্নের একটি অংশ ঐ প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিরা জিনিসের আকারে পরিভোগ করে এবং আরেকটা অংশ ঐ ব্যক্তিদেরই ব্যবহারের জন্য শ্রমিকদের দ্বারা বিলাস সামগ্রীও অনুরূপ অন্যান্য সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয়; বাকিটা যায় শ্রমিকদের হাতে মজুরি হিসাবে—যে শ্রমিকেরা নিজেরাই নিজেদের শ্রম-উপকণ সমূহের মালিক। এখানে সেই জাল সন্ন্যাসী, সেই বিষন্ন চেহারার নাইট’, সেই ধনিক “ভোগ সংবরণকারী”-র হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকেই ক্রমবর্ধমান আয়তনে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন তাদের নিজেদের পথে চলতে থাকে।
————
১. পাঠক লক্ষ্য করবেন প্রত্যাগম (রেভিনিউ ) কথাটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রথমত, মূলধন কর্তৃক সময়ক্রমিক ভাবে প্রদত্ত উদ্বৃত্তমূল্যকে অভিহিত করতে এবং দ্বিতীয়তঃ ধনিক কর্তৃক সময়ক্রমিক ভাবে পরিভুক্ত ফলের অংশটিকে কিংবা তার ব্যক্তিগত পরিভোগ ভাণ্ডারে সংযোজিত অংশটিকে অভিহিত করতে। আমি এই দুটি অর্থই বজায় রেখেছি কারণ এটা ইংরেজ ও ফরাসী অর্থনীতিবিদদের ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে।
২. তার রচনায় কুসীদজীবীকে ধনিকের সেই পুরনো ধাঁচের কিন্তু চির-নোতুন ছাঁচের নমুনা হিসাবে ধরে নিয়ে, লুথার খুব সঠিক ভাবেই দেখিয়েছেন যে ধনবান হবার অন্যতম উপাদান হচ্ছে ক্ষমতালিপ্সা। ‘হিদেনরা যুক্তির আলোয় এই সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছিলেন যে, কুসীদজীবী হল দো-রঙা চোর এবং খুনী। আমরা খ্রীস্টানরা কিন্তু তাদের এমন সম্মানের চোখে দেখি, যে আমরা তার টাকার জন্য প্রায় তাকে পূজা করি। অপরের খাদ্য খেয়ে ফেলে, লুটে নেয় এবং চুরি করে তা সে যে-ই করুক না কেন, সেই একটা মস্ত বড় খুনী, (যেমন খুনী সেই লোকটা) কাউকে উপোস করিয়ে রাখে বা ষোল আনা শেষ করে দেয়। একজন কুসীদজীবী তাই করে, অথচ সে তার আসনটিতে নিরাপদে বসে থাকে, যখন তার বোলা উচিত ছিল ফাঁসীর দড়িতে এবং যত সংখ্যক গিভার (টাকা) সে চুরি করেছে তত সংখ্যক দাঁড়কাকের ভোজ্যে পরিণত হওয়া উচিত ছিল, যদি অবশ্য তার দেহে ততটা মাংস থাকে যা অত সংখ্যক কাক ঠুকরে ঠুকরে খেতে পারে। ইতিমধ্যে আমরা ক্ষুদে চোরগুলিকে ফাসিতে লটকে দেই। ক্ষুদে চোরদের বেড়ি পরানো হয় আর বড় চোরগুলো সোনা ও রেশমে সেজেগুজে আস্ফালন করে বেড়ায়। সুতরাং, এই পৃথিবীতে (শয়তানের পরে) টাকা লুঠেরা ও কুসীদজীবী ছাড়া মানুষের এত বড় শত্রু আর কেউ নেই, কেননা সে হতে চায় সকল মানুষের উপরে ঈশ্বর। তুর্কী, সৈন্য ও স্বৈরাচারীরাও বলোক, কিন্তু তারা অন্য মানুষকে বাঁচতে দেয় এবং স্বীকার করে যে তার বদ লোক এবং শক্ত; এমনকি তারা কখনোসখনন কারো কারো প্রতি করুণাও করে। কিন্তু একটা কুসীদখোর, একটা মুদ্রারাক্ষস এমন একটা জীব যে, সে নিজে যাতে সব কিছু করায়ত্ত করতে পারে এবং সে যাতে সকলের ঈশ্বর এবং সকলে তার ক্রীতদাস হতে পারে, তার জন্য গোটা দুনিয়াকে ক্ষুধায় তৃষ্ণায় দুর্দশায় ও অভাবে ধ্বংস করে দেবে। চমৎকার চমৎকার আলখাল্লা, সোনার হার ও আংটি পরা, মুখ মোছ, যোগ্য ও ধার্মিক লোক হিসাবে গণ্য ও মান্য হওয়া। কুসীদবৃত্তি হল একটা বিকট বিশাল দানব একটা মানুষ-নেকড়ে, যে সব কিছুকে শ্মশানে পরিণত করবার ব্যাপারে যে-কোনো ক্যাকাস, গেরিয়ন বা অ্যান্টাসকে হারিয়ে দেবে। এবং তবু সে ভান করে থাকে এবং তাকে মনে করা হয় ধার্মিক বলে, যাতে করে লোকেরা না বুঝতে পারে যে-গরুগুলোকে সে চুরি করে তার খোঁয়াড়ে রেখেছে, সেগুলো কোথায় গেল। কিন্তু হার্কিউলিস শুনতে পাবেন সেই গোৰুগুলির এবং তার বন্দীদের চীৎকার এবং ক্যাকাসকে খুঁজে বার করবে পাহাড়ের চুড়া আর গুহা থেকে এবং দুবৃত্তের কবল থেকে আবার গোৰুগুলিকে মুক্ত করে দেবেন। ক্যাকাস মানে দুবৃত্ত অর্থাৎ একজন ধার্মিক কুসীদ-খোর, যে সব কিছু চুরি করে, লুঠ কত্রে, খেয়ে ফেলে। এবং কখনো স্বীকার করবে না যে সে এসব করেছে এবং মনে করে যে কেউ অকেৱতে পারবে না, কেননা যে গোরুগুলিকে সে তার হায় টেনে নিয়ে গিয়েছে সেগুলির পায়ের দাগ দেখলে ধারণা হবে যেন সেগুলিকে এদিও-ওদিক ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এইভাবে কুলীদখোর জগৎকে প্রতারণা করবে যে সে কত উপকারী সে গরুগুলি জগতকে দান করেছে। আসলে কিন্তু সে একি সেগুলিকে কাটে এবং খায়। এবং যেহেতু আমরা রাহাজানদের খুনীদের ও বাড়ি লুঠেরাদের তাড়া করি, মুণ্ডুচ্ছেদ করি, সেহেতু সমস্ত কুলীদখোরদের আমাদের কত বেশি তাড়া করা, হত্যা করা শিকার করা, অভিসম্পাত করা ও মুণ্ডুচ্ছেদ করা কর্তব্য। (মার্টিন লুথার, An die pfarrherm Wider den Wucher zu predigen’ Wittemberg, 1540 )
