সঞ্চয় কর, সঞ্চয় কর ! এই হল মোজস এবং তার পয়গম্বরদের বাণী ! “শিল্প সরবরাহ করে সেই সামগ্রী, সংরক্ষণ যাকে পরিণত করে সঞ্চয়ে।”[৪] সুতরাং যতটা পার ততটা বাচাও অর্থাৎ উদ্বৃত্ত-মূল্যের তথা উত্ত-উৎপন্নের যতটা বেশি অংশ পার, ততটাকে আবার মূলধনে রূপান্তরিত কর। সঞ্চয়নের জন্যই সঞ্চয়ন, উৎপাদনের জন্যই উৎপাদন—এই সূত্রের মাধ্যমে চিরায়ত অর্থনীতি প্রকাশ করেছিল বুর্জোয়া শ্রেণীর ঐতিহাসিক ব্ৰত; এবং এক নিমেষের জন্যও সম্পদের জন্ম-যন্ত্রণা সম্পর্কে আত্ম-প্রতারণা করেনি।[৫] আর ঐতিহাসিক ভবিতব্যতার মুখে বিলাপের সার্থকতাই বা কি? চিরায়ত অর্থনীতির দৃষ্টিতে যখন সর্বহারা (প্রালেতারিয়ান) হল উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের একটি মেশিন মাত্র, তখন ধনিক হল এই উদ্যমূল্যকে অতিরিক্ত মূলধনে রূপান্তরণের জন্য একটি মেশিন। ধনিকের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অর্থনীতি গ্রহণ করে নিদারুণ ঐকান্তিক ভাবে। ভোগের লালসা এবং ঐশ্বর্যের তাড়না-এই দুয়ের মধ্যে যে ভয়াবহ সংঘাত তার বুকের গভীরে চলছে, তাকে যাদুবলে নিষ্ক্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ম্যালথাস ১৮২০ সালের নাগাদ একটি শ্রম-বিভাজনের সুপারিশ করেন, যে-বিভাজন অনুযায়ী উৎপাদনে বই ব্যাপৃত ধনিককে দেওয়া হল সঞ্চয় করার কাজ এবং উদ্বৃত্ত-মূল্যের বাকি সমস্ত অংশভাকদের-জমিদার, সরকারি কর্মচারী ও যাজকতা-বৃত্তিজীবীদের দেওয়া হল ব্যয় করার কাজ। তিনি বললেন, “ব্যয়ের জন্য আবেগ এবং সঞ্চয়ের জন্য আবেগ-এই দুটিকে পৃথক রাখার গুরুত্ব সামাজিক।[৬] দীর্ঘকাল ধরে ভাল থাকায় অভ্যস্ত এবং পার্থিব জগতের মানুষ হওয়ায় ধনিকেরা সজোরে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। রিকার্ডোর এক শিষ্য তাদের এক মুখপাত্র চিৎকার করে উঠল, কী! ম্যালথাস সাহেব ওকালতি করছেন উচু খাজনা, ভারি ট্যাক্সো ইত্যাদির সপক্ষে যাতে করে সব সময়েই পরিশ্রমী ব্যক্তিদের তাড়া দিয়ে কাজ করার জন্য অনুৎপাদক পরিভাোদের হাতে অংকুশ রাখা। যায়! আওয়াজ উঠেছে : উৎপাদন, আরো উৎপাদন, নিরন্তর বর্ধমান আয়তনে উৎপাদন, কিন্তু এমন এক প্রক্রিয়ার দ্বারা উৎপাদন বর্ধিত হবে না, হবে খর্বিত। তা ছাড়া, কেবল অন্যদের খোঁচাবার জন্য এতগুলি লোককে আলস্যের মধ্যে রেখে তাদের পোষণ করাটাও খুব ন্যায়সঙ্গত ব্যাপার নয় বরং এদের চরিত্র থেকেই বোঝা যায় যে এদের দিয়ে যদি কাজ করানো হয়, তা হলে এরা সাফল্যের সঙ্গেই কাজ করতে পারে।”[৭] শিল্প-ধনিকের রুটি থেকে মাখন বাদ দিয়ে কাজের জন্য তাকে তাড়া দেওয়াটাকে তিনি অন্যায় বলে মনে করেন, অথচ “শ্রমিককে পরিশ্রমী রাখবার জন্য তিনি তার মজুরি ছাটাই করে ন্যূনতম অংকে কমিয়ে আনবার আবশ্যকতার কথা বলেন। তিনি এই ঘটনাটিও এক মুহূর্তের জন্য লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন না যে মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের আত্মীকরণই হচ্ছে উদ্বৃত্ত-মূল্যের গুপ্তকথা। “শ্রমিকদের বর্ধিত চাহিদার মানে তাদের নিজেদের জন্য তাদের নিজেদের উৎপন্ন-দ্রব্যের একটা ক্ষুদ্রতর অংশ গ্রহণের এবং তার বৃহত্তর অংশটা তাদের নিয়োগকর্তাদের জন্য প্রদানের ইচ্ছা ছাড়া আর বেশি কিছু নয়; এবং বলা যায়, এই পরিভোগ কমানোর ফলেই দেখা দেয় চাহিদার অতিরিক্ত সরবরাহের প্রাচুর্য”; (শ্রমিকদের পক্ষে ) “আমি কেবল এই উত্তরই দিতে পারি যে এই অতিরিক্ত সরবরাহ বিপুল মুনাফারই সমার্থক।”[৮]
শ্রমিকদের কাছ থেকে কেড়ে আনা এই লুঠের মাল কি ভাবে সঞ্চয়নের স্বার্থে ধনিক এক ধনী অলস ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ করা যেতে পারে, এই নিয়ে বিদগ্ধ বিতর্কটি জুলাই বিপ্লবের মুখে চাপা পড়ে গেল। অল্পকাল পরেই লিয়ন্স-এর শহুরে সর্বহারারা বিপ্লবের ঘণ্টা ধ্বনিত করল এবং ইংল্যাণ্ডের গ্রামীণ সর্বহারারা গোলাবাড়ির আঙিনায় ও ফসলের গাদায় আগুন লাগাতে শুরু করল। চ্যানেলের এপারে ওয়েনবাদ এবং ওপারে সেন্ট সাইমন-বাদ ও ফুরিয়ার-বাদ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সময় এল হাতুড়ে অর্থনীতির। মুনাফা (সুদ সমেত) হল বারো ঘণ্টার মধ্যে সর্বশেষ ঘণ্টার উৎপন্ন দ্রব্য—এই আবিষ্কারের ঠিক এক বছর আগে ম্যাঞ্চেস্টারে নাসাউ ডবলু সিনিয়র বিশ্বের কাছে ঘোষণা করেছিলেন তার আর একটা আবিস্ক্রিয়া। তিনি গর্বভরে বলেছিলেন, “উৎপাদনের উপকরণ হিসাবে মূলধন কথাটির পরিবর্তে আমি ব্যবহার করি ভোগ সংবরণ কথাটি।”[৯] হাতুড়ে অর্থনীতির আবিষ্কারগুলির মধ্যে এটি একটি অতুলনীয় নমুনা! একটি অর্থ নৈতিক অভিধার পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেন একটি স্তাবকতাপূর্ণ কথা—voila tout। সিনিয়র বলেন, “যখন কোন বন্য মানুষ ধনুক তৈরি করে, তখন সে একটি শ্রমশিল্প অনুশীলন করে, কিন্তু সে ভোগ-সংবরণ অভ্যাস করে না।” এ থেকেই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কিভাবে এবং কেন সমাজের প্রারম্ভিক পর্যায়গুলিতে ধনিকের ভোগ-সংবরণ ব্যতিরেকেই শ্রমের হাতিয়ারগুলি তৈরি হয়েছিল। “সমাজ যত অগ্রসর হয়, ততই বেশি বেশি করে ভোগ-সংবরণের প্রয়োজন দেখা দেয়”[১০]-ভোগ-সংবরণ তাদের জন্য যারা অন্যের শ্রম-ফল আত্মসাৎ করার শিল্প-প্রণালী পরিচালনা করে। শ্ৰম-প্রক্রিয়া সম্পাদন করার সমস্ত অবস্থাগুলি আকস্মিক রূপান্তরিত হয় ধনিকের ভোগ সংবরণের কতকগুলি কার্যে। শস্য যদি সবটা খেয়ে ফেলা না হয়, যদি তার একটা অংশ বোনা হয়, তা হলে সেটা হবে ভোগ-সংবরণ-ধনিকের পক্ষে।[১১] যদি মদ পেকে ওঠার জন্য সময় পায়, তা হলে সেটাও হবে ভোগ-সংবরণ-ধনিকের পক্ষে। ধনিক নিজেকেই লুণ্ঠন করে যখনি সে “উৎপাদনের হাতিয়ারগুলি শ্রমিককে ধার দেয় (!)” অর্থাৎ সেগুলিকে না খেয়ে ফেলে-মি-ইঞ্জিন, তুলল, রেলওয়ে, সার, ঘোড়া ইত্যাদি সব কিছুকে না খেয়ে ফেলে, অথবা, যেমন হাতুড়ে অর্থনীতিকেরা বালখিল্য-সুলভ ভঙ্গিতে বলে থাকেন “সেগুলির মূল্যকে ভোগ-বিলাসে অপচয় না করে, যখনি সেগুলির সঙ্গে শ্রমশক্তি সংযুক্ত করে, সে ঐ শ্রমশক্তি থেকে উদ্বৃত্ত-মূল্য নিষ্কাশন করার জন্য সেগুলিকে ব্যবহার করে।”[১২] শ্রেণী হিসাবে নিকেরা কিভাবে সেই কৃতিত্বটা অর্জন করবে সেটা এমন একটা গুপ্তকথা যে হাতুড়ে অর্থনীতি প্রকাশ করতে আজও পর্যন্ত একগুয়ে ভাবে অস্বীকার করে আসছে। একমাত্র বিষ্ণুর এই আধুনিক অনুতাপী উপাসকের, তথা ধনিকের, আত্মনিগ্রহের কল্যাণেই যে এই জগৎটি এখনো কোন রকমে চলছে, সেটাই যথেষ্ট। কেবল সঞ্চয়নই নয়, এমনকি সাদাসিধা “মূলধন সংরক্ষণের ব্যাপারটিতেও আবশ্যক হয় সেই মূলধন পরিভোগ করার প্রলোভনের বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রতিরোধ।”[১৩] অতএব মানবতার সহজ-সরল অনুশাসনগুলি পরিষ্কার ভাবে নির্দেশ করে এই শহীদত্ববরণ ও প্রলোভন থেকে ধনিকের মুক্তি—ঠিক যেমন সম্প্রতি ক্রীত দাসত্বের অবসানের দ্বারা জর্জিয়ার দাস-মালিক এই যন্ত্রণাকর বিকল্প থেকে মুক্তি পেয়েছে। নিগ্রোদের চাবুক মেরে যে উদ্বৃত্ত-উৎপন্ন সামগ্রী পাওয়া গিয়েছে তার সবটাই কি শ্যাম্পেনে উড়িয়ে দেওয়া হবে না কি, তার একটা অংশ আরো নিগ্রো ও আরো জমিতে পুনঃ রূপান্তরিত করা হবে।
