সুতরাং যে-পর্যন্ত তার কাজ হচ্ছে কেবল মূলধনের কাজ—তার ব্যত্তি রূপে যে মূলধন চেতনা ও সংকল্পে সমম্বিত, সে-পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত পরিভোগ হচ্ছে সঞ্চয়নের। উপরে সম্পাদিত লুণ্ঠনকার্য, ঠিক যেমন হিসাব-রক্ষার ক্ষেত্রে ‘ডবলএনট্রি’-র মাধ্যমে ধনিকের ব্যক্তিগত ব্যয়কে তার মূলধনের পালটা বাবদে ধার হিসাবে দেখানো হয়। সঞ্চয়ন করা মানে হচ্ছে সামাজিক সম্পদের দুনিয়াকে জয় করা, তার দ্বারা শোষিত জনসংখ্যার সমষ্টিকে বৃদ্ধি করা এবং এই ভাবে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষত উভয় ভাবেই ধনিকের আধিপত্য বিস্তার করা।[২]
কিন্তু সেই আদি পাপ সর্বত্রই কাজ করে চলে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন, সঞ্চয়ন, এবং সম্পদ যেমন বিকাশ প্রাপ্ত হয়, তেমন ধনিকও কেবল মূলধনের বিগ্রহ মাত্র হিসাবে থাকা থেকে বিরত হয়। তার নিজের অ্যাডামের জন্য তার থাকে একটা সহমর্মিতাবোধ এবং তার অর্জিত জ্ঞান তাকে ক্রমে ক্রমে সক্ষম করে ব্রহ্মচর্যার প্রকৃতিকে প্রাচীন-পন্থী কৃপণের নিছক কুসংস্কার হিসাবে উপহাস করতে। যেখানে চিরায়ত প্রকারের একজন ধনিক ব্যক্তিগত পরিভোগকে চিহ্নিত করে তার কর্তব্য কর্মের বিরুদ্ধে একটি পাপাচার বলে এবং সঞ্চয়ন থেকে “সংবরণ” বলে, সেখানে একজন আধুনিকীভূত ধনিক সঞ্চয়নকে দেখতে সফল হয় সম্ভোগ থেকে সংবরণ হিসাবে।
“দুটি আত্মা, হায় তার বক্ষমাঝে রহে
এক থেকে অন্য রহে সুচির বিরহে।”
ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ঐতিহাসিক উষাকালে,-এবং প্রত্যেক ধনিক ভুইফোড়কেই ব্যক্তিগতভাবে এই পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়—অর্থলালসা এবং ধনবান হবার কামনাই থাকে প্রধান আবেগ। কিন্তু ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের অগ্রগতি কেবল এক আনন্দলোকই সৃষ্টি করেনা; ফটকাবাজি ও ক্রেডিট-ব্যবস্থার মাধ্যমে হঠাৎ বড়লোক হবার হাজার পথও খুলে দেয়। যখন বিকাশের একটি বিশেষ পর্যায়ে উপনীত হওয়া যায়, তখন অমিতব্যয়িতার একটা প্রথাগত মাত্রা—যা আবার ঐশ্বর্য প্রদর্শনের এবং প্রতিপত্তির সৃষ্টির, স্বাভাবিক প্রয়াসও বটে—হয়ে ওঠে “দুর্ভাগ্য” ধনিকের কাছে একটি ব্যবসায়িক প্রয়োজন। মূলধনের বিগ্রহটিতে বিলাসের প্রবেশ ঘটে। তা ছাড়া কৃপণের মত ব্যক্তিগত পরিশ্রম ও ভোগ-সংবরণের অনুপাতে ধনিক ধনবান হয় না, সে ধনবান হয় সেই হারে, যে-হারে সে অপরের শ্রমশক্তিকে নিঙড়ে নিতে এক শ্রমিকের উপরে জীবনের যাবতীয় উপভোগ থেকে বিরত থাকার বাধ্যতাকে চাপিয়ে দিতে পারে। সুতরাং, যদিও ধনিকের অমিতব্যয়িতা কখনো সামন্তপ্রভুর মুক্তহস্ত অমিল্কয়িতার প্রকৃত চরিত্র ধারণ করে না বরং তার পেছনে সবসময়েই উকি দেয় সবচেয়ে উৎকট অর্থ লালসা ও সবচেয়ে উৎকট হিসাব-নিকাশ, তবু তার ব্যয় সঞ্চয়নের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়—একটির জন্য অন্যটি আবশ্যিক ভাবেই সংকুচিত হয় না, কিন্তু এই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের মধ্যে গড়ে ওঠে ফাউস্ট-সুলভ একটি সংঘাত-একদিকে সামনের মাদকতা এবং অন্য দিকে ভোগ-বিলাসের লালসা।
১০১৫ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে ড আইকিন বলেন : “ম্যাঞ্চেস্টারের শিল্পকে চার পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়, যখন মিলমালিকদের তাদের জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। তারা তখন নিজেদের ধনী করত আপন-আপন বাবা মাকে লুণ্ঠন করে, যাদের অধীনে তাদের সন্তানেরা শিক্ষানবিশ হিসাবে বাঁধা থাকত; বাপ-মাকে দিতে হত উচু খেসারত যখন শিক্ষানবিশদের থাকতে হত অনাহারে। অন্য দিকে গড়পড়তা মুনাফা ছিল নিচু এবং সঞ্চন করার জন্য আবশ্যক হত চরম মিতব্যয়িতা। তারা থাকত কৃপণের মত এবং এমনকি তাদের মূলধন বাবদ প্রাপ্ত আটাও পরিভোগ কত না। দ্বিতীয় পর্যায়ে, যখন তারা কিছু কিছু ঐশষ অর্জন করতে সক্ষম হত কিন্তু তখন কাজ করত আগের মতই কঠোর ভাবে–কেননা, যে-কথা প্রত্যেক গোলাম-মালিক জানে, শ্রমের সরাসরি শোষণের জন্য শ্রম ব্যয় করতে হয়। এবং জীবন-যাপন করত আগের মতই সাদাসিধা ভাবে।” তৃতীয় পর্যায়, যখন শুরু হত ভোগ-বিলাস এবং রাজ্যের প্রত্যেকটি বাজারে ঘোড়-সওয়ার পাঠানো হত ‘অর্ডার সংগ্রহের জন্য যাতে ব্যবসাকে আরো এগিয়ে নেওয়া যায়। এটা খুবই সম্ভব যে, শিল্প-মারফৎ অর্জিত ৩,০০০ থেকে £৪,০০০ মূলধন ১৬৯০ সালের আগে হয় একটাও ছিল না আর নয়তো খুব কমসংখ্যকই ছিল। কিন্তু সেই সময় থেকে কিংবা কিছু কাল পর থেকে শিল্প-ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই টাকা পেতে থাকল এবং কাঠ ও পলেস্তারার পুরনো বাড়ির জায়গায় আধুনিক ইটের বাড়ি তৈরি করা শুরু করল।” এমনকি অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের ম্যাঞ্চেস্টারের একজন মিল মালিককে তার অতিথিদের সামনে এক পাইন্ট বিদেশী মদ রাখার দরুন তার প্রতিবেশী দের টিপ্পনী ও মাথা-ঝাঁকুনির মুখে পড়তে হয়েছিল। মেশিনারির উদ্ভবের আগে পর্যন্ত কারখানামালিকেরা সন্ধ্যা বেলায় যেখানে মিলিত হত সেই সরাইখানায় তাদের এক একজনের ব্যয় এক গ্লাস পাঞ্চ’-এর জন্য ছয় পেন্স এবং এক স্কু, তামাকের জন্য এক। পেনির বেশি হত না। ১৭৫৮ সালে হল নোতুন যুগের সূচনা তার আগে পর্যন্ত সত্য সত্যই ব্যবসায়ে ব্যাপৃত এমন লোককে দেখা যেত তার নিজের তল্পিতল্পা নিয়ে যাতায়াত করতে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ৩০ বছর “চতুর্থ পর্যায় হল সেই পর্যায়, যখন ব্যয় ও বিলাসের বিরাট অগ্রগতি ঘটল, সেই পর্যায় যা পরিপোষিত হল সওয়ার ও দালালদের সাহায্যে ইউরোপের প্রত্যেকটি অংশে ব্যবসা-সম্প্রসারণের দ্বারা।”[৩] ডঃ আইকিন যদি তার কবর থেকে উঠে আজকের ম্যাঞ্চেস্টারকে দেখতে পেতেন, তাহলে তিনি কি বলতেন?
